ফ্রান্সিসদের জাহাজটা বন্দর থেকে অনেকদূরে এসে পড়েছে তখন। ভাইকিংরা খুশীতে চিৎকার করে উঠল–ও-হো-হো-। দাঁড়ীদের ঘর থেকে দাঁড়ীরাও চীৎকার করে উঠল ও-হো-হো-। ঘড়ঘড় শব্দে পালগুলো তোলা হলো। সব পাল হাওয়ার তোড়ে ফুলে উঠল। একটা পাক খেয়ে জাহাজটা যেন জল কেটে উড়ে চলল। জাহাজ চলল দক্ষিণমুখো।
জাহাজ চলেছে। ওপরে নির্মেঘ আকাশ। নীচে শান্ত সমুদ্র বাতাসও বেগবান। পালগুলো ফুলে উঠেছে বাতাসে। বেশ জোরেই চলল জাহাজ। ভাইকিংদের আর দাঁড় বাইতে হচ্ছে না। শুধু জাহাজের ডেক মোছা, পালের দড়িদড়া ঠিক রাখা আর রান্নাবান্না এ ছাড়া কোনো কাজ নেই।
রাত হলে ওরা ডেক-এ জড় হয়। ছক্কা-পাঞ্জা খেলে। নাচে, গান গায়। ফ্রান্সিস আর হ্যারিও নাচগানের আসরে বসে কখনো। নাচগানের আসর ভেঙে যায় আর একটু রাত হলেই। ফ্রান্সিস তখন ডেক-এ একা-একা পায়চারি করে বেড়ায়। হ্যারি কোনো দিন ওর সঙ্গে থাকে। দুজনে কথাবার্তা হয়–রাত বাড়ে। দুজনে কেবিন ঘরে ফিরে
আসে। শুয়ে পড়ে।
এর মধ্যে একদিন বিকেলে অন্ধকার করে মেঘ জমল। ঘন-ঘন বিদ্যুৎ চমকাতে লাগল। বিদ্যুতের জ্বলন্ত রেখা আঁকাবাঁকা জলের মতো কালো আকাশটায় ফুটে উঠতে লাগল। সেই সঙ্গে বজ্রপাতের প্রচণ্ড গভীর শব্দ।
দেখতে-দেখতে প্রচণ্ড গতি নিয়ে বাতাস ঝাঁপিয়ে পড়ল জাহাজটার ওপর। ভাইকিংরা অভিজ্ঞ নাবিক। ওরা আগেই দড়িদড় কেটে পাল নামিয়ে ফেলেছিল। এবার জাহাজের হুইলের সামনে দাঁড়াল কয়েকজন। বাকীরা দাঁড়ীঘর থেকে উঠে এল ডেক-এ। তৈরী হলো ঝড়ের মোকাবিলা করবার জন্যে।
শুরু হলো ঝড়ের তাণ্ডব। বিরাট-বিরাট ঢেউ ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল জাহাজের ডেক-এ। জাহাজ একবার ঢেউয়ের ধাক্কায় অনেক ওপরে উঠে যাচ্ছে। আবার আছাড় খেয়ে নেমে আসছে ঢেউয়ের ফাটলের মধ্যে। আবার উঠছে। আবার পড়ছে। জাহাজের প্রচণ্ড দুলুনিতে কেউ স্থির হয়ে নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। ডেক-এর ওপর এদিকে-ওদিকে ছিটকে পড়ছে। ওরই মধ্যে ভাইকিংরা হইল ঘুরিয়ে চলল! দড়িদড়া আঁকড়ে ধরে টাল সামলাতে লাগল। জলে ভিজে সবাই যেন মন করে উঠল।
প্রচণ্ড ঝড় চলল প্রায় আধঘন্টা। হঠাৎ ঝড়ের দাপট কমে গেল। বাতাসের বেগ কমে এল। কিছুক্ষণ পরে বৃষ্টি থেমে গেল। বাতাসের বেগ স্বাভাবিক হলো। মেঘ উড়ে গিয়ে আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেল। তারা ফুটল আকাশে। ঝড়ের প্রচণ্ড দাপটের সঙ্গে
লড়াই করে ক্লান্ত ভাইকিংরা যে যেখানে পারল কেউ বসে পড়ল, কেউ শুয়ে পড়ল।
ঠিক করেছিল প্রথমে ডাইনীর দ্বীপে যাবে। দ্বীপে নামবে না। ঐ দ্বীপ থেকে দিক নির্ণয় করে পশ্চিম দিক লক্ষ্য করে জাহাজ চালাবে। তবেই পৌঁছুতে পারবে কঙ্কাল দ্বীপে। পাঞ্চো সে রকমই বলেছিল।
