সন্ধ্যে হতেই ভাইকিংরা ডেক-এ এসে জড়ো হলো। একটু পরেই ফ্রান্সিস হ্যারিকে সঙ্গে নিয়ে কেবিন ঘর থেকে ডেক-এ উঠে এল। সব ভাইকিং বন্ধুদের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে ফ্রান্সিস বলতে লাগল–ভাইসব–এই অভিযানে বেরোবার আগেই আমি বলেছিলাম আমাদের পথ ভুল হতে পারে, খাদ্যজল ফুরিয়ে যেতে পারে, কিন্তু আমাদের অধৈর্য হলে চলবে না। সোনার ঘন্টা আনতে গিয়েও এরকম সমস্যায় আমাদের পড়তে হয়েছিল। সেদিন বন্ধুরা আমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। আমার সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে বলেই বলছি কেউ যদি হতাশ হয়ে পড়ে তাহলে বলো, সামনে কোনো বন্দর পেলে তাকে নামিয়ে দেবো। সে অন্য জাহাজ ধরে দেশে ফিরে যাবে। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলতে লাগল-বলল তোমরা কে-কে ফিরে যেতে চাও।
ভাইকিংরা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। কেউ কোনো কথা বলল না। ফ্রান্সিস সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে নিল। তারপর তাহলে সবাই হাত লাগাও। বাতাস পড়ে গেছে। দাঁড়ীরা দাঁড়ঘরে যাও। যত দ্রুত সম্ভব জাহাজ চালাও। কঙ্কাল দ্বীপে আমাদের যেতেই হবে।
ভাইকিংরা একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল–ও-হো-হো-। তারপর যে যার কাজে লেগে পড়ল। জাহাজের গতি বাড়ল অল্পক্ষণের মধ্যেই।
আরো দুদিন কাটল। বাতাসের বেগ বাড়ল। পাল ফুলে উঠল। দাঁড় বাওয়াও চলল। জাহাজ চলল দ্রুত গতিতে। ভাইকিংরা আবার আগের মতো প্রচণ্ড উৎসাহ নিয়ে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ওরা ফ্রান্সিসকে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে।
***
পরের দিন। সূর্য পশ্চিমদিকে ঢলে পড়েছে। তখনও অস্ত যায়নি। মাস্তুলের মাথায় পালা করে ওরা থাকে।
চারদিক নজর রাখে। সেই বিকেলে মাস্তুলের নজরদার চিৎকার করে উঠল–ডাঙা দেখা যাচ্ছে–ডাঙা। ফ্রান্সিসকে খবর দেওয়া হলো। ও দ্রুতপায়ে ডেক-এ উঠে এল। হ্যারিও এল।
ফ্রান্সিস নজরদারকে চীৎকার করে বলল–কী দেখছো?
মনে হচ্ছে একটা দ্বীপ। একটা পাহাড়ের চূড়া দেখা যাচ্ছে। নজরদার বলল।
জাহাজ ঠিক ঐ দ্বীপের দিকে যাচ্ছে? ফ্রান্সিস বলল।
না। আমাদের একটু উত্তরের দিকে সরে যেতে হবে।
ফ্রান্সিস জাহাজ চালকের কাছে এল। বলল–একটু উত্তর দিক ঘেঁষে চালাও।
জাহাজ একটু উত্তরমুখো হলো।
একটু পরেই অস্তগামী সূর্যের আলোয় দ্বীপটা দেখা গেল। লাল আকাশের নীচে কালো পাহাড়ের মাথাটা দেখা গেল। মানুষের মাথার খুলির মতো। জাহাজ থেকে সবাই দেখছিল পাহাড়টা। ফ্রান্সিস আর হ্যারি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল। ফ্রান্সিস বলল–হারি এটাই কি কঙ্কাল দ্বীপ?
