ফ্রান্সিসরা যখন জাহাজের গায়ে এসে নৌকা লাগাল তখন ভোর হয়ে এসেছে। জাহাজের রেলিং থেকে ঝুঁকে হ্যারি ডাকল ফ্রান্সিস? ফ্রান্সিস উত্তর দিল হ্যারি। তখনই জাহাজে হ্যারির ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকি সুরু হয়ে। গেল। অনেকেই ঘুম থেকে উঠে রেলিঙ দিয়ে ঝুঁকেফ্রান্সিসদের দিকে দড়ি ছুঁড়ে দিল। ফ্রান্সিসরা দড়ি চেপে ধরে রইল। ভাইকিংরা ওদের টেনে টেনে তুলল। একটু পরে কয়েকজন নেমে এসে জলের পিঁপেদুটোও দড়ি বেঁধে জাহাজে তুলল।
নিজের কেবিনঘরে ঢুকে ফ্রান্সিস বিছানায় শুয়ে পড়ল। চোখে হাত চাপা দিল। হ্যারি বলল-তুমি খুব পরিশ্রান্ত। বিশ্রাম কর–পরে আসবো।
ফ্রান্সিস চোখ থেকে হাত সরাল। আস্তে-আস্তে বলল–আমরা ফিরেছি কিন্তু বাকী দুজনের কোনো খোঁজ পাইনি? |||||||||| –
ওদের কি হত্যা করা হয়েছে?
ঠিক বুঝতে পারছি না। তবে ত্ৰিস্তান সেনাপতি অত্যন্ত নিষ্ঠুর লোক। হয়ত মেরেই ফেলেছে ওদের।
হ্যারি কোনো কথা না বলে চুপ করে রইল। তারপর যখন কেবিনঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে, তখন ফ্রান্সিস বলল–বৈদ্যকে একটু পাঠিয়ে দাও তো। বা পা’টা ছড়ে গেছে। সমুদ্রের নোনা জল লেগে জ্বালাটা বেড়ে গেছে। ঘুমোতে পারব না।
পাঠিয়ে দিচ্ছি, ঘুমাবার চেষ্টা কর। পরে সব শুনবো। হ্যারি চলে গেল।
হ্যারির মুখেই ভাইকিংরা ওদের দুই বন্ধুর নিখোঁজ হয়ে যাবার খবর পেল। বন্ধু দুজনের জন্যে ওদের ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল। ওরা ধরেই নিল বন্ধু দুজন বেঁচে নেই।
সেদিন ফ্রান্সিস আর কেবিনঘর থেকে বেরোলো না। সম্পূর্ণ বিশ্রাম নিল। পরের দিন বাইরে এল। ডেক-এ ঘুরে বেড়াল। সবসময়ই ভাবতে লাগল এরপর কী করবো?
একদিন পরে। সেদিন রাতে ফ্রান্সিস ডেক-এ পায়চারী করছিল। হ্যারি এল। ফ্রান্সিস বিস্কোদের নিয়ে পালাবার কাহিনী হ্যারি শুনছিল। ও কাছে আসতে ফ্রান্সিস বলল–হ্যারি একটা বুদ্ধি দাও।
কী ব্যাপার? হ্যারি জানতে চাইল।
এখন কি করবো?
মনে হয় রাজপুত্র মোকার সঙ্গে আগে কথা বল। ও কী বলে শোনা যাক।
তখন দুজন ভাইকিং হালের কাছে শুয়ে ছিল। হ্যারি তাদেরই একজনকে পাঠাল মোকাকে নিয়ে আসতে।
একটু পরেই মোকা এল। ফ্রান্সিসের কাছে এসে দাঁড়াল। ও এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। ফ্রান্সিস বলল–মোকা কঙ্কাল দ্বীপে আমাদের বন্দী হওয়া, পালানো সব কথাই তোমাকে বলেছি। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল-সত্যি কথা বলি এবার। মোকা–আমরা এবার রূপোর নদী খুঁজে বের করতেই এখানে এসেছি।
মোকা চুপ করে কোনো কথা না বলে ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে রইল। ফ্রান্সিস বলল-কিন্তু সমস্যা হচ্ছে কাল দ্বীপ এখন ত্রিস্তানদের দখলে। কাজেই রূপোর নদীর খোঁজ করা এখন অসম্ভব।
মোকা বলল–ত্ৰিস্তানরা ভীষণ হিংস্র। আমাদের ওপর চরম অত্যাচার করেছে। যদি আপনারা আমাদের সাহায্য করেন তবে আমরা কঙ্কাল দ্বীপ থেকে তাদের তাড়িয়ে দিতে পারব।
আচ্ছা যদি আমরা নদী খুঁজে বের করতে পারি নিশ্চয়ই অনেক রূপো পাবো। সেসব কি আমরা নিয়ে যেতে পারবো?
