হ্যাঁ দেখেছি–নিরেট পাথর চারদিকে।
কিন্তু কোথাও না কোথাও ফাঁকফোকর নিশ্চয়ই আছে। নইলে এই বদ্ধ গুহায় তোমরা মরে যেতে।
হ্যাঁ, একটা বড় ফোকর আছে ওপরে দিকে। ঐ দেখ। বিস্কো আঙুল দিয়ে দেখাল। ফ্রান্সিস দেখল গুহাটার হাতের দিকে একটা বড় পাথুরে ফোকর। দুজন মানুষ একসঙ্গে বেরোতে পারে এরকম ফোকর। কিন্তু এত উঁচুতে ওঠা? অসম্ভব। গুহার মুখের পাথরটাও এমন চেপে বসে আছে যে সামান্যতম ফাঁকও নেই। তাছাড়া ওটা সরানো পাঁচ ছয়জনের পক্ষে সম্ভব নয়। বিস্কো বলল–ঐ ফোকরটা দেখেই আমরা রাত-দিনের পার্থক্য বুঝতে পারি। ওখানে দিনের বেলা আলো থাকে।
ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল! ভীষণ ক্লান্ত লাগছে শরীর। ছড়ে যাওয়া পায়ের জ্বালাটাও কমে নি। কিন্তু এখন বিশ্রামের সময় কোথায়। ও পাথুরে মেঝের ওপর এদিক ওদিক পায়চারি করল কিছুক্ষণ। তারপর পাথরের খাঁজ থেকে মশালটা তুলে নিয়ে সমস্ত গুহাটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। চারদিকেই নিরেট পাথর। গুহার শেষ মাথায় দেয়ালের মতো সমান কিছুটা জায়গা। এখানে ওখানে পাথুরের বড় বড় টুকরো ছড়ানো। ফিরে এসে গুহাটার মাঝামাঝি দাঁড়ালো। ওপরদিকে বড় ফোঁকরটা দেখল। তারপর বিস্কোকে ডাকল। বিস্কো কাছে এলে ওর হাতে মশালটা দিয়ে পাথুরে দেয়ালের খাঁজে খাঁজে পা রেখে ঐ ফোকরটার দিকে উঠতে লাগল। কিছুটা উঠল। কিন্তু ফোকরটা তখনও বেশ দূরে। আর এগোতে পারল না। পাথুরে দেয়ালের খাঁজে শরীরের ভারসাম্য রাখা যাচ্ছেনা। ও পাথুরে খাঁজে খাঁজে পা রেখে নেমে এল।
যে চারজন ইকাবো মেঝেয় শুয়েছিল তারা এবার উঠে বসল। ফ্রান্সিসের কাণ্ডকারখানা দেখতে লাগল। ফ্রান্সিস পাথুরে দেয়াল থেকে নেমে বসল। হাঁপাতে লাগল।
এমন সময় গুহার মুখের পাথরটা সরে যেতে লাগল। বিস্কো ফ্রান্সিসকে ফিসফিস করে বলল–খাবার দিতে যে লোকটা ঢুকবে তাকে খতম করে তো আমরা পালাতে পারি।
ফ্রান্সিস হাসল–পাগল হয়েছে। এই পাথর সরাতে অন্তত কুড়িজন ত্রিস্তান ওর সঙ্গে আসে। আমরা তো মোট সাতজন। তাও নিরস্ত্র।
দুজন ত্রিস্তান গুহায় ঢুকল। হাতে হাতে করে কয়েকটা মাটির পাত্রে খাবার ওদের সামনে রাখল। ম্যাকরেল মাছসেদ্ধ, বুনো কলা আর বুনো আলুসেদ্ধ। বিস্কো চিৎকার করে বলে উঠল–নিয়ে যা এসব। আমার বন্ধুদের হত্যা করেছিস তোরা, তোদের দেয়া খাবার থু-থু। বিস্কো থুতু ফেলল। লোক দুটো বেশ রেগে গেছে মুখ দেখেই বোঝা গেল। বিস্কো বলল–কাল রাত্রেও ওদের দেওয়া খাবার আমরা খাইনি। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল আহাম্মকের কাজ করেছে। না খেলে দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়বে–পালানোর কোন আশা থাকবে না। বরং বেশী বেশী করে খাবে। শরীরে জোর রাখবে তবে না পালাতে পারবে। খেয়ে নাও।
