সবাই চেঁচিয়ে উঠল-ও-হো-হো।
ফ্রান্সিস বলতে লাগল–কাল রাত্রে আমরা যাত্রা শুরু করবো। যারা-যারা যাবে, তাদের নাম পড়ছি।
ফ্রান্সিস হ্যারির দিকে হাত বাড়াল। হ্যারি তালিকার কাগজটা ওকে দিল। ফ্রান্সিস সব নাম পড়ে গেল। মোট তিরিশ জন। যাদের নাম নেই, তারা গুঞ্জন তুলল। ফ্রান্সিস বলল-ভাইসব–যাদের নাম বাদ গেল তারা দুঃখ করো না। অন্য কোনো অভিযানে তাদের পরে নেওয়া হবে।
একটু থামল ফ্রান্সিস। পরে বলতে লাগল–এবার যারা যাবে তাদের বলছি, কাল রাত্রে অস্ত্রশস্ত্র পোশাক নিয়ে জাহাজঘাটায় উপস্থিত থাকবে নিশানঘরের কাছে। জাহাজ চুরির সেই আগের পদ্ধতি আমরা নেব।
থামল ফ্রান্সিস। তারপর আবার বলতে লাগল–ভাইসব জেনে রেখো অনিশ্চিতের পথেই আমাদের যাত্রা। আদৌ কঙ্কাল দ্বীপ বলে কোনো দ্বীপ আছে কিনা জানি না। থাকলেও সেখানে রূপোর নদী ছিল কি ছিল না তাও জানি না। শুধু জানি ডাইনি দ্বীপের পশ্চিমে এই কঙ্কাল দ্বীপ আছে। কত দিন যাবে এই দ্বীপ খুঁজে বের করতে জানি না। কাজেই আমাদের ধৈর্য ধরে খুঁজতে হবে। ততদিন আমাদের অধৈর্য হলে চলবে না। হয়তো খাদ্য ফুরিয়ে যাবে, হয়তো খাবার জলও ফুরিয়ে যাবে, কিন্তু আমাদের অধৈর্য হলে চলবে না। তোমাদের কোনো ওজর আপত্তি শোনা হবে না। আমার আর হ্যারির কথাই হবে শেষ কথা। সেই কথা শুনেই তোমাদের চলতে হবে।
ফ্রান্সিস থামলো। বন্ধুরা সব একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল-ও-হো-হো।
সভা শেষ হলো। সবাই চলে গেল। সবশেষে বেরিয়ে এল ফ্রান্সিস আর হ্যারি। পথে আসতে-আসতে হরি বলল–রূপোর নদীর গল্পটা ছেলেভুলোনো গপপো কিনা কে জানে।
ফ্রান্সিস বলল–যদি কঙ্কাল দ্বীপের খোঁজ পাই, তাহলে বুঝবো রূপোর নদী আছে, মানে ছিল।
আমারও তাই মনে হয়। হ্যারি বলল।
বাড়ি ফিরে খেতে বসে ফ্রান্সিস ওদের পরিকল্পনার কথা মারিয়াকে বলল। মারিয়া বলল–বাবা রাগ করবে না তো?
