কতদিন আগে? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
তা বলতে পারবো না। দিন সাতেকের কথা মনে আছে। তারপর আর কিছু মনে নেই।
তাহলে কঙ্কাল দ্বীপ এখন ত্ৰিস্তানদের দখলে? হ্যারি জিজ্ঞেস করল। হ্যাঁ। এখন তোমরা কী করবে? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
মোক একটু চুপ করে থেকে বলল–আমরা প্রাণে বাঁচবো এটা তো স্বপ্নেও ভাবিনি। এখন আপনাদের দয়ায় আমরা বেঁচে গেছি। এবার নতুন করে ভাবতে হবে এখন আমরা কী করবো?
মোকার কথা শেষ হলে বৃদ্ধ রাজা মোকাকেইকাবোদের ভাষায় কী জিজ্ঞেস করল। দুজনে কিছুক্ষণ কথাবার্তা হলো। ওদের কথা শেষ হলে ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল–তোমার বাবা মানে রাজামশাই কী বললেন?
বাবা বলছেন–পলাতক যোদ্ধাদের একত্র করে তিনি আবার ত্রিস্তানদের বিরুদ্ধে লড়াই করবেন। তাতে তাঁর মৃত্যু হলে তিনি মৃত্যুই মেনে নেবেন।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি চুপ করে রইল। কী বলবে বুঝে উঠতে পারল না। হঠাৎফ্রান্সিসের মনে পড়ল রুপোর নদীর কথা। ও জিজ্ঞেস করল–আচ্ছা তোমাদের দ্বীপে কি রূপোর : নদী আছে?
মোকা যেন একটু চমকাল। বলল–রূপোর নদীর কথা আপনি কি করে শুনলেন?
পাঞ্চো নামে একজন স্প্যানিশ নাবিক বলেছিল। আমাদের দেশে একসরাইখানায় পাঞ্চোর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল।
পাঞ্চো। মোকা হাসল। বলল–পাঞ্চো কিছুদিন আমাদের দ্বীপেছিল। ওর কাছেই আমি স্প্যানিশ ভাষা শিখেছি। ও রূপোর নদীর খোঁজে এসেছিল। এর আগেও দুতিনজন এসেছে। কিন্তু রূপোরনদীর খোঁজ কেউ পায়নি। ত্রিস্তানরা যে আমাদের দ্বীপদখল করেছে, ওদেরও লোভ রূপোর নদীর দিকে। একটু থেমে মোক বলল–কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউ রূপোর নদী খুঁজে পায়নি।
তোমরা নিজেরা খুঁজেছো? হ্যারি জিজ্ঞেস করল।
হ্যাঁ। অনেকভাবে চেষ্টা করেছি–খুঁজেছি, পাইনি।
তোমার বাবাও জানেন না বোধহয়? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
না বাবাও জানেন না।
তোমরা কী মনে করো? হরি বলল–সত্যিই রূপোর নদী ছিল, না সবটাই। একটা ছেলে-ভুলানো গপপো?
না–গপপো নয়। বাবা বলেন রূপোর নদীর কথা তিনি আমার ঠাকুরদার মুখে শুনেছেন। তা ছাড়া আমাদের দ্বীপের দেবতা–গিয়ানি। তার মন্দিরমত একটা পুজোর স্থান আছে। সমস্ত মন্দিরটা তাল তাল রূপোর থাম দিয়ে তৈরী। সামনে আছে রূপোর থাম। আমাদের পূর্বপুরুষরা এত রূপো পেল কোত্থেকে?
ফ্রান্সিস হ্যারির দিকে তাকাল। বলল-হারি, এবার বুঝতে পারছো?
হুঁ। কিন্তু রূপোর নদী গেল কোথায়? হ্যারি বলল।
আচ্ছা মোকা–ফ্রান্সিস বলল–তোমাদের দ্বীপে তো একটাই নদী?
হ্যাঁ।
সেটার নাম কুনহা?
হ্যাঁ।
তোমাদের ভাষায় কুনহা-র অর্থ রূপো–তাই কিনা?
হ্যাঁ, আপনি এতসব জানলেন কী করে?
