ফ্রান্সিস একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল–দেখ মোকা-ওরা যদি সাঁতরে এসে জাহাজে আশ্রয় নেয় আমরা ওদের আশ্রয় দেব, খাদ্য দেব। কিন্তু ওদের জন্য এগিয়ে গেলে আমরা ত্ৰিস্তানদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে যাবো। এটা ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারছি না।
কি বলছে ফ্রান্সিস–হ্যারি গলা চড়িয়ে বলল–চোখের সামনে লোকগুলো পুড়ে মরবে আর আমরা বসে থাকবো?
ভুলে যেও না হ্যারি আমাদের দুজন বন্ধু এখনও ত্রিস্তানদের হাতে বন্দী।
ঠিক। কিন্তু তুমি এখন জানো না ওরা বেঁচে আছে না হত্যা করা হয়েছে।
কিন্তু–
কোনো কিন্তু নয় ফ্রান্সিস। ভালো করে তাকিয়ে দেখ, জ্বলন্ত বনের আগুনের আলোয় দেখ–ত্রিস্তানদের ক্যানো নৌকাগুলো ওখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ইকবোরা সাঁতরে এসেও প্রাণ বাঁচাতে পারবে না।
ফ্রান্সিস কঙ্কাল দ্বীপের দিকে তাকাল। আগুনের আভায় আর উজ্জ্বল জ্যোৎস্নায় দেখল কয়েকটা ক্যানো নৌকা ঐ বনের কাছে সমুদ্রে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ফ্রান্সিস সব ভাইকিং বন্ধুদের দিকে তাকাল। চেঁচিয়ে বলল-একদল দাঁড়ঘরে চলে যাও। জাহাজ দ্বীপের দিকে নিয়ে চল। আর একদল অস্ত্র নিয়ে তৈরী হয়ে এস। পাঁচটা নৌকাই জলে ভাসাও। একটু থেমে ডাকলো–শাঙ্কো।
শাঙ্কো এগিয়ে এল। ফ্রান্সিস বলল-তুমি তীর ধনুক নিয়ে আমার নৌকোয় চলো। মোক এগিয়ে এল। বলল-আমিও আপনার সঙ্গে যাবে!
বেশ-ফ্রান্সিস বলল। দাঁড় বাওয়া শুরু হলো। জাহাজ আস্তে আস্তে এগিয়ে চলল কঙ্কাল দ্বীপের দিকে।
দ্বীপের কাছাকাছি এসে জাহাজ থামানো হলো। হ্যারির অনুমানই ঠিক। যেসব ইকবোরা জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে সাঁতার কেটে পালাতে চাইছে, ত্রিস্তানরা ক্যানো নৌকো থেকে তাদের বুকে পিঠে কাঠের বশ বিধিয়ে দিচ্ছে।
পাঁচটা নৌকোইজলেনামানোহলো৷ তরোয়োল, বল্লম হাতে ভাইকিংরা ত্ৰিস্তানদের ক্যানোগুলো লক্ষ্য করে এগোতে লাগল।
একেবারে সামনের নৌকোটায় ফ্রান্সিস, মোল আরশাঙ্কো। ক্যানোগুলোর কাছাকাছি এসে ফ্রান্সিস বলল–শাকো–বশী হাতে ক্যানোয় দাঁড়ানো ত্রিস্তানদের মারো। নৌকো দুলছে। নিখুঁত নিশানা নিয়ে মারবে। তীর যেন বাজে খরচ না হয়। নৌকোগুলো এগিয়ে চলল।
তখনই মোকা নৌকোয় উঠে দাঁড়িয়ে দুহাত গোল করে মুখের কাছে এনে তীক্ষ্ণ সুরে শিস দিতে লাগল। ও থামলেই বনের দিক থেকেও অমনি শিসের শব্দ ভেসে এল। বেশ কয়েকবার মোকা শিস দিল। বনের দিক থেকেও শিসের শব্দ ভেসে এল। মোকা নৌকোয় বসে পড়ল। বলল–ফ্রান্সিস আমার সঙ্কেত ওরা পেয়েছে। সঙ্কেতে বলেছি আমি আর বাবা বেঁচে আছি। ওরা যেন সাঁতরে জাহাজে আশ্রয় নেয় জাহাজের লোকেরা আমাদের বন্ধু।
