ফ্রান্সিস ওদের ইশারায় কাছে ডাকল। এরা উঠে ফ্রন্সিসের কাছে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস একটা ছুঁচোলো মুখ পাথর তুলে নিল। দেওয়ালের মত পাথুরে স্তরে একটা জায়গায় গোলমত দাগ দিল। ওদেরও পাথর তুলতে বলল। বড় বড় পাথরের টুকরো ওখানে এখানে পড়েছিল। ফ্রান্সিস ঐ কিছুটা সমতল দাগ দেওয়া জায়গায় পাথরের ছুঁচালো মুখ খন্ডটা দিয়ে ঘা মারতে লাগল। ওদেরও তাই করতে ইঙ্গিত করল। ওরা এবার ব্যাপারটা বুঝতে পারল দ্রুত হাতে পাথর তুলে নিল। তারপর এলোপাথাড়ি ঘা মারতে লাগল। ফ্রান্সিস ওদের থামিয়ে দিল। দেখিয়ে দিল নির্দিষ্ট জায়গায় কী করে একজন করে পরপর ঘা মারবে। ওরা সেইভাবে ঘা মারতে লাগল। গুহাটায় সেই শব্দ প্রচন্ড জোরে প্রতিধ্বনি হতে লাগল।
ফ্রান্সিস বিস্কোকে বলল–আগেওরা ঘা মারতে থাকুক। ওরা পরিশ্রান্ত হলে আমরা আরম্ভ করবো। চলল ঐ নির্দিষ্ট জায়গাটায় পাথর দিয়ে ঘা মারা। গুহাটায় শব্দ উঠতে লাগল-দুম-দুড়ুম-।
বেশ কিছুক্ষণ ধরে ইকাবো বন্দীরা ঘা মারল। এবার ওরা হাঁপাতে লাগল। দুজন বসে পড়ল। ফ্রান্সিস ওদের সরে যেতে বলল। ওরা বিশ্রাম করতে লাগল।
ফ্রান্সিস কাছে গিয়ে ভালো করে জায়গাটা দেখল। ঘাগুলো ঠিক এক জায়গায় পড়ে নি দুএকটা জায়গায় সামান্য গর্তত হয়েছে। ওর মধ্যে যে জায়গাটা বেশি গর্তমত হয়েছেও সে জায়গাটা বেছে নিল। বিস্কো আর ফার্নান্দোকে জায়গাটা দেখিয়ে বলল–ঠিক এ জায়গাটায় ঘা মারো।
ওরা তিনজন এবার ঘা মারতে লাগল। গুহাটায় দুম দুম শব্দপ্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
বেশ কিছুক্ষণ একটানা ঘা মেরে ওরা ভীষণ পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ল। ঘা মারা থামিয়ে ওরা বসে পড়ল। হাঁপাতে লাগল।
ফ্রান্সিস ওপরে ফোকরটার দিকে তাকাল। দেখল ওখানে আলো কমে এসেছে। তার মানে বিকেল হয়েছে। ভাবল, আজ রাতের মধ্যেই ঐ আস্তরণটা ভাঙতে হবে। তারপর রাতের অন্ধকারে পালানো। ও এবার ইকাবোদের ইঙ্গিত করল। দেখিয়ে দিল কী করে একই জায়গায় পরপর ঘা মেরে যেতে হবে।
আবার ঘা মারা চলল। কিন্তু ঐ জায়গাটায় ফাটল দেখা দিল না।
এবার ফ্রান্সিসরা ঘা মারতে লাগল। চলল ঘা মারা। ফ্রান্সিস ফোকরটার দিকে তাকাল। অন্ধকার হয়ে গেছে। তাহলে বাইরে এখন রাত।
পাথরের ঘা মারা চলল। দুম দুম শব্দও উঠতে লাগল।
হঠাৎ ফার্নান্দোর হাতের পাথর আস্তরণ ভেঙে ঢুকে গেল। জল ছিটকে ঢুকল। ফুটো থেকে পাথরটা খুলে নিয়ে আসতেই ফোয়ারার মতো জল ঢুকতে লাগল। ফ্রান্সিস বলল,-ঘা মারা থামিও না। ফাটল বড় করতে হবে।
ওরা ঘা মেরে চলল। ফাটল আর একটু বড় হলো। কিন্তু মানুষের শরীর বেরোবার মতো বড় হলো না।
ফ্রান্সিস বুঝল-বৃথা চেষ্টা। এর বেশি ফটল বড় হবে না। বাকীটুকু নিরেট। ওদিকে গুহায় জল ছড়িয়ে পড়তে লাগল।
বিস্কো শঙ্কিত স্বরে ডাকল? |||||||||| -ফ্রান্সিস?