বিস্কো আর আপত্তি করল না। ওদের দেখাদেখি ইকাবো বন্দীরাও খেতে লাগল। খাওয়া শেষ করে ফ্রান্সিস ইঙ্গিতে আরো খাবার চাইল। ওরা খাওয়া নিয়ে ঝামেলা পাকাচ্ছে না দেখে ত্ৰিস্তান যোদ্ধা দুটি খুশি হলো। একটা বড় মাটির পাত্র নিয়ে এল। বোধ হয় ওদেরও খাবার আছে ওর মধ্যে। ফ্রান্সিস তাই চেয়ে চেয়ে খেল। বিস্কোরাও বেশী করে খেল। আর কেউ বেশী চাইল না। ত্ৰিস্তান দুজন এঁটো পাত্র নিয়ে চলে গেল। একটু পরে বড় কাঠের পাত্রে জল নিয়ে এল। নারকেলের মালা চুবিয়ে জল নিয়ে ফ্রান্সিসরা খেল। পেট ভরে জল খেল ফ্রান্সিস, এত জলতেষ্টা পেয়েছিল ও বুঝতেই পারেনি।
ত্রিস্তান দুজন চলে গেল। গুহার মুখে পাথরটার চাপা দিয়ে গেল। ফ্রান্সিস উঠে পাথরটা কাছে গেল। দেখল মুখেমুখে চেপে বসে গেছে। জলও গলবেনা এমন নিরেটভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
ফ্রান্সিস ফিরে এসে পাথুরে মেঝেতে শুয়ে পড়ল। বিশ্রাম নিল কিছুক্ষণ। পাশ ফিরে ইকাবো বন্দীদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করল। কিন্তু ওরা ফ্রান্সিসের কোনো কথাই বুঝতে পারল না। হাল ছেড়ে দিয়ে ফ্রান্সিস চোখ বুজে বিশ্রাম করতে লাগল।
একটু তন্দ্রাও এসেছিল। কিন্তু পায়ের ছড়ে যাওয়া জায়গাটায় জ্বালা করে উঠল। তন্দ্রা ভেঙে গেল। হঠাৎই মনে পড়ল দেশের কথা। বাবার কথা। মারিয়ার কথা। কোথায় বাড়ির ধপধপে সাদা পালকের নরম বিছানা আর কোথায় ও শুয়ে আছে। এবড়ো খেবড়ো পাথুরে মেঝে। পিঠের হাড়ে খোঁচা দিচ্ছে। মৃদু হাসি ফুটলো ফ্রান্সিসের মুখে। যাও সব। ও এক ঝটকায় উঠে পড়ল।
আবার মশালটা নিয়ে গুহার পাথুরে দেওয়ালগুলো ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল। আবার এল গুহার শেষে। সেই একটু সমতল একটা পাথরের স্তর। ও সমতল স্তরটায় একটা পাথর দিয়ে ঠুকতে লাগল। আশ্চর্য! নিরেট পাথরের আওয়াজ পাতলা? ফ্রান্সিস দেওয়ালের মতো জায়গাটায় কান চেপে ধরল। খুব মৃদু শব্দ। প্রায় ধরাই যায় না। জলের শব্দ।
ফ্রান্সিস লাফিয়ে উঠল। চেঁচিয়ে বিস্কোকে ডাকল। ওর চড়া গলায় ডাকের শব্দটা গুহার মধ্যে গমগম করতে লাগল। বিস্কো ছুটে ওর কাছে এল। বলল-কি ব্যাপার?
এই জায়গাটায় কান পেতে শোনো তো কোন শব্দ শুনতে পাও কিনা দেখতো? বিস্কো ঐ জায়গাটায় কান চেপে পাতল। একটু পরেই ওর মুখে হাসি ফুটে উঠল। চেঁচিয়ে বলে উঠল-ফ্রান্সিস, জলের শব্দ। ফ্রান্সিস বলল–এখানটায় পাথুরে আস্তরণটা বেশী মোটা নয়। মনে আছে মোক বলেছিল, কিছুদিন আগে এই দ্বীপে ভূমিকম্প হয়ে গেছে। কাজেই পাথর মাটির স্তরে কিছু পরিবর্তন ঘটা আশ্চর্য নয়। ফ্রান্সিস তারপর চেঁচিয়ে ফার্নান্দোকে ডাকল-ফার্নান্দো, আমরা প্রায় মুক্তির দোরগোরায়। ফার্নান্দোও ছুটে এল। কান পাতল, ওর মুখে হাসি ফুটে উঠল। ইকাবো বন্দীরা অবাক চোখে ওদের কাণ্ডকারখানা দেখল। ওরা বুঝে উঠতে পারল না এত খুশি হবার কী কারণ ঘটল।
