একজন ত্রিস্তান দলনেতার সামনে এসে দাঁড়াল। উবুহয়ে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে দলনেতাকে সম্মান জানাল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে ত্রিস্তান ভাষায় গঙ্গাড় করে কী বলে গেল। ফ্রান্সিস তার বিন্দুবিসর্গও বুঝল না। দলনেতা তাকে কয়েকটা প্রশ্ন করলেন। যোদ্ধাটি উত্তর দিল। এবার দলনেতা একজন পারিষদের দিকে তাকিয়ে কী বললেন। সেই পারিষদটি উঠে দাঁড়িয়ে ফ্রান্সিসকে আস্তে আস্তে ভাঙ্গা ভাঙ্গা স্প্যানিশ ভাষায় জিজ্ঞেস করল–তুমি কে? ফ্রান্সিস আশ্বস্ত হলো যে যাহোক একজনকে পাওয়া গেল যে ওর কথা কিছু বুঝবে। ফ্রান্সিস বলল–আমরা জাতিতে ভাইকিং।
তুমি এসেছো কেন? বৃদ্ধটি জিজ্ঞেস করল।
জাহাজে জল ফুরিয়ে গেছে, জল নিতে এই দ্বীপে এসেছিলাম। থেমে থেমে বৃদ্ধটি বলল-যুদ্ধ হয়েছে–আমরা জিতেছি–রাজা মরেছে। বনে আমাদের পাতা ফাঁদে তুমি ধরা পড়েছে। এসময় দলনেতা বৃদ্ধটিকে কী বললেন। বৃদ্ধ বলল–সেনাপতি বলছেন–তুমি গুপ্তচর ত্রিস্তানদের ক্ষতি করতে তুমি এখানে এসেছে। ফ্রান্সিস এবার সেনাপতির দিকে তাকালো। বলল–আপনি ভুল করছেন। আমার আগে আরো চারজন ভাইকিং এই দ্বীপে এসেছে–জল নিতে। তারা জল নিয়ে ফিরতে পারেনি। তাই তাদের খোঁজে আমি এসেছিলাম। বৃদ্ধটি সেনাপতিকেত্ৰিস্তান ভাষায় সব বলল। সেনাপতি উত্তরে কী বললেন। বৃদ্ধটি বলল–সেনাপতি বলছেন–সেই চারজনও ধরা পড়েছে। তোমরা গুপ্তচর।
ফ্রান্সিস চমকে উঠল। তাহলে বিস্কোরাও ধরা পড়েছে। ও চিৎকার করে বলল আমরা কোন অপরাধ করিনি। যুদ্ধেও অংশ নিইনি। দ্বীপের দক্ষিণে আমাদের জাহাজ রয়েছে। জল নিয়ে জাহাজে যাবো। তারপর জাহাজ ছেড়ে দেব।
বৃদ্ধটি সেনাপতিকে বলল সে কথা। সেনাপতি মাথা ঝাঁকিয়ে কী বলে সিংহাসন থেকে উঠে দাঁড়ালেন। বৃদ্ধটি বলল-সেনাপতি বলছেন–প্রাণদণ্ড।
ফ্রান্সিস বুঝল–এই সেনাপতি নির্মম। নরহত্যা তার কাছে কিছু না। সেনাপতি ঘরে ফিরে গেলেন।
কয়েকজন ত্ৰিস্তান যোদ্ধা এসে ফ্রান্সিসকে ধাক্কা দিয়ে হাঁটবার ইঙ্গিত করল।
ওখান থেকে পাহাড়ের ঢাল নেমে গেছে উপত্যকার মতো একটা জায়গায়। উপত্যকার কাছাকাছি আসতেই ফ্রান্সিস দেখতে পেল ইকাবোদের রূপোর মন্দিরটা। প্রায় কুড়ি ফুট উঁচু মন্দিরটা। চারকোণা। থামগুলো নিরেট রূপোর। সামনেও অর্ধবৃত্তাকারে কয়েকটা রূপোর থাম। মোটা মোটা থাম। মন্দিরের মধ্যে গিয়ানি দেবতার মূর্তি। চৌকোণা একটা কাঠের থাম কুঁদে কুঁদে তৈরী হয়েছে গিয়ানির মূর্তি। মন্দিরের মাথার ছাউনি তাসাক ঘাস আর নারকেল পাতায় শক্ত করে বোনা। থামগুলোতেও কুঁদে কুঁদে নানা কারুকাজ করা প্রচুর কাঁচা রূপো না পেলে এত বড় মন্দির তৈরী করা যায় না। রূপোর নদী ছেলে ভুলানো গপপো নয়। সত্যি এরকম কিছু ছিল। যেখান থেকে মোকার পুর্বপুরুষরা প্রচুর রূপো পেয়েছিল। ফ্রান্সিস উপত্যকা দিয়ে একটা ছোট নদী বয়ে যেতে দেখল। এটাই তাহলে কুনহা নদী।
