এবার বেরোবার পথ খোঁজা। ওরা সকলেই তখন ভীষণ পরিশ্রান্ত। কিন্তু ফ্রান্সিস ওদের বিশ্রাম করতে দিল না। চেঁচিয়ে বলল–এক মুহূর্তও আর দেরি করা চলবে না। রাত থাকতে থাকতেই আমাদের পালাতে হবে।
ফ্রান্সিস সবার আগে–আগে পায়ে-পায়ে এগোল। দেখল এ জায়গাটাও একটা গুহা মতো। কিছুটা এগোতেই সামনে দেখল যেন একটা অর্ধগোলাকার পর্দা ঝুলছে। তাতে তারা জ্বলছে। আকাশ! ফ্রান্সিস চাপা স্বরে বলল–আমার পেছনে-পেছনে এসো। সামনেই গুহার মুখ।
একটু পরেই গুহাটার মুখে এসে দাঁড়াল সবাই। সামনেই দূরবিস্তৃত আকাশ। বেশ উজ্জ্বল চাঁদ। নরম জ্যোৎস্না ছড়িয়ে আছে চারদিকে–উপত্যকায়, বসতিতে, বনে।
ফ্রান্সিস ইকাবো বন্দীদের আঙ্গুল দিয়ে দূরের বন দেখাল। ইঙ্গিত করল–ওখান দিয়ে আমরা পালাব। বন্দীরা মাথা ঝাঁকাল। মানে-বুঝেছে।
পাহাড়ের মাথা থেকে নীচে ঢালু জমি। ফ্রান্সিস দক্ষিণ দিকে চলল। ম্লান জ্যোৎস্না পড়েছে উপত্যকায়, ঘাসের ঢালু জমিতে, পাথরে। সেই অলোয় ওরা দ্রুত ছুটতে লাগল বনের দিকে।
ওরা দূর থেকে দেখল বনের ধারে আগুন জ্বলছে। আগুন ঘিরে ত্রিস্তান যোদ্ধারা বসে হৈ হল্লা করছে।
দূর থেকে ফ্রান্সিস দেখে আশ্চর্য হলো দ্বীপের বিচিত্র সব পাখি সেই আগুনের কাছে উড়ে উড়ে আসছে। ত্রিস্তান যোদ্ধারা গাছের ডাল দিয়ে গিয়ে পাখি মারছে আর আগুনে পুড়িয়ে খাচ্ছে। আশ্চর্য! মৃত্যু জেনেও পাখির ঝাঁক উড়ে–উড়ে আসছে। ঐ দলের পেছনে বিরাট একটা পাথরের চাঁই। সেটার আড়ালে আড়ালে এগিয়ে গিয়ে ওরা বনে ঢুকে পড়ল।
আর চাঁদের আলো নেই। অন্ধকারেই ছুটতে হচ্ছে ওদের। বনের নীচে ভাঙা–ভাঙা জ্যোৎস্না পড়েছে কোথাও কোথাও। ফ্রান্সিস হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। ও সবার আগে আগে যাচ্ছিল। ওকে থামতে দেখে সবাই থেমে পড়ল। ফ্রান্সিস বলল–বিস্কো, আমরা সামনে যাবে না। ইকাবোদের আগে-আগে ছুটতে দাও। ওরা সহজেই পাতা ফাঁদ দেখে বুঝতে পারবে। তখন সকলেই সাবধান হতে পারব। বিস্কো বলল,–ঠিক বলেছো। ও ইকাবোদের কাছে কাছে ডাকল। তারপর ইঙ্গিতে অঙ্গভঙ্গী করেফাঁদের ব্যাপারটা বোঝাল। বিস্কো কী বলছে সেটা ওরা বুঝল। ওদের মধ্যে একজন বুকে আঙ্গুল ঠুকে সামনের দিকে হাত বাড়িয়ে ধরল। তার মানে ওরা আগ্যোবে।
এবার ইকাবোরা আগে আগে চলল। চলার গতি কমিয়ে চারদিকে তাকাতে তাকাতে ওরা চলল। ফ্রান্সিসরা ওদের পেছনে পেছনে যেতে লাগল।
হঠাৎ নিস্তব্ধ বনে একসঙ্গে কয়েকটা পাখি বিচিত্র সুরে শিস দিয়ে ডেকে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে ইকাবোরা দাঁড়িয়ে পড়ল। ফ্রান্সিসরাও দাঁড়িয়ে পড়ল। একজন ইকাবো মাটিতে উবু হয়ে বসে পড়ল। তারপর পাখির মতো শিস দিল। শিসের শব্দ ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে। হঠাৎ বনের অন্ধকার থেকে তিনজন ইকাবো ওদের সামনে এসে দাঁড়াল।