পাঞ্চো বলেছে।
পাঞ্চো–চোর। ঠকবাজ। মোকা কেশ রেগে বলল–জানেন ও গিয়ানির মন্দিরের একটা থাম চুরি করে নিয়ে পালিয়েছে।
ফ্রান্সিস একটু আশ্চর্য হলো। বলল–আমি অতশত জানি না। পাঞ্চো আমার বন্ধু নয়, এক রাত্রের আলাপ। ঠিক আছে, ফ্রান্সিস মোকার বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল তোমরা বিশ্রাম করা। পরে কথা হবে।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি কেবিনঘর থেকে বেরিয়ে এল।
রাত্রে ফ্রান্সিস একা একা জাহাজের ডেক-এ পায়চারি করছিল। গভীরভাবে ভাবছিল কী করবে এখন? হ্যারি এল। ওর মাথায়ও এক চিন্তা। ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে দুজনে কথাবার্তা বলছে, তখনই বিষ্ণো এল। একটা দুঃসংবাদই নিয়ে এল ও। বলল–
ফ্রান্সিস, জাহাজে খাবার জল ফুরিয়ে এসেছে। কী করবে?
কঙ্কাল দ্বীপ থেকেই জল আনতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
কিন্তু দিনের বেলা যাওয়াটা কি ঠিক হবে?
না, রাত্রে যেতে হবে।
তাহলে আজ রাত্রেই যেতে হয়।
ঠিক আছে। দুটো পিঁপে নিয়ে তোমরা চারজন যাও কিন্তু তার আগে মোকার সঙ্গে কথা বলতে হবে। কঙ্কাল দ্বীপে কোথায় পানীয় জল পাওয়া যাবে তার হদিস একমাত্র ও-ই দিতে পারবে। ফ্রান্সিস বলল। তারপরারির দিকে তাকিয়ে বলল চলো তো হ্যারি–মোকার সঙ্গে কথা বলে আসি।
ওরা দুজনে মোকা যে কেবিনঘরে ছিল সেই ঘরে এল। দেখল রাজামশাই মোকা দুজনেই ঘুমিয়ে আছেন।
ফ্রান্সিস মোকাকে আস্তে আস্তে ঠেলল। ঘুম ভেঙে মোকা বসল। এত রাত্রে ফ্রান্সিস আর হ্যারিকে দেখে ও অবাকই হলো। ফ্রান্সিস বলল-মোক-আমাদের জাহাজে জল ফুরিয়ে এসেছে। তোমাদের দ্বীপে কোথায় পানীয় জল পাওয়া যাবে?
পাহাড়ের নীচে উত্তর দিকে একটা ঝর্ণা আছে। আমরা আছি দ্বীপের দক্ষিণ দিকে। যারা যাবে তাদের উত্তর দিক থেকে দ্বীপে নামতে হবে।
যে বেলাভূমি আমরা এদিক থেকে দেখছি সেখানে নেমেও তো উত্তর দিকে যাওয়া যায়।
যে বেলাভূমিটা এদিক থেকে দেখছেন তাকে মৃতের বেলাভূমি বলা হয়।
কেন?
এই বেলাভূমির কাছে সমুদ্রের নীচে যে বালি আছে তা অত্যন্ত হালকা। পা দিয়ে দাঁড়ালে বালি দ্রুত পায়ের নীচে সরে যায়। এখান দিয়ে তীরে উঠতে গেলে নিশ্চিত মৃত্যু। তাই এইদিকের বেলাভূমির ধারে কেউ আসে না। দেখবেন এই দিকের বেলাভূমির ধারে ত্ৰিস্তানদের একটাও ক্যানো নৌকা বাঁধা নেই। সব উত্তরের খাঁড়িগুলোতে বাঁধা আছে। মোকা বলল।
ফ্রান্সিস হ্যারির দিকে তাকাল। বলল–হ্যারি–আমি এই দিক দিয়েই দ্বীপেনামবো ভেবেছিলাম। ভীষণ বিপদে পড়তাম তাহলে।
মোক বলল–উত্তর দিকে পাহাড় পর্যন্ত একটা রাস্তা আছে। কিন্তু সেই রাস্তাটা নিশ্চয়ই ত্ৰিস্তান যোদ্ধারা পাহারা দিচ্ছে। যারা জল আনতে যাবে তাদের যেতে হবে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে।