জাহাজ চলছে। এর মধ্যে আর ঝড়ের পাল্লায় পড়তে হয়নি। বেশ দ্রুতই চলছে জাহাজ। অনেকদিন হয়ে গেল। ভাইকিংদের মধ্যে একটু গুঞ্জন শুরু হলো। এখনও ডাইনীর দ্বীপে পৌঁছোতে পারলাম না। সেখান থেকে আবার কঙ্কাল দ্বীপ। তার দূরত্ব কত কে জানে? হ্যারি শুনল এসব কথা। কিন্তু ফ্রান্সিসকে কিছু বলল না।
একদিন ভোর-ভোর সময়ে দূর থেকে দেখা গেল ডাইনীর দ্বীপ। স্পষ্ট দেখা গেল না। কারণ একটা কুয়াশার আস্তরণ দ্বীপটাকে ঘিরে ছিল। মাস্তুলের ওপর যে নজরদারি করছিল সেই প্রথম দেখল ডাইনী দ্বীপ। ও চীৎকার করে বলে উঠল–ফ্রান্সিস, ডাইনীর দ্বীপ।
ওর চীৎকার চেঁচামেচিতে অনেকেরই ঘুম ভেঙ্গে গেল। ফ্রান্সিসের ঘুম খুব পাতলা। ও প্রথম ডাকেই উঠে পড়ল। ডেক-এর ওপর উঠে এল। ভোরের কুয়াশার মধ্যে দিয়ে সবাই ডাইনীর দ্বীপ দেখল।
একটু বেলা হতেই কুয়াশার আবরণ সরে গেল। স্পষ্ট দেখা গেল ডাইনীর দ্বীপ। সবুজ পাহাড়, সবুজ গাছগাছালি।
ফ্রান্সিস ডেক-এ দাঁড়িয়ে দ্বীপটা দেখল। তারপর বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল জাহাজের মুখ পশ্চিমদিকে ঘোরাও। সোজা পশ্চিম দিকে যেতে হবে আমাদের। তাহলেই কঙ্কাল দ্বীপে পৌঁছবো আমরা।
জাহাজের মুখ ঘোরান হলো পশ্চিমদিকে। জাহাজ চলল জল কেটে। লক্ষ্য কঙ্কাল দ্বীপ।
জাহাজ চলল। কয়েকদিন পরে এক রাতে ফ্রান্সিস ডেক-এ পায়চারি করছে। হ্যারি এল। ফ্রান্সিস বলল হ্যারি এই জাহাজে কাঠ কত আছে?
কাঠের তক্তাগুলো গুণে দেখি নি। তবে কাঠের স্তূপটা ছোট নয়।
তুমি কালকেই ভাল করে দেখ–কেন কাঠ আছে।
কী করবে কাঠ দিয়ে?
সেই কাঠ দিয়ে নৌকা তৈরী করতে হবে। যে কটা নৌকা হয় বানাতে হবে। কঙ্কাল দ্বীপে যেতে লাগবে। জাহাজ থেকে সরাসরি দ্বীপে নামা যাবে না।
রূপোর নদী
বেশ–ফার্নান্দো ওস্তাদ কাঠের মিস্ত্রী। ওকেই বলবে কয়েকজনকে নিয়ে কাজ শুরু করতে।
ফার্নান্দোকে বলতে ও পরদিনই নৌকা তৈরীর কাজে হাত লাগাল।
***
জাহাজ চলেছে। এর মধ্যে দুবার ঝড়ের মুখে পড়েছিল জাহাজটা। তবে ঝড় তেমন প্রচণ্ড ছিল না। দুতিনটে পাল ঘেঁসে গিয়েছিল শুধু। সেগুলো মেরামত করে জাহাজ পূর্ণ গতিতেই চলল।
মাঝখানে দিন চারেক হাওয়া পড়ে গিয়েছিল। পালে কাজ হয়নি। ক্রমাগত দাঁড় বাইতে হয়েছিল ভাইকিংদের।
দিন কুড়ি কেটে গেল। কিন্তু কঙ্কাল দ্বীপের দেখা নেই। এবার বেশ জোরে গুঞ্জন উঠল ভাইকিংদের মধ্যে। হ্যারীর কানে গেল সে কথা। ও বুঝল এই অসন্তোষকে বাড়তে দিলে যে কোনো মুহূর্তে ভাইকিংরা ফ্রান্সিসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে পারে। ও ফ্রান্সিসকে বলল সব কথা। ফ্রান্সিস সেইদিন সন্ধ্যেবেলাই ডেক-এ সভা ডাকল।
