ঠিকআছে। ফ্রান্সিস বলল-ওদের উত্তরের জঙ্গলেরমধ্যে দিয়েই যেতে বলবো।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি ডেক-এ উঠে এল। বিস্কো আর তিনজন ভাইকিংকে নিয়ে তৈরী হয়ে ফ্রান্সিসের জন্যে অপেক্ষা করছিল। ফ্রান্সিস বলল-বিস্কো-দুটো জলের পিঁপে নিয়ে যাও। কিন্তু এদিকের সমুদ্রের তীরে নামা চলবে না। তোমাদের যেতে হবে উত্তর দিকে। সেখানে খাঁড়ি আছে। সেখানে নেমে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পাহাড়ের দিকে যাবে। পাহাড়ের কাছাকাছি পৌঁছে ঝর্ণা পাবে। রাস্তামত নাকি আছে ওখানে। কিন্তু সেই রাস্তা দিয়ে যাবে না। ত্রিস্তান যোদ্ধারা পাহারা দিচ্ছে সেই রাস্তা।
ঠিক আছে। আমরা নৌকা নিয়ে উত্তর দিক থেকে দ্বীপে যাবো।
বিস্কোরা চলে গেল। একটু পরেইদুটো নৌকায় ওরা দুটো জলের পিঁপে নামাল। তারপর নৌকো চলল কঙ্কাল দ্বীপের দিকে। আকাশে ভাঙা চাঁদ। স্নান জোৎস্নায় ওরা নিঃশব্দে নৌকো বেয়ে চলল।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি জাহাজ থেকে তাকিয়ে রইল ওদের নৌকোর দিকে। একটু পরে আর নৌকো দেখা গেল না। পাতলা কুয়াশায় আড়াল পড়ে গেল। ওরা নিজেদের কেবিনে এসে শুয়ে পড়ল।
ভোরহলো। বেলা বাড়ল। কিন্তু বিস্কোদের নৌকোর দেখা নেই। হ্যারি ফ্রান্সিসের কাছে এল। বেশ চিন্তিত স্বরে বলল-ওরা ফিরলো না। কী ব্যাপার বলল তো?
চিন্তার কথা। দেখি আজকের দিনটা। হরি বলল।
সারাদিনই ফ্রান্সিসের চিন্তায় চিন্তায় কাটল। বিষ্ণোদের নৌকোর দেখা নেই।
সন্ধ্যে হলো। রাত বাড়তে লাগল! সবাই ডেক-এ এসে জড়ো হলো। তাকিয়ে রইল কঙ্কাল দ্বীপের দিকে। বিস্কোদের নৌকোর কোনো পাত্তাই নেই। কয়েকজন ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল ওরা বিস্কোর খোঁজে দ্বীপে যাবে। ফ্রান্সিস মাথা নাড়ল। বলল–না আমি একা যাবো। হ্যারি আপত্তি করল। ফ্রান্সিস বুঝিয়ে বলল–বিস্কোরা নিশ্চয়ই ত্রিস্তানদের হাতে ধরা পড়েছে। আমি একা বোকার মতো ওদের সঙ্গে লড়তে যাবো না। শুধু কী ঘটেছে সেটা জেনে আসবে। তারপর সবাই মিলে যাবো। লড়াই যদি করতে হয় তখনি করবো।
রাত একটু গম্ভীর হলে ফ্রান্সিস পোশাক পরে নিল। কোমরে তরোয়াল গুঁজল। তারপর দড়ি বেয়ে জাহাজ থেকে নৌকোয় নেমে এল। আজকের চাঁদ আরো উজ্জ্বল। জ্যোৎস্নায় চিকচিক করছে ঢেউয়ের মাথা।
ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বৈঠা বাইতে লাগল। ঢেউয়ের দোলায় দুলতে দুলতে নৌকো এগিয়ে চলল কঙ্কাল দ্বীপের দিকে।
