সভা ভেঙে গেল। ভাইকিং বন্ধুরা একে-একে চলে গেল। ফ্রান্সিস আর মারিয়াও ফিরে চলল।
***
কয়েকদিন পরে এক রাতে ফ্রান্সিস আর ওর বাবা খেতে বসেছে। মারিয়া পরিবেশন করছে। রাঁধুনি রয়েছে। তারই পরিবেশন করার কথা। কিন্তু এ কাজটা মারিয়া নিজেই করে। দুবেলা ফ্রান্সিস আর মন্ত্রীমশাই খেতে বসলে মারিয়াই খাবার পরিবেশন করে। খেতে-খেতে ফ্রান্সিস ডাকল–বাবা।
মন্ত্রীমশাই মুখে শব্দ করলেন–হুঁ।
ফ্রান্সিস বলল–যদি অভয় দাও,তাহলে একটা কথা বলি।
বলো।
আমি সমুদ্রযাত্রায় বেরোতে চাই।
আবার? বাবা কড়া চোখে ওর দিকে তাকালেন!
কঙ্কাল দ্বীপে আছে রূপোর নদী। আমি তারই সন্ধানে বেরোতে চাই।
বাবা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন ওর দিকে। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন–মাকে তো অনেক কষ্ট দিয়েছ। এবার মারিয়াকেও দুশ্চিন্তা কষ্টের মধ্যে ফেলতে চাও?
মারিয়ার কোনো আপত্তি নেই। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিসের বাবা মারিয়ার দিকে তাকালেন। মারিয়া মাথা নিচু করে মৃদুস্বরে বলল–বাবা, ও গেলে আমার কোনো দুশ্চিন্তা বা কষ্ট হবে না।
ঠিক আছে। মারিয়া, তুমি যদি সব মেনে নিতে পারো তাহলে আমার কোনো আপত্তি নেই।
খুশিতে ফ্রান্সিসের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। এত সহজে বাবার সম্মতি পাওয়া যাবে, তা ও ভাবতে পারেনি। ও মারিয়ার দিকে তাকিয়ে হাসল। মারিয়াও হাসল। ফ্রান্সিস একটু তাড়াতাড়ি খেতে লাগল; খেয়েই ছুটতে হবে হ্যারিদের বাড়ির দিকে। সব বলতে হবে ওকে। বাবা গলা খাঁকারি দিলেন–আস্তে খাও।
রাজামশাইও শুনলেন কথাটা। মারিয়াও বাবাকে সব বুঝিয়ে বলল। রানীও শুনলেন। দুজনেই আপত্তি তুললেন। বিয়ে-টিয়ে করে ফ্রান্সিস এখন সংসার পেতেছে। এখন আর ওসব পাগলামি কেন? মারিয়া বলল মা, তোমরা আপত্তি করো না।
পাগল হয়েছিস। কোথায় কঙ্কাল দ্বীপ, কোথায় রূপোর নদী, কী পরিবেশ, ওখানে কোন অসভ্য জাতির বাস–কোন সাংঘাতিক বিপদ কখন ঘটে তার কিছু ঠিক আছে? রাজা বললেন।
কিন্তু আগে তো তুমিই ফ্রান্সিসকে উৎসাহ দিতে।
তখনকার কথা আলাদা। এখন ওর জীবনের সঙ্গে তুইও তো জড়িয়ে গেছিস। এখন আর ও একা নয়।
ওকে এমনি যেতে না দিলে ও জাহাজ চুরি করে পালাবে।
ঠিক আছে–আমরা কথা বলবো ওর সঙ্গে। রাত্রে তোদের নিমন্ত্রণ রইলো। তোর হাতেই একটা চিঠি দিচ্ছি ফ্রান্সিসকে। ওকে সঙ্গে করে নিয়ে আসবি।
মারিয়া রাজপ্রাসাদ থেকে ফিরে এসে ফ্রান্সিসকে সব বলল। রাজার চিঠি দিল। ফ্রান্সিস বলল–বেশ চলল।
রাত্রে ফ্রান্সিস আর মারিয়া এল নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে। অনেক কটা সুসজ্জিত ঘর পেরিয়ে ওরা অন্দরমহলে ঢুকল। রাতের খাওয়ার আয়োজন করা হয়েছিল। একটা লম্বাটে ঘরে। ঝাড়লণ্ঠনের নীচে ঝকঝকে টেবিল-কাঠের সবুজ গদিমোড়া চেয়ার, বাসনপত্র পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, সুস্বাদু খাবার থরেথরে সাজানো।
রাজা-রানী ফ্রান্সিসদের অপেক্ষায় বসেছিলেন। ওরা আসতেই রাজা বললেন–বসে পড় তোমরা। খেতে-খেতেই কথা হবে। পরিচারকরা খাবার-দাবার এগিয়ে দিল।
ফ্রান্সিস ও মারিয়া চেয়ারে বসল। খাওয়া শুরু করেছে, তখনই রানী হেসে ডাকলেন–ফ্রান্সিস!