উপত্যকা পার হয়ে ওরা এবার ওপরের দিকে উঠতে লাগল। বেশ কিছুটা ওঠবার পর ওরা একটা গুহার সামনে এসে দাঁড়াল। এবার ফ্রান্সিস ফিরে দাঁড়াল। দেখল প্রায় কুড়ি পঁচিশজন ত্ৰিস্তান যোদ্ধা এসেছে। কারণটা একটু পরেই বুঝল যখন সবাই মিলে গুহার মুখের পাথরটা ঠেলতে লাগল। কিছুক্ষণ ঠেলাঠেলির পর গুহার মুখের পাথরটা কিছুটা সরে গেল। সেই ফাঁক দিয়ে ত্রিস্তান যোদ্ধারা ফ্রান্সিসকে ঠেলে ঢুকিয়ে দিল। তারপর পাথর ঠেলে গুহার মুখ বন্ধ করতে লাগল।
গুহার ভেতরটা প্রায় অন্ধকার। প্রথমে ফ্রান্সিস কিছুই দেখতে পেল না। একটা ভ্যাপসা গরম অনুভব করল। পাথুরে দেয়ালের খাঁজে একটা মশাল জ্বলছে। সেই মশালের নীচে এসে ও দাঁড়াল। পাথুরে মেঝেতে কয়েকজনকে শুয়ে থাকতে দেখল। ও কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুজন লোক এসে ওকে জড়িয়ে ধরল। বিস্কো? ফার্নান্ডো? ফ্রান্সিস খুশিতে চিৎকার করে উঠল–তোমরা বেঁচে আছো? কিন্তু আর দুজন কোথায়?
বলছি। বিস্কো বিষণ্ণ স্বরে বলল–বসো।
ততক্ষণে অন্ধকারে ফ্রান্সিসের চোখ অনেকটা সয়ে এসেছে। দেখল আরো চারজন মেঝেতে শুয়ে আছে। ওরা ইকাবো। কিন্তু বন্ধু দুজন কোথায়?
ফ্রান্সিস মেঝেতে বসল। বিস্কো ফার্নান্দো বসল। ফ্রান্সিস বলল–কী হয়েছিল বলো তো?
আমরা পিঁপে ভর্তি করে জল নিয়ে ফেরার পথে গর্ত-ফাঁদে আটকে পড়ে গিয়েছিলাম। ত্রিস্তানরা আমাদের বন্দী করে ওদের রাজার কাছে নিয়ে আসে। বিস্কো বলল।
রাজা নয়, ও সেনাপতি। লোকটা সাপের মতো ধূর্ত আর বাঘের মত হিংস্র।
একজন বৃদ্ধ ভাঙা ভাঙ স্প্যানিশ ভাষায় আমাদের জানাল আমাদের নাকিপ্রাণদণ্ড হয়েছে। তারপর এই গুহায় এনে বন্দী করল।
তারপর?
তারপর কয়েকজন বন্দী ইকাবোর সঙ্গে আমাদের দুই বন্ধুকে ধরে নিয়ে গেল। ওরা কেউ আর ফেরেনি। বিস্কো আস্তে আস্তে বলল।
বন্ধুদের এই মৃত্যুসংবাদে ফ্রান্সিস প্রথমে চমকে উঠল। তারপর গভীর দুঃখে ওর বুক ভেঙে যেতে লাগল। ও কথা বলতে পারল না। ওর শরীরটা থর থর করে কেঁপে উঠল। একটু ফুঁপিয়ে উঠল ও। বিস্কো ফ্রান্সিসের কাঁধে হাত রেখে চাপ দিল। মৃদুস্বরে। বলল–ফ্রান্সিস আমরা এখনো মুক্ত নই। ভেঙে পড়লে চলবে না।
ফ্রান্সিস স্থির হলো। চোখ মুছে বলল-পালাতে হবে।
কিন্তু কী করে?
ত্রিস্তানরা কীভাবে আমাদের খেতে দেয় কীভাবে পাহারা দেয় সেটা খুঁটিয়ে দেখি–তারপরই পালাবার পরিকল্পনা করবো। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল–আচ্ছা গুহাটার চারধার ভালো করে দেখেছো?
