হ্যারি আর বিস্কো চলে গেল। জাহাজঘাটায় এখানে ওখানে মশাল জ্বলছে। জলে কাঁপছে সেই আলো। একটা পাথুরে দেওয়ালের পেছনে হ্যারি দাঁড়াল। বিস্কো গেল সৈন্যদের সঙ্গে গল্প জমাতে।
বেশ কিছুক্ষণ পরে বিস্কো ফিরে এল। বলল–সব খবর পেয়েছি প্রথম তিনটে জাহাজের পরে চার নম্বর জাহাজটায় সব খাবার-দাবার জল রাখা আছে, ওটা কাল সকালে লিসবনের দিকে রওনা হবে। জাহাজটা নতুন, খুব মজবুত।
কোন্ জাহাজটা নিয়ে পালাতে হবে সেটা ঠিক হলো। কিন্তু পালাবার উপায়? হ্যারি জাহাজঘাটার জ্বলন্ত মশালগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। জাহাজগুলোও দেখতে লাগল। তখনই দেখল দুনম্বর জাহাজটা থেকে শীল মাছের তেলের পিঁপে খালাস করা হচ্ছে। জাহাজটার ডেকে অনেকগুলো তেলের পিঁপে সাজিয়ে রাখা। জাহাজ থেকে ঘাট পর্যন্ত একটা কাঠের পাটাতন পাতা। জাহাজের খালাসীরা পিঁপেগুলো পাটাতনের ওপর দিয়ে ঘাটে এনে জড়ো করছে। হ্যারি কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। হঠাৎ একটা চিন্তা ওর মাথায় খেলে গেল। পিঁপেগুলোতে আগুন লাগালে কেমন হয়? খুব সহজেই তেলের পিঁপেগুলোতে আগুন ধরে যাবে। হ্যারি দ্রুত বলে উঠল–বিস্কো–চলো।
ওরা দুজনে নিশানঘরের নিচে এল। বন্ধুরা বসে ছিল, তারা উঠে এল। হ্যারি
চাপাস্বরে ডাকল শাঙ্কো-শাঙ্কো কোথায়।
শাঙ্কো এগিয়ে এল–তীর ধনুক এনেছো তো? হ্যারি জিজ্ঞেস করল। শাকো মাথা ঝাঁকিয়ে হেসে বলল–নিশ্চয়ই।
তাহলে এক কাজ কর। অন্ধকারে কোনো জাহাজ থেকে তেলেভেজা মশালের পলতে নিয়ে এসো। শীগগির।
শাঙ্কো খুব দক্ষ তীরন্দাজ, অনেক প্রতিযোগিতায় ও তীর ছোঁড়ায় প্রথম হয়েছে। শাঙ্কো তীরধনুকটা বিস্কোকে দিল। তারপর অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
সবাই অপেক্ষা করতে লাগল। একটু পরেই শাঙ্কো ফিরে এল। হাতে মশালের তেলেভেজা পলতে। হ্যারি বিস্কোর হাত থেকে একটা তীর নিল। তেলে ভেজা পলতেটা তীরটায় জড়াল। শাঙ্কোর হাতে তীরটা দিয়ে বলল…মশালের আগুন থেকে তীরটায় আগুন জ্বালাও। তারপর অন্ধকার জাহাজঘাটায় গিয়ে দাঁড়াও। দেখবে দুনম্বর জাহাজটা থেকে তেলের পিঁপে নামানো হচ্ছে। একটা পিঁপেয় জ্বলন্ত তীর ছোঁড়ো। শীল মাছের তেল খুব দাহ্য পদার্থ। সঙ্গে সঙ্গে কাঠের পিঁপেটায় আগুন লেগে যাবে। সেই আগুন ছড়াতেও সময় নেবে না। শীগগির যাও।
শাঙ্কো জ্বলন্ত তীর-ধনুক নিয়ে চলে গেল। একটু এগোতেই দেখল দুনম্বর জাহাজের পিল খালাস হচ্ছে। ও হাতের কাছের মশালটা থেকে তীরটায় আগুন লাগাল। দেখল খালাসীরা পাটতনের ওপর দিয়ে একটা তেলের পিঁপে গড়িয়ে নিয়ে আসছে। সেই পিঁপেটা লক্ষ্য করে ও জ্বলন্ত তীর ছুঁড়ল। তীরটা গিয়ে কাঠের পিঁপেটায় বিঁধে গেল। মুহূর্তের মধ্যে পিঁপেটায় আগুন লেগে গেল। যে দুজন খালাসী ওটা গড়িয়ে নিয়ে আসছিল, তারা জ্বলন্ত পিঁপেটা ছেড়ে দিয়ে লাফিয়ে সরে গেল। জ্বলন্ত পিঁপেটা গড়াতে-গড়াতে পাটাতন থেকে সরে সমুদ্রের জলে পড়ে গেল। নিভে গেল আগুন। শাঙ্কো নিজের কপালে চাপড় দিয়ে…ইস্ ফস্কে গেল।
