তারপর বিস্কো কোমরে গোঁজা ছোরাটা বের করল। লতার বাঁধন কাটল। প্রথমে যুবকটি আস্তে আস্তে উঠে বসল। বৃদ্ধটি শুয়েই রইল। বিস্কো যুবকটিকে বলল…নৌকোয় চড়তে পারবে?
যুবকটি ওর ভাষা বুঝল না। চোখ বন্ধ করে চুপচাপ বসে রইল।
বিস্কো এবার পর্তুগীজ ভাষায় বলল। যুবকটি বুঝল না। মাথা নাড়ল। তখন বিষ্ণো স্প্যানিশ ভাষায় বলল। যুবকটি এবার চোখ খুলে ভাঙা ভাঙা স্প্যানিশ ভাষায় বলল আমার নড়বার শক্তি নেই। বিস্কো বুঝল ওদের নৌকোয় ভোলা যাবে না। ও নিজের নৌকোয় ফিরে এল। নৌকো থেকে কাছি নিয়ে কাঠের ভেলাটার সঙ্গে বাঁধল। তারপর ভেলাটাকে টেনে নিয়ে এল জাহাজের কাছে। জাহাজ থেকে ভাইকিংরা একটা দড়িতে ফাস পরিয়ে ঝুলিয়ে দিল। বিস্কো যুবকটিকে তুলে ধরে ফাঁসটায় বসিয়ে দিল। জাহাজ থেকে ভাইকিংরা টেনে টেনে যুবকটিকে জাহাজে তুলে নিল। আবার দড়ির ফাঁস নামিয়ে দিল। বিস্কো অনেক কষ্টে বৃদ্ধকে তুলে ফাঁসে বসিয়ে দিল। বৃদ্ধের দেহটি ফাঁসে ঝুলতে লাগল। ভাইকিংরা দড়ি টেনে টেনে বৃদ্ধটিকে জাহাজে তুলে নিল। বিস্কোও নৌকোটা জাহাজের গায়ে বেঁধে দড়ি ধরে জাহাজে উঠে এল।
ততক্ষণে কয়েকজন মিলে ধরাধরি করে বৃদ্ধ ও যুবকটিকে একটা কেবিনঘরে নিয়ে শুইয়ে দিয়েছে। ওদের গায়ে কম্বল ঢাকা দিয়েছে। যুবকটি তবু চোখ মেলে তাকিয়ে ছিল। কিন্তু বৃদ্ধটি মাঝে মাঝে তাকাচ্ছিল। আবার চোখ বন্ধ করে ফেলছিল।
ফ্রান্সিস যুবকটির কাছে এসে বসল। বিস্কো ফ্রান্সিসকে বলল যুবকটি স্প্যানিস ভাষা বোঝে। ফ্রান্সিস যুবকটিকে জিজ্ঞেস করল–তেমরা কারা? যুবকটির খুব দুর্বল কণ্ঠে বলল-ইকাবো। ফ্রান্সিস পাঞ্চোরকাছে শুনেছিল কঙ্কাল দ্বীপের অধিবাসীরাইকাবো জাতি।
তোমরা কঙ্কাল দ্বীপের অধিবাসী?
হ্যাঁ।
আমরা যে দ্বীপটিকে এখান থেকে দেখছি সেটাই কি কঙ্কাল দ্বীপ?
হ্যাঁ? |||||||||| – তারপর যুবকটি ভীষণ ক্লান্তস্বরে বলল–আমার কথা বলতে–কষ্ট। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল। বলল–মাপ করো ভাই–এসময় আমার কিছু জিজ্ঞেস করা উচিত হয়নি। ও বিস্কোর দিকে তাকাল। বলল–বিস্কো, ওদের আগে জল খেতে দাও, তারপর গরম মাংস রুটি।
বিস্কো অল্পক্ষণের মধ্যে সব ব্যবস্থা করল। প্রথমে যুবকটিকে ধরাধরি করে বিছানায় বসানো হলো। তারপর জল খাওয়ানো হলো। জল খেয়ে যুবকটি একটু সুস্থ হলো যেন। ওর হাতে মাংস রুটির থালা দেওয়া হলো। যুবকটি বৃদ্ধটির দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বিস্কোকে জিজ্ঞেস করল–আমার বাবা বেঁচে আছেন? বিস্কো বুঝল বৃদ্ধটি ওর বাবা। বলল–হ্যাঁ–বেঁচে আছেন। তুমি নিশ্চিন্ত মনে খাও। যুবকটি আস্তে আস্তে খেতে লাগল।
কয়েকজন ধরাধরি করে বৃদ্ধটিকে উঠিয়ে বসাল। জল খাওয়াল। তারপর মাংস রুটির থালাটা ওঁর হাতে দিল। বৃদ্ধটি কিছুক্ষণ চোখ বুজে বসে রইল। তারপর চোখ খুলে ছেলের দিকে তাকিয়ে ইকাবো ভাষায় কী বলল। ছেলেটিও মৃদুস্বরে কী উত্তর দিল। বৃদ্ধটি আস্তে আস্তে খেতে লাগল।
রাত্রে ফ্রান্সিস একা একা ডেক-এ পায়চারি করছিল। কী করবেএখন তাই ভাবছিল। হ্যারি এসে ওর কাছে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস পায়চারী থামিয়ে বলল–ওরা কি সুস্থ এখন।
না, এখনও ওদের দুর্বলতা কাটেনি।
এখন কী করবো বলো তো?