বলো।
গুহায় জল জমছে। আমরা কী করবো?
এই সম্ভাবনাটা আমি আগেই ভেবে রেখেছি। ফ্রান্সিস বলল।
কী ভেবেছ তুমি?
জল বাড়বে। ডুব জল হলে আমরা ভেসে থাকবো। জল উঁচুতে উঠতে থাকবে! আমরাও উঁচুতে উঠতে থাকবে। তারপর ঐ ফোকরে পৌঁছে যাব।
বিস্কো আর ফার্নান্দো একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল-ও হো হো। বিস্কোদুহাতেফ্রান্সিসকে জড়িয়ে বলে উঠল-সাবাস ফ্রান্সিস।
ওদিকে ইকাবো বন্দীরা শঙ্কিতভাবে দেখতে লাগল যে গুহায় জল জমেছে। ওরা ভয়ে পাথুরে দেয়াল বেয়ে উঠতে লাগল। কিন্তু খাড়া দেয়াল। উঠবে কি করে?
ফ্রান্সিস ওদের সাঁতারের ভঙ্গি দেখাল। ওরা মাথা ঝাঁকাল। অর্থাৎ সাঁতার জানে। ওরা দ্বীপবাসী। সাঁতারে ওস্তাদ। ফ্রান্সিস তারপর আঙুল দিয়ে ওদের ওপরের ফোকরটা দেখাল। এতক্ষণে ওরা ফ্রান্সিসের পরিকল্পনাটা বুঝতে পারল। হাসি ফুটল ওদের মুখে।
গুহাটায় আস্তে-আস্তে জল বাড়তে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই হাঁটু অব্দি জল উঠল। ওদিকে ফুটো দিয়ে প্রচণ্ড বেগে জল ঢুকছে। জলও বাড়ছে। গুহার মুখের পাথরটা এমন এঁটে বসে গেছে যে ওখান দিয়ে এক ফোঁটা জলও বেরোতে পারছে না।
সময় কাটতে লাগল। জল বাড়তে লাগল। আস্তে আস্তে কোমর অব্দি জল উঠল। বাড়তে লাগল জল। আস্তে-আস্তে কাঁধ পর্যন্ত জল উঠল। ওরা হাতে পায়ে জল ঠেলতে ঠেলতে ভেসে রইল।
আরো বাড়ল জল। ওরা একই ভাবে ভেসে রইল।
আস্তে আস্তে জলের স্তর গুহার মাথার কাছে চলে এল। মশালটা নিভে গেছে ততক্ষণে। চারিদিক অন্ধকার। শুধু ফোকরটা দিয়ে একটু আলোর আভাস।
ফ্রান্সিস ফোকরটার কাছে এসে পায়ে ধাক্কা দিয়ে লাফিয়ে ফোকরের পাথুরে খাঁজটা ধরে ফেলল। তারপর শরীরে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে ফোকরের ওপর উঠে এল। পরিশ্রমে ও হাঁপাতে লাগল। চারদিকে তাকাতে লাগল। কিন্তু অন্ধকারে কিছুই বুঝল না। ভাবল বেরোনোর পথ পরে খোঁজা যাবে, আগে ওদের সবাইকে টেনে তুলি।
ও ফোকরটার দুপাশে পায়ের ভর রেখে মাথা নিচু করে ডাকল–বিস্কো এই দিকে। অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ফ্রান্সিসের গলারশব্দ লক্ষ্য করে বিস্কো সাঁতরাতে সাঁতরাতে এগিয়ে এল। হাত বাড়াল। ফ্রান্সিস ওর বাড়ানো হাতটা ধরে একহ্যাঁচকা টানে ওকে ওপরে তুলে নিল। বিস্কো বসে পড়ে হাঁপাতে লাগল। ফ্রান্সিস এবার চেঁচিয়ে সবাইকে ডাকতে লাগল। ওর কণ্ঠস্বর লক্ষ্য করে সবাই অন্ধকারে সাঁতরাতে সাঁতরাতে ওর কাছে এল। ও একে-একে সবাইকে তুলে নিল।