ওদিকে ভাইকিংরা তরোয়াল বল্লম হাতে ত্রিস্তানদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল। নৌকো আর ক্যানোর ওপর লড়াই শুরু হলো ত্ৰিস্তানদের সঙ্গে।
শাঙ্কো ফ্রান্সিসের নির্দেশে ত্রিস্তানদের লক্ষ্য করে নিখুঁত নিশানায় তীর ছুঁড়তে লাগল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বেশ কিছু ত্রিস্তান যোদ্ধা মারা পড়ল। আরোহীহীন ত্রিস্তানদের ক্যানোগুলো এখানে-ওখানে ঢেউয়ে দোল খেতে লাগল। সেগুলোতে সাঁতরে এসেইকাৰবোরা উঠতে লাগল।
বেগতিক বুঝে ত্রিস্তানরা ক্যানো নিয়ে পালাতে লাগল। আধঘন্টার মধ্যে ত্রিস্তানরা বেশ কিছু মরল, বাকিরা প্রাণভয়ে পালাল ক্যানোয় চড়ে।
মোকা নৌকোয় উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ইকাবোদের ভাষায় কী বলতে লাগল। ইকবোরা সাঁতরে চলল জাহাজে। কেউ-কেউ ভাইকিংদের নৌকোয় উঠে পড়ল। মোকা একবারে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে একজন আহত ইকাবোকে নৌকোয় নিয়ে এল।
ফ্রান্সিস দেখল বনের আগুন অনেকটা স্তিমিত হয়ে এসেছে। তবে আকাশে এখনো কালো ধোঁয়া উঠছে। ও নৌকোয় উঠে চেঁচিয়ে নির্দেশ দিল–ভাইসব-জাহাজে ফিরে চল।
সব ভাইকিংরা চেঁচিয়ে উঠল–ও-হো-হো। জাহাজেও শোনা গেল প্রতিধ্বনির মতো–ও-হো–হো।
আস্তে-আস্তে নৌকোগুলো জাহাজের দিকে ফিরে যেতে লাগল।
সব ইকাবোদের জাহাজে আশ্রয় দেওয়া হলো। অনেক ইকাবোদের গা-হাত-পা পুড়ে গিয়েছিল। ভাইকিংরা কয়েকজন আহত হয়েছিল। জাহাজের বৈদ্য তাদের চিকিৎসার ভার নিল।
এসব তদারকি করতে হলো হ্যারিকে। ফ্রান্সিস নিজের কেবিনে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল ও।
একটু বেলায় ওর ঘুম ভাঙল। সকালের খাবার খেয়ে ও ডেক-এ উঠে এল। দেখল আহতরা এখানে-ওখানে শুয়ে আছে কম্বল পেতে। হ্যারি সব দেখাশুনো করছে।
একপাশে দেখল মোকা বসে আছে। ওর পেছনে রেলিঙে রোদে শুকোচ্ছে রাজার সেই গায়ের কাপড়টা। মোকা চড়া রোদের মধ্যে বসে আছে। ফ্রান্সিস বলল–মোকা, তুমি ছায়ায় গিয়ে বসো।
মোকা রাজার গায়ের কাপড়টা আঙুল দিয়ে দেখাল।
ওটা তো তোমার বাবার গায়ে থাকে। ভিজল কী করে?
কাল রাত্রে ৪টা গায়ে দিয়ে যুদ্ধ করতে গিয়েছিলাম। একজন আহত ইকাবোকে বাঁচাতে জলে নেমেছিলাম। তাই ভিজে গিয়েছিল। এই কাপড়ের নাম কোহালহো।
ঠিক আছে, ওটা শুকোক–তুমি ছায়ায় গিয়ে বসো। মোকা মাথা নাড়ল। বলল–ঐ কোহালহো গিয়ানির মন্ত্রপূত। আমাদের রাজবংশে বহুকাল ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কোনোমতেই ঐ কোহালহো আমরা কাছছাড়া করি না। আমাকে এ রোদেই বসে থাকতে হবে।
ফ্রান্সিস কাপড়টাকে একটা সাধারণ গায়ে দেবার কাপড় ভেবেছিল। বলল–কাল রাতে তুমি ওটা গায়ে দিয়েছিলে কেন?