এখন কঙ্কাল দ্বীপে যাবে কি না ভাবছো?
হ্যাঁ।
আমার মনে হয় কয়েকদিন অপেক্ষা করা ভাল।
ও কথা বলছো কেন?
দেখ–এরা ইকাবো। কী এরা অপরাধ করেছে যে ভেলায় বেঁধে সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়েছে? অথবা কঙ্কাল দ্বীপে এমন কিছু ঘটেছে যে জন্যে এদের ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। সমস্ত ব্যাপারটা না জেনে এখন কঙ্কাল দ্বীপে যাওয়াটা উচিত হবে না। হ্যারি বলল।
ঠিকই বলেছো। ফ্রান্সিস একটু চুপ করে থেকে বলল–এদের কাছে আগে সমস্ত ব্যাপারটা শুনি তারপর সিদ্ধান্ত নেবো।
কয়েকদিনের মধ্যেই যুবকটি আর তার বাবা অনেকটা সুস্থ হলো। ফ্রান্সিস দুবেলাই ওদের খোঁজখবর নিতে যেতো।
আজকেই বিকেলের দিকে ওদের কেবিনঘরে এল। দেখল যুবকটি বিছানায় বসে আছে। বৃদ্ধটি শুয়ে আছে। ফ্রান্সিস হেসে বলল-ভাই-এখন কেমন আছো? ভালো। যুবকটি মাথা নেড়ে হাসল। বলল–আপনারা আমাদের বাঁচিয়েছেন। আপনাদের কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবো।
ফ্রান্সিস হেসে ওর পিঠ চাপড়াল–মানুষ হিসেবেআমাদের যা কর্তব্য তাইকরেছি। তারপর একটু চুপ করে থেকে বলল–তোমার এখন কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে না তো?
ন্নাঃ।
তাহলে তোমাদের ব্যাপারটা একটু বল। আসল কথা তোমাদের ব্যাপারটা না জানা পর্যন্ত আমরা কী করবো বুঝে উঠতে পারছি না।
যুবকটি ফ্রান্সিসের দিকে একটুক্ষণ তাকিয়ে রইল। পাশেই ছিল হ্যারি হ্যারি বলল তোমার বলতে কোন আপত্তি আছে?
ন্নাঃ তা কেন? তারপর আস্তে আস্তে যুবকটি বলতে লাগল–আমার বাবা হচ্ছেন ইকাবোদের রাজা। আমি রাজপুত্র! আমার নাম মোকা। একটু থেমে মোক বলতে লাগল–কঙ্কাল দ্বীপের দক্ষিণে বেশ দূরে ত্রিস্তানদের একটা দ্বীপ আছে। ওরা আমাদেরচিরশত্রু। এর আগেও অনেকবার আমাদের দ্বীপ আক্রমণ করেছে। কিন্তু আমাদের হারাতে পারে নি। মোকা থামল। একটু দম নিল। তারপর বলতে লাগল–কিন্তু আমাদের দুভাগ্য। কিছুদিন আগেদ্বীপে ভীষণভূমিকম্প হয়েছিল। অনেকইকাবো তাতে মারা যায়। কমসংখ্যক যোদ্ধা নিয়ে এবার ত্রিস্তানদের আক্রমণ রোধ করতে পারলাম না। আমরা হেরে গেলাম। আমাদের যোদ্ধারা বনে জঙ্গলে পালিয়ে গেল। আমি আর বাবা ধরা পড়লাম ত্ৰিস্তানদের হাতে। ওরা আমাদেব প্রাণে মারল না। ভেলায় বেঁধে সমুদ্রে ভাসিয়ে দিল।
