বেশ কিছুক্ষণ কাটল। মাঝে মাঝে তামত এল। কিন্তু পায়ের অসহ্য জ্বালায় তন্দ্রা ভেঙ্গে যেতে লাগল।
কতক্ষণ এভাবে ফ্রান্সিস ঝুলে রইল ও জানে না। চারপাশের বনে জঙ্গলে পাখি ডাকতে লাগল। বিচিত্র ডাক পাখিগুলোর।
ওপরে গাছের পাতার ফাঁকগুলো দিয়ে ফ্রান্সিস দেখল আকাশ আর কালো নয়। তাহলে ভোর হয়েছে। গাছের নীচের অন্ধকার তখনও কাটেনি। ও নিরুপায়। কিছুই করার নেই ভাগ্যের হাতে নিজেকে সঁপে দেওয়া ছাড়া। হাতে তরোয়ালটা থাকলে তবু কিছু করতে পারত। কিন্তু এখন একেবারেই অসহায, অসহ্য ক্লান্তিতে শরীর ভেঙ্গে পড়ছে যেন।
ফ্রান্সিস আর ওভাবে বেশীক্ষণ থাকতে পারল না। বুনো লতাটা থেকে হাত ছেড়ে দিল। আবার মাথা নিচু পা ওপরে করে ঝুলতে লাগল।
কতক্ষণ এভাবে ঝুলে রইল তা ও হিসেব করতে পারল না। হঠাৎ বনের মধ্যে কাদের কথাবার্তা ভেসে আসতে লাগল। তখন বনের নীচে কিছুদুর পর্যন্ত বেশ দেখা যাচ্ছে।
ফ্রান্সিস দেখল পাঁচজন লোক কথা বলতে বলতে আসছে। দুর্বোধ্য সেই ভাষা। হাতে ওদের কাঠের লম্বা বশী। মাথাটা ছুঁচলো। ওদের পরনে তাসক ঘাসের ঘাগরা। গায়ে কিছু নেই। কপালে গালে বুকে লাল সাদা রঙের দাগ। ফ্রান্সিস বুঝল–এরা ত্ৰিস্তান যোদ্ধা। ফাঁদে কেউ ধরা পড়ল কিনা খুজতে এসেছে। ওরা এসব ফাঁদ পেতেছে নিশ্চয়ই পলাতক ইকাবোদের ধরবার জন্যে।
ওরা একটু দূর থেকেই ফ্রান্সিসকে ঝুলতে দেখল। সবাই একসঙ্গে দুর্বোধ্য ভাষায় কী বলে চিৎকার করে উঠল। ছুটে ওরা সিডার গাছটার নীচে এল। একজন টিকটিকির মতো গাছের কাণ্ড বেয়ে ওপরে উঠে গেল। তরতর করে ডাল ধরে ধরে ফ্রান্সিস যে ডাল থেকে ঝুলছিল সেইটার কাছে এল। কোমর থেকে একটা ধারালো লোহার টুকরো বের করল। সেটা দিয়ে ফাঁদের তলাটা কাটতে লাগল। ফ্রান্সিস বুঝল মাথা সোজা করে মাটিতে পড়লে ও ভীষণভাবে আহত হবে। তাই শরীরটা বেঁকিয়ে ও তৈরী হলো। লতাটা কাটা হতেই পিঠ দিয়ে একটা ঝোঁপের ওপর পড়ল। ঘাড়ে লাগল তবু। উঠে দাঁড়াতে গিয়ে পারল না। আবার শুয়ে পড়ল। ত্ৰিস্তান যোদ্ধারা বর্শা উঁচিয়ে ছুটে এল। ফ্রান্সিসকে তুলে ধরল। ও একবার ভাবল ছিটকে যাওয়া তরোয়ালটা খুঁজে বের করবে। পরক্ষণেই ভাবল তরোয়ালের কথা বললে হয়তো ত্ৰিস্তানরা ক্ষেপে যাবে। বিপদ বাড়বেই তাতে। বরং চুপচাপ থাকা যাক। দেখা যাক ওকে ত্রিস্তানরা কী করে।
ত্রিস্তান যোদ্ধারা নিজেদের ভাষায় কী বলাবলি করল। তারপর ফ্রান্সিসকে ধাক্কা দিয়ে চলবার ইঙ্গিত করল। ধাক্কা খেয়ে ফ্রান্সিস রাগে জ্বলে উঠল। কিন্তু কোনো কথা বলল না। ওদের নির্দেশমত হাঁটতে লাগল। ছড়ে-যাওয়া পাটা অসম্ভব জ্বালা করছে। কিন্তু উপায় নেই। ওদের অবাধ্য হলে হয়তো প্রাণ বিপন্ন হতে পারে।
ফ্রান্সিসকে সামনে রেখে ত্ৰিস্তান যোদ্ধারা পেছনে চলল।