উত্তর দিক থেকে ঘুরে যেতে হলো বলে একটু দেরীই হলো কঙ্কাল দ্বীপে পৌঁছতে। উত্তর দিকের দ্বীপের খাঁড়িগুলোতে দেখল অনেক ক্যানো নৌকো বাঁধা। ফ্রান্সিস নৌকা নিয়ে তীরের জঙ্গলের আড়ালে আড়ালে এগিয়ে চলল। তখনি আবছা জ্যোৎস্নায় দেখল ওদের দুটো নৌকো একটা খাঁড়িতে বাঁধা। ফ্রান্সিস বুঝল–এখানেই বিস্কোরা নেমেছে। ফ্রান্সিসও নৌকোটা ভেড়াল ওখানে। একটু নীচ কেপড়া গাছের ডালে নৌকোটা দড়ি দিয়ে বেঁধে ও মাটিতে নামল। বনের মধ্যে দিয়ে চলল পাহাড়টার দিকে।
বনের নীচে অন্ধকার গভীর। যেখানে গাছগাছালি একটু কম সেখানে ভাঙা জ্যোৎস্না পড়েছে ঘাসে ঝোপে। বিচিত্র সব শব্দ শোনা যাচ্ছে। কয়েকটা নিশাচর পাখি ডানা ঝাঁপটাল। এক গাছ থেকে উঠে অন্য গাছে গিয়ে বসল।
ফ্রান্সিস কোমর থেকে খুলে তরোয়ালটা হাতে নিল। তারপর নিঃশব্দে এগিয়ে চলল।
হঠাৎ ভাঙ্গা জোৎস্নার আলোয় দেখল দুটো জলের পিঁপে পড়ে আছে। একটা কাত হয়ে পড়ে আছে, অন্যটা সোজা বসানো। সেটার ভিতর হাত দিয়ে দেখল জল ভরা। বুঝল বিস্কোরা এখানেই ধরা পড়েছে।
তাহলে ঝর্ণাটা কাছেই। কিন্তু সেদিকে গিয়ে লাভ নেই। বরং ত্ৰিস্তানদের আস্তানা কোন দিকে দেখতে হয়। বিস্কোদের বন্দী করে নিশ্চয়ই ওদিকে কোথাও রাখা হয়েছে।
ফ্রান্সিস ডানদিকে ঘুরল। বন থেকে বেরোতে হবে। খুঁজে বের করতে হবে ত্রিস্তানদের আস্তানা। ও এগিয়ে চলল।
হঠাৎ পায়ের কাছে কী যেন কিলবিল করে উঠল। ও কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা শক্ত বুনো লতা ওর পায়ে ফঁস হয়ে লেগে গেল। চোখের নিমেষে লতার বাঁধনটা এক হ্যাঁচকা টানে সামনের গাছের মাঝামাঝি টেনে তুলল ওকে। হাত থেকে তরোয়ালটা ছিটকে গেল। ডাল থেকে ঝোলানো লতার ফাঁদ ওর বাঁ পাটা বাঁধা। ওর মাথা নীচের দিকে। ও ঝুলতে লাগল। বুঝল ত্রিস্তানরা বনের মধ্যে ফাঁদে পেতে রেখেছে। সেই ফাঁদেই ও ধরা পড়েছে।
মাথা নীচের দিকে। পা ওপরে। ফ্রান্সিস ঝুলতে লাগল। শব্দ করে কয়েকটা পাখি গাছটা থেকে উড়ে গেল। হাতে তরোয়ালটাও নেই যে বুনো লতার ফাঁসটা কাটবে। ও ঝুলতে লাগল। গায়ের ঢোলা জামাটা মুখের ওপর আটকে গেল। কিছুই দেখতে পাচ্ছে না ও। জামাটা দু হাত দিয়ে খুলে নীচে ছুঁড়ে ফেলল।
বেশ কিছু সময় কাটল। মাথাটা ঝিমঝিম করতে লাগল। ও বুঝল ঐভাবে আর কিছুক্ষণ ঝুললে মাথায় রক্ত উঠে অজ্ঞান হয়ে যাবে। ও শরীরটা বাঁকাতে লাগল। কয়েকটা ঝুল খেয়ে হঠাৎ শরীরটা বাঁকিয়ে পায়ের ওপরের লতাটা ধরে ফেলল। কিছুক্ষণ রইল ওভাবে। তারপর প্রাণপণ শক্তিতে লতাটা দুহাতে ধরে আস্তে আস্তে একটু সোজা হলো। পায়ের লতার বাঁধনটায় ভর দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। হাঁপাতে লাগল। পায়ের বাঁধনটা প্রায় হাঁটুর কাছে উঠে এল। বুনো লতাটা যেন কেটে বসল পায়ে। ঘষা লেগে লেগে অনেকটা জায়গা ছড়ে গেল। ভীষণ জ্বালা করতে লাগল। যে ডাল থেকে ফাঁদের লতাটা ঝুলছে সেই ডালটা বেশ উঁচুতে। নাগাল পাওয়া অসম্ভব।