শাঙ্কো হ্যারির কাছে ফিরে এল। আর একটা পলতে নিল। তীরে জড়াল। আবার মশালের আলো থেকে তীরটায় আগুন জ্বালল। ততক্ষণে খালাসিরা আবার পিঁপেগুলো পাটাতনের ওপর দিয়ে গড়িয়ে-গড়িয়ে তুলতে শুরু করেছিল। লক্ষ্য স্থির করে শাঙ্কো জ্বলন্ত তীরটা ছুঁড়ল। পিঁপেটায় জ্বলন্ত তীর ঢুকে গেল। পিঁপেটায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। খালাসি দুজন পিঁপে ছেড়ে দিয়ে সরে গেল। জ্বলন্ত পিঁপেটা ঢালু পাটাতন দিয়ে গড়াতে-গড়াতে জাহাজের ডেক-এর দিকে চলল। ডেক-এর সাজিয়ে রাখা পিঁপেগুলোয় গিয়ে পড়ল জ্বলন্ত পিঁপেটা। মুহূর্তের মধ্যে আর একটা পিঁপেতে আগুন ধরে গেল। দেখতে দেখতে আরো কটা পিঁপেয়। প্রচণ্ড শব্দে প্রথম পিঁপেটা ফাটল এবার। চারিদিকে আগুন ছড়িয়ে পড়ল। তারপরই ফাটল আর একটা পিঁপে। চোখের পলকে জাহাজটার ডেকে আগুন লেগে গেল। আগুনের ফুলকি ছিটকোতে লাগল অনেক দূর পর্যন্ত।
সৈন্যরা প্রথমে হকচকিয়ে গেল। ওরা বুঝতেই পারল না জাহাজে আগুন লাগল কী করে। তারপরেই ওরা সবাই জ্বলন্ত জাহাজটার সামনে এসে হৈচৈ শুরু করল। কিন্তু পিঁপেগুলো যে প্রচণ্ড শব্দে ফাটছে, তাই ওরা কাছে যেতে সাহস পেল না। দূর থেকে বালতি করে জল ছুঁড়ে দিতে লাগল। কিন্তু আগুন তাতে নিভল না। আগুন আরো ছড়িয়ে পড়ল।
ওদিকে হ্যারি চাপাস্বরে বলে উঠল–সব ছোটো–চার নম্বর জাহাজটায় গিয়ে উঠবে। কোনো শব্দ করবো।
ততক্ষণে শাঙ্কোও এসেছে। সবাই দ্রুত পায়ে ছুটল চার নম্বর জাহাজটার দিকে। #হাতে পাটাতন পেতে সব নিঃশব্দে জাহাজটায় উঠে পড়ল। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলল সবাইকে–নোঙর তোল–নিঃশব্দে। দাঁড়ঘরে চলে যাও কিছু। কোনো শব্দ না করে দাঁড় বাইতে থাকো।
ফ্রান্সিসের কথামতো সবাই কাজে লেগে পড়ল।
অল্পক্ষণের মধ্যেই নোঙর তোলা হলো–দাঁড় বাওয়া শুরু হলো। জাহাজটা আস্তে আস্তে ভেসে চলল গভীর সমুদ্রের দিকে।
ওদিকে সৈন্যরা জাহাজের আগুন নেভাতে ব্যস্ত। কিন্তু একটু পরেই বুঝল যে আগুন নেভানো অসম্ভব। আগুন তখন সমস্ত জাহাজটায় ছড়িয়ে পড়েছে। মাঝে-মাঝে প্রচণ্ড শব্দে পিঁপেও ফাটছে। কাছে যেতে সাহস হচ্ছে না কারো।
এদিকে আগুন আর হৈ-চৈয়ের মধ্যে সৈন্যরা দেখল, একটা জাহাজ গভীর সমুদ্রের দিকে যাচ্ছে। সৈন্যরা ভেবে উঠতে পারল না কী করবে ওরা। জাহাজটা ততক্ষণে অনেক দূরে চলে গেছে। সৈন্যরা হাল ছেড়ে দিল। ঐ জাহাজ আর ফেরানো সম্ভব নয়। এদিকে অন্য জাহাজগুলোতেও যাতে আগুন না লেগে যায়, তার জন্যে ওরা জ্বলন্ত জাহাজটার নোঙর তুলল। জ্বলন্ত জাহাজটা ঠেলে দিল গভীর সমুদ্রের দিকে। অন্য জাহাজগুলোতে আর আগুন লাগল না। জ্বলন্ত জাহাজটা ভেসে চলল।