কিছুক্ষণ বনের মধ্যে দিয়ে চলার পর বনের বাইরে এল ওরা। ঘাস, বুনো ঝোপে ঢাকা প্রান্তর উঠে গেছে পাহাড়ের দিকে। উজ্জ্বল রোদে দেখা গেল পাহাড়ের ন্যাড়া মাথাটা। সবুজের চিহ্ন নেই ওখানে। নিরেট কালচে পাথরের প্রায় গোল মাথাটা। ফ্রান্সিস দুর থেকে দেখেছিল পাহাড়ের মাথাটা। এবার কাছ থেকে উজ্জ্বল রোদে দেখল। ঠিক মানুষের মাথার করোটির মতো দেখতে। চোখের ফুটোর মতো বড় একটা গর্তও দেখা যাচ্ছে। অন্য গর্তটা আধ-ভাঙা। দ্বীপের উত্তর দিকটাই বসতি এলাকা। সেখানে যখন পৌঁছল তখন বেশ বেলা হয়েছে। একটু দূরে দূরে তাসক ঘাসের ছাউনি দেওয়া পাথর দিয়ে তৈরী ইকাবোদের বাড়ি দেখা গেল। পাথর সাজিয়ে বেশ শক্ত করেই বাড়িগুলো তৈরী।
ফ্রান্সিসকে সামনে রেখে ত্ৰিস্তানরা হেঁটে আসছিল। বাড়িগুলো থেকে ত্রিস্তান যোদ্ধারা বেরিয়ে এল। দেখতে লাগল বন্দী ফ্রান্সিসকে, পেছনের যযাদ্ধার দলকে। সবই ইকবোদের বাড়ি। হয়তো ইকাবোরা পালিয়েছে, নয়তো ওদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কয়েকটা বাড়ি ঘর ছাড়া বাকিগুলো যোদ্ধারা দখল করে নিয়েছে।
পাহাড়ের মাথার নীচে যেখান থেকে ঘাস-ঢাকা জমি শুরু হয়ে নীচে নেমে এসেছে সেখানেই ছাড়া ছাড়ি বাড়ি নিয়ে বসতি এলাকা। যে কিছু ইকাবো বৃদ্ধ আর মেয়েরা ও শিশুরা ছিল তারা ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে রইল। পাথরের বাড়িঘর ছাড়িয়ে পাহাড়ের মাথার কাছাকাছি আসতে দেখা গেল একটা বড় ঘর। কাঠ আর পাথরের। চালাটা তাসক ঘাসের হলেও ভালোভাবে তৈরী। ফ্রান্সিস আন্দাজে বুঝল এটা নিশ্চয়ই রাজার বাড়ি। ইকাবোদের রাজা তো এখন জাহাজে। ত্ৰিস্তানদের রাজা নিশ্চয়ই এখানে আস্তানা গেড়েছে।
অনেক ত্রিস্তান যোদ্ধা ওদের পিছনে পিছনে রাজবাড়ির দিকে আসতে লাগল। রাজবাড়ির বাইরে একটা পরিচ্ছন্ন প্রাঙ্গণ। তার দুপাশে পাথরের আসন মতো সাজানো।
প্রাঙ্গণের মাঝখানে ফ্রান্সিসকে দাঁড় করানো হলো। দুজন ঢুকল রাজার ঘরের মধ্যে। এর মধ্যে পাঁচ ছজন ত্রিস্তানপ্রাঙ্গণের দুপাশে রাখা পাথরগুলোতে বসল। ওরা সবাই বয়স্ক, বৃদ্ধ। বোঝা গেল ওরা যোদ্ধা নয়। রাজার পরামর্শদাতা, পারিষদবর্গ।
একটু পরেই ঘরটা থেকে যিনি বেরিয়ে এলেন তিনি খুব বলিষ্ঠ দেহী ত্রিস্তান। মুখে বুকে উঁকি আঁকা। নাক টিকালো, মাথার লম্বা চুল পিছনের দিকে ঝুঁটি করে বাঁধা। ফ্রান্সিস ধরে নিল ইনিই ত্ৰিস্তানদের দলনেতা। তিনি বেরিয়ে আসতে পাথরের ওপর বসে থাকা বৃদ্ধরা উঠে দাঁড়াল। ঘর থেকে একটা কাঠের সিংহাসন মতো এনে বাইরে রাখা হলো। সিংহাসনে বসার জায়গায় পাখির পালকের গদি। বলিষ্ঠদেহী লোকটি একবার চারদিকে চেয়ে নিয়ে কাঠের সিংহাসনে বসলেন।