ফ্রান্সিস হেসে বলল–যখন তাল-তাল রূপো নিয়ে ফিরবো, তখন তোমার বাবা খুশিই হবেন।
ঠিক আছে–তোমরা নির্বিঘ্নে ফিরে এসো এখন আমার একমাত্র কামনা মারিয়া বলল।
পরদিন সারা সকাল বিকেল ফ্রান্সিস আর বাড়ি থেকে বেরোল না। চুপচাপ শুয়ে বসে সময় কাটাল।
সন্ধ্যে হতেই খেয়ে নিল। পোশাক-তলোয়ার সব গুছিয়ে তৈরী হলো। বাবাকে কিছু বলল না। বাবা আর রাজামশাই-এর অজান্তেই জাহাজ চুরি করতে হবে।
একটু রাত হতেই ফ্রান্সিস মারিয়ার কাছ থেকে বিদায় নিল। মারিয়ার দুচোখ ছল ছল করে উঠল। ফ্রান্সিস হেসে বলল–অত ভীতু হলে চলবে না।
বাড়ির বাইরে বেরিয়ে ফ্রান্সিস একটা ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করল। টক টক টকা গাড়ি চলল পাথুরে রাস্তার ওপর দিয়ে। গাড়ি কিছুটা চলতে ফ্রান্সিস জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে পেছনের দিকে তাকাল। দেখল, দেউড়ির আলোর নীচে মারিয়া তখনও দাঁড়িয়ে আছে। ফ্রান্সিস একটু উন্মনা হয়ে পড়ল। কিছু পরক্ষণেই দুর্বল হয়ে পড়া মনকে শক্ত করল। এসব কি ভাবছে সে? মাথায় একটা ঝাঁকুনি দিয়ে ও গলা চড়িয়ে বলল… ভাই, একটু তাড়াতাড়ি গাড়ি চালাও।
গাড়ি চলার বেগ বাড়ল। গাড়ি বন্দরের জেটির কাছে এসে থামল। ফ্রান্সিস গাড়ি থেকে নেমে এল। ভাড়া চুকিয়ে দ্রুত পায়ে নিশানঘরের সামনে এল। দেখল, প্রায় সবাই এসে গেছে। একটু অপেক্ষা করতেই বাকিরা এসে পড়ল।
ফ্রান্সিস সবাইকে অপেক্ষা করতে বলল। তারপর নিজে নিশান ঘরের আড়াল থেকে জেটিতে এল। কিছুক্ষণ এদিকে-ওদিকে ঘুরে বেড়াল। অন্ধকারে জাহাজগুলো ভাসছে কোনো জাহাজে আলো আছে, কোনো জাহাজে নেই। একটা জিনিষ লক্ষ্য করল যে আজকে অনেক পাহারাদার সৈন্য জাহাজঘাটা পাহারা দিচ্ছে, সাধারণত এত পাহারাদার সেনা জাহাজঘাটায় থাকেন। ফ্রান্সিস বুঝল-পাহারা এত কড়াকড়ি করা হয়েছে রাজার আদেশে।
রাজা জানেন যে ফ্রান্সিস যদি জাহাজ চুরি করে পালাবে এটা স্থির করে থাকে তবে সেটা করবেই। কাজেই রাজা সাবধান হয়েছেন।
ফ্রান্সিস একটু চিন্তায় পড়ল। পাহারাদার সৈন্যদের সঙ্গে লড়াই না করে, রক্তপাত ঘটিয়ে কী করে জাহাজ চুরি করা যায়। নিশানঘরের আড়ালে ও যখন এল তখন বন্ধুরা ওকে ঘিরে ধরল। জিজ্ঞেস করতে লাগল এখন কী করবে ওরা। ফ্রান্সিস আস্তে-আস্তে বলল–রাজা টের পেয়েছেন যে আমরা জাহাজ চুরি করবো। তাই বন্দরের পাহারায় অনেক সৈন্য মোতায়েন করেছেন।
তারপর হ্যারিকে বলল–হ্যারি–একটা কিছু উপায় বার করো। কোন খুনখারাপির মধ্যে আমরা যাবো না।
হ্যারি হেসে বলল–তোমার বুদ্ধি আমার চেয়ে কিছু কম নয়। তুমিই একটা উপায় বার কর।
ফ্রান্সিস মাথা ঝাঁকাল–না–মাথাটা কেমন হালকা লাগছে। কিছু ভাবতেই পারছি না।
বিস্কো এগিয়ে এল। বলল–খড়, কেরোসিন বাক্সে আগুন লাগিয়ে দিই। এর আগে তো এভাবেই পালিয়েছি।
ফ্রান্সিস হেসে বলল–রাজামশাই অত বোকা ভেবো না। সারা জাহাজঘাটা সাফ। খড়, কেরোসিন, কাঠের বাক্স কিছু নেই।
কথাটা শুনে সকলেই বেশ চিন্তায় পড়ল। কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। ওদিকে রাতও বাড়ছে। অনেকেই নিশানঘরের সিঁড়িতে বসে পড়ল।
হঠাৎ হ্যারি উঠে দাঁড়াল। বলল–সৈন্যরা আমাকে চিনে ফেলবে। তাই বিস্কোকে নিয়ে আমি যাচ্ছি। বিস্কো সৈন্যদের সঙ্গে কথা বলে জেনে নেবে কোন জাহাজটায় আটা, ময়দা, চিনি এসব খাবার ভালো মজুত আছে, জল আছে। সেই অনুযায়ী আমরা একটা জাহাজ বেছে নেব। তারপর জাহাজ নিয়ে পালাবার উপায় ভাববো।