মোকা কোন উত্তর না দিয়ে মাথা নীচু করে ভাবতে লাগল। তারপর মাথা তুলে বলল–এসব নির্ভর করছে কতটা রূপো আপনারা পাবেন তার ওপর। আপনারা বাবার আর আমার প্রাণ বাঁচিয়েছেন। এতেই আমরা আপনাদের কাছে ঋণী। এরপরে যদি ত্রিপ্তানদের পরাজিত করতে আমাদের সাহায্য করেন তাহলে আমাদের কৃতজ্ঞতা আরো বাড়বে। তখন আপনারা যদি রূপো চান মানে যতটা পারেন ততটাই চান তাহলেও আমরা তো না করতে পারবো না।
না মোকা। তোমাদের অসন্তুষ্ট করে আমরা কিছু নেব না।
বেশ। মোকা বলল।
দেখ মোকা–ত্রিস্তানরা আমাদের দুজন বন্ধুকে বন্দী করেছে। তারা বেঁচে আছে, কি তাদের মেরে ফেলা হয়েছে এখনও জানি না। যদি ত্ৰিস্তানরা ওদের মেরে থাকে তা হলে একজন ত্ৰিস্তানকে আমরা ফিরে যেতে দেব না। যদি না মেরে থাকে এবং ওদের জাহাজে ফিরে আসতে দেয় তাহলে তো অন্যায়ভাবে ত্ৰিস্তানদের কোন ক্ষতি আমরা করবো না। তোমাদের সমস্যা তোমরাই মেটাবে।
মোকা মাথা নীচু করে কি ভাবল। তারপর বলল-আমি নিশ্চিত যে ত্ৰিস্তানরা ওদের মেরে ফেলেছে। যদি না মেরে থাকে তাহলে নিশ্চয়ই সেনাপতি কোন চাল চেলেছে। তবে এটা সত্যি, ওদের বেঁচে থাকার কোনো আশা নেই।
আমারাও সেই কথাই ভাবছি। ফ্রান্সিস বলল।
এখন কী করবেন ভাবছেন? মোকা জানতে চাইল।
দুএকটা দিন যাক। এরমধ্যে ওরা না ফিরলে ওদের মুক্ত করবে মরা ত্রিস্তানদের আক্রমণ করবো।
বেশ। মোকা আর কিছু বলল না। চলে গেল।
পরদিন রাত্রে ফ্রান্সিস ডেক-এ পায়চারি করছে। একা। হ্যারি আসেনি তখনও।
হঠাৎ কঙ্কাল দ্বীপের দিকে চোখ পড়তে ফ্রান্সিস চমকেউঠল। কঙ্কাল দ্বীপের বনে আগুনের লাল আভা। বোঝা যাচ্ছে সে আগুন ছড়াচ্ছে। আকাশে চাঁদ অনেকটা উজ্জ্বল। সেই বন থেকে জ্যোৎস্নায় আলোকিত আকাশে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছে। ফ্রান্সিস দ্রুত কেবিন ঘরের দিকে ছুটল। হ্যারিকে ডেকে নিয়ে এল। হ্যারি সেই আগুনের দিকে তাকিয়ে বলল–এ আগুন হঠাৎ লাগেনি। ত্রিস্তানরা লাগিয়েছে। তুমি বলেছিলে বনে আত্মগোপনকারী কয়েকজন ইকাবোকে তুমি দেখেছো। আরো অনেকইকাবো নিশ্চয়ই ঐ বনে আত্মগোপন করে আছে। এই আগুন লাগানোর উদ্দেশ্য হলো ওদের পুড়িয়ে মারা।
ফ্রান্সিস আর হ্যারিকে ছুটোছুটি করতে দেখে ডেকের ওপর শুয়ে থাকা কয়েকজন ভাইকিং-এর ঘুম ভেঙে গেল। ওরা উঠে এসে ফ্রান্সিসের কাছে দাঁড়াল। আগুন দেখল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সব ভাইকিংরা জানতে পারল কঙ্কাল দ্বীপে আগুন লেগেছে। সবাই ডেক-এ এসে জড়ো হলো। রাজপুত্র মোকাও এল। আগুন দেখে ও পাগলের মত ছুটে এল ফ্রান্সিসের কাছে। ফ্রান্সিসের হাত দুটি ধরে কঁদো কাঁদো স্বরে ও বলে উঠল আপনারা ইকাবোদের বাঁচান