কাবোরা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরল। মৃদুস্বরে কথা বলতে লাগল। এদিকে দেরি হয়ে যাচ্ছে। ফ্রান্সিস ওদের কাছে গিয়ে ছোটার ইঙ্গিত করল। যারা বনের আড়াল থেকে বেরিয়েছিল তারা আবার অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। ফ্রান্সিস বুঝল ইকাবোরা পাখির মতো শিস দিয়ে পরস্পরকে সঙ্কেত দিতে পারে।
আবার ওরা চলতে লাগল। এত সাবধানতা সত্ত্বেও একজন ইকাবো লতার ফাঁদে আঁটকে গেল। এক ঝটকায় সে উঠে গেল ওপরে। মাথা নীচে ঝুলতে লাগল। আর একজন ইকাবো দ্রুত গাছের কাণ্ড বেয়ে উঠে গেল। যে ডাল থেকেফাঁদটা ঝুলছিল সেই ডালটা ধরে ঝুঁকে ঝুলন্ত লতাটা কামড়াতে লাগল। একটু পরেই লতাটা ছিঁড়ে গেল। ফঁদে আটকানো ইকাবোটিও মাটিতে পড়ে গেল।
আবার চলা শুরু হলো। কিছুদুর যেতেই একটা ঝর্ণার কাছে এল ওরা। ফ্রান্সিস সবাইকে থামতে ইঙ্গিত করল। আঁজলায় জল ভরে ও জল খেতে লাগল। একে একে সবাই জল খেল। বিস্কো বলল-এই ঝর্ণা থেকেই জল নিয়ে ফিরছিলাম আমরা।
তাহলে কাছেই জলের পিঁপে দুটো আছে। ও দুটো পেলে আমরা জল ভরে নিয়ে যাব।
ওরা চলল। কিছুটা এগোতেই জ্যোৎস্নার ভাঙা আলোয় দেখল পিঁপে দুটো পড়ে আছে। একটায় জলভরা আছে। অন্যটা কাত হয়ে পড়ে আছে। ফ্রান্সিস, বিস্কো আর ফার্নান্দো পিঁপেটা নিয়ে ঝর্ণার দিকে ফিরে গেল। একটু পরেই জলভর্তি পিঁপেটা নিয়ে ফিরল। ওরা একটা পিঁপে আর ইকাবোরা অন্য পিঁপেটা নিয়ে চলতে শুরু করল। ফ্রান্সিস এদিক-ওদিক নজর রেখে চলল–যদি হারানো তরোয়ালটা পাওয়া যায়। কিন্তু নজরে পড়লো না। মনটা খারাপ হয়ে গেল ওর।
বনের মধ্যে ত্ৰিস্তানদের ফাঁদ এড়িয়ে ওরা যখন সমুদ্রের ধারে পৌঁছল তখন রাত শেষ হয়ে এসেছে। ওদের ভাগ্য ভাল দেখল তিনটি নৌকাই গাছের ডালের সঙ্গে বাঁধা আছে। গাছের আড়ালে পড়ে গিয়েছিল বলেই নৌকাগুলো ত্ৰিস্তানদের নজরে পড়েনি। নৌকায় কাঠের বৈঠাও রয়েছে। ওরা ধরাধরি করে পিঁপে দুটো একটা নৌকায় তুলল। সেটাতে রইল বিস্কো। ফ্রান্সিস এবার ইকাবোদের ইঙ্গিত করল ওদের সঙ্গে যাবার জন্য। কিন্তু ওরা মাথা ঝাঁকাল। আঙুল দিয়ে বনটা দেখাল। অর্থাৎ ওরা বনে ফিরে যাবে। ফ্রান্সিস ওদের সঙ্গে হাত মেলাল। তারপর একটা নৌকায় গিয়ে উঠল। অন্যটায় উঠল ফার্ণান্দো। নৌকা ছেড়ে দিল। একটা পাক খেয়ে নৌকো ঢেউয়ের ওপর নাচতে-নাচতে চলল। ফ্রান্সিস পেছনে তাকিয়ে আরইকাবোদের দেখতে পেল না। ওরা বনের মধ্যে চলে গেছে।