আমার বিশ্বাস এটাই কঙ্কাল দ্বীপ, দেখছো না পাহাড়টা দেখতে করোটির মতো।
হ্যাঁ-মানুষের মাথার খুলির মতো। ফ্রান্সিস বলল। একটু পরেই পশ্চিমের লাল আলো আকাশ থেকে মুছে গেল। অন্ধকার নেমে এল।
ফ্রান্সিস জাহাজের চালককে বলল–জাহাজ থামাও।
তারপর সবাইকে বলল–পাল নামাও। দাঁড় বাওয়া বন্ধ কর। কাল দিনের বেলা দ্বীপের দিকে যাব আমরা।
একটু পরেই জাহাজ থেমে গেল।
পুব আকাশের আধভাঙা চাঁদটা আস্তে আস্তে উজ্জ্বল হলো। মেটে জ্যোৎস্না ছড়াল সমুদ্রের ওপর। আবছা দেখা গেল দূরের কঙ্কাল দ্বীপ।
পরদিন সকালে কারো কোনো কাজ নেই। সকালের খাবার খেয়ে সকলেই ডেকে এসে জড়ো হলো। দেখতে লাগল কঙ্কাল দ্বীপ। পাহাড়ের চুড়োটা ন্যাড়া। কিন্তু পাহাড়ের নীচ থেকে শুরু করে চারদিকে প্রচুর গাছপালা। তীরের কাছে জঙ্গল অত ঘন নয়। অতদূর থেকে মানুষ জন্তু বা পাখি দেখা গেল না। হঠাৎ একজনের নজর পড়ল–গভীর সমুদ্রের দিকে দূরে একটা ভেলামত কী যেন ঢেউয়ের মাথায় উঠছে পড়ছে। সে সঙ্গীদের ডাকল–দ্যাখ তো ওটা কী?প্রায় সকলেরই দৃষ্টি পড়ল ওদিকে। কিন্তু অতদুর থেকে ওরা বুঝতে পারল না জিনিসটা কি?
দুজন ছুটে গিয়ে ফ্রান্সিসকে খবর দিল। ফ্রান্সিস ডেকে-এ উঠে এল। অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল ভেলাটার দিকে। তারপর ফিরে সকলের দিকে তাকিয়ে বলল–ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। এক কাজ কর–জাহাজ চালু কর। ঐদিকে জাহাজ নিয়ে চল।
কথামত সবাই কাজে লেগে পড়ল। জাহাজটা একবার নড়ে উঠে গভীর সমুদ্রের দিকে চলতে লাগল। জাহাজটা যত কাছে যেতে লাগল ভেলাটা ততই স্পষ্ট হতে লাগল।
কাছে আসতে দেখা গেল-কতকগুলো গাছের কাণ্ড দিয়ে, বুনো লতা দিয়ে বাঁধা একটা ভেলা। তার ওপর দুজন মানুষ। একজন বৃদ্ধ, অন্যজন যুবক। দুজনের হাত পা ভেলাটার সঙ্গে জংলী লতা দিয়ে বাঁধা। বৃদ্ধটির গায়ে বিচিত্র রঙের ডোরাকাটা আলখাল্লার মতো কী একটা। যুবকটির গা খালি। দুজনেরই পরনে ঘাসের তৈরী ঘাগরামতো। বৃদ্ধটির মাথায় লাল কাপড়ের ফেটি। তাতে কয়েকটা লম্বা পাখির পালক গোঁজা।
ফ্রান্সিস ডেক থেকে দেখল সব। কিন্তু বুঝে উঠতে পারল না মানুষ দুটো বেঁচে আছে কিনা। ফ্রান্সিসের কথামতো এর মধ্যেই পাঁচটা নৌকো তৈরী হয়েছিল। তারই একটা জলে নামানো হলো। বিস্কো একটা বৈঠা হাতে জাহাজের ঝোলানো দড়ি বেয়ে বেয়ে নৌকোটায় নামল, তারপর নৌকা বেয়ে চলল ভেলাটার দিকে। কাছে আসতে ও নৌকো থেকে ভেলাটায় উঠল। প্রথমে লতা দিয়ে বাঁধা যুবকটির বুকে নিজের কান চেপে ধরল। তারপর নাকের কাছে হাত রাখল। উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে জাহাজের বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল-শাস পড়ছে–বেঁচে আছে। এবার বৃদ্ধটিকে পরীক্ষা করল। উঠেদাঁড়িয়ে বলল–দুজনেই বেঁচে আছে।