বলুন। ফ্রান্সিস রানীর দিকে তাকাল। তুমি নাকি আবার সমুদ্রযাত্রায় যাবে? হ্যাঁ। কোথায় যাবে? |||||||||| –কঙ্কাল দ্বীপে রূপোর নদীর খোঁজে।
রাজা একটু কেশে বললেন–ফ্রান্সিস–এখন তুমি সংসারী হয়েছে। সোনার ঘন্টা থেকে শুরু করে অনেক কিছু এনেছো। তোমার বীরত্ব নিয়ে চারণ কবিরা গান বেঁধেছে। সারা রাজ্যে সেই গান গেয়ে বেড়ায়। আর কেন। এবার সংসারে মন দাও।
ফ্রান্সিস একটু চুপ করে রইল। তারপর বলল–আমার এই অভিযানে বাবার মত আছে, মারিয়ারও কোনো আপত্তি নেই। শুধু আপনারাই আপত্তি করছেন।
তুমি রাগ করলে ফ্রান্সিস? রানী জিজ্ঞেস করলেন। না। তবে আপনারা আমাকে নিরুৎসাহ করবেন, এটা কখনো ভাবিনি।
রাজা বললেন–মারিয়া ছেলেমানুষ–ও কী বোঝে। তোমার বাবাও সম্মতি দিয়েছেন মারিয়া রাজী হয়েছে বলেই। যাক গে–এ খেয়াল ছাড়ে।
ফ্রান্সিস আর কোনো কথা বলল না। মাথা গুঁজে খেতে লাগল। বুঝল রাজা-রাণী কিছুতেই সম্মতি দেবেন না। অগত্যা সেই পুরনো রাস্তাই ধরতে হবে। জাহাজ চুরি করতে হবে। ফ্রান্সিসের অভিযান নিয়ে আর কোনো কথা হলো না। রাজা-রানী অন্য বিষয়ে কথা বলতে লাগলেন।
খাওয়া শেষ করে রাজারানীর থেকে বিদায় নিয়ে দুজনে বাড়ি ফিরে এল।
পালকের বিছানায় অনেক রাত অবধি জেগে রইল ফ্রান্সিস। নানা চিন্তা মাথায়। তারপর বিছানা থেকে উঠে ঘরময় পায়চারি করতে লাগল। হঠাৎ মারিয়ার ঘুম ভেঙে গেল। ও একটু অবাক হলো, ফ্রান্সিসকে পায়চারি করতে দেখে। বলল তুমি ঘুমুবে না?
হ্যাঁ। তারপর এসে বিছানায় শুয়ে পড়ল। মারিয়া বলল–কী ঠিক করলে? ফ্রান্সিস হেসে বলল–সব ছক ভাবা হয়ে গেছে। আমি যাবোই। ঠিক আছে। এখন ঘুমোও। মারিয়া বলল।
পরদিন ফ্রান্সিস বিস্কোর কাছে গেল। ওকে দিয়ে সবাইকে খবর পাঠাল রাত্রে সেই পোড়ো বাড়িটায় সভা হবে। সবাই যেন আসে।
রাত্রে ফ্রান্সিস পোড়ো বাড়িটায় যখন এল, তখন প্রায় সবাই এসেছে। আজকে মারিয়া এল না। ফ্রান্সিস সবাইকে ডেকে বলল–ভাইসব, এইবারের সমুদ্রযাত্রায় আমরা আবার অসুবিধেয় পড়েছি। রাজামশাই-এর মত নেই। তাই উনি জাহাজ দেবেন না। এখন একটাই পথ খোলা জাহাজ চুরি।
