কিন্তু রূপোর নদী যে আছেই, এ বিষয়ে নিশ্চিত হলেন কী করে?
কঙ্কাল দ্বীপের পাহাড়ের নীচে আছে ওদের দেবমন্দির। সেই মন্দিরের থাম রূপোর তৈরী। সামনে নিরেট রূপোর থাম পোঁতা আছে। এত রূপো ওরা পেল কোথায়? একথা জিজ্ঞেস করলে রাজা বলেছিল ওদের পূর্বপুরুষরা এই রূপো পেয়েছিল রূপোর নদী থেকে।
আচ্ছা ঐ দ্বীপে নদী আছে?
হ্যাঁ, একটাই নদী। পাহাড়ের মাথা থেকে নেমে এসেছে। ওরা বলে কুনহা নদী। ওদের ভাষায় কুনহা অর্থ রূপে।
কুনহা নদীর জলের রং কেমন? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
কালচে জল। লোকটা বলল।
নাবিকদের আর তার সঙ্গীদের তখন খাওয়া হয়ে গেছে। রাতও বাড়ছে। দোকানে এরা ছাড়া আর কোনো খদ্দের নেই। সরাইখানার মালিক দোকান বন্ধ করে দিত। কিন্তু ফান্সিসকে নাবিকদের সঙ্গে আলাপে ব্যস্ত দেখে দোকান বন্ধ করতে বলেনি।
ফ্রান্সিসেরও খাওয়া হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। ও উঠে দাঁড়ালো। নাবিকটির দিকে হাত বাড়াল। নাবিকও ওর হাত ধরল। ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল–আপনার নাম কি?
পাঞ্চো। আমার দেশ স্পেনে।
আমরা কাল দ্বীপে যাবে। রূপোর নদী খুঁজে বের করবো।
পাঞ্চো দাড়িগোঁফের ফাঁকে হাসল–দেখবেন চেষ্টা করে।
তারপর ফ্রান্সিস ওদের আর নিজের রুটি মাংসের দাম দিতে গেল দোকানদারকে। দোকানদার কিছুতেই দাম নেবে না; বারবার বলতে লাগল–আপনি আমার দোকানে এসেছেন। কত সৌভাগ্য আমার।
ফ্রান্সিস বুঝল লোকটা কিছুতেই দাম নেবে না।
একটা খালি ঘোড়ার গাড়ি আসছিল। গাড়ি থামিয়ে ফ্রান্সিস গাড়িতে উঠে বসল। বাড়ি ফিরতে বেশ রাত হলো। মারিয়া তখনও জেগে ছিল। ফ্রান্সিস মারিয়াকে বলল–বাইরে খেয়ে এসেছি। আর খাবো না।
আমি তো খাবো। খাবার টেবিলে বসবে এসো।
ওরা খাবার টেবিলে বসল। মারিয়া খাচ্ছে তখনই ফ্রান্সিস ওকে পাঞ্চোর কথা, কঙ্কাল দ্বীপ, ইকাবোদের কথা আর রূপোর নদীর কথা বলতে লাগল। মারিয়া খেতে খেতে সব শুনল। তারপর বলল–কী ভাবছো, যাবে।
নিশ্চয়ই। ফ্রান্সিস উৎসাহের সঙ্গে বলে উঠল।
কিন্তু পাঞ্চোরা ছমাস খুঁজেও যার হদিস পায়নি, তোমরা তা পারবে?
ফ্রান্সিস বলল–সেটা ঐ দ্বীপে না পৌঁছে বলতে পারবো না। ওখানে গিয়ে সব খবরাখবর নিয়ে তবেই বুঝবো রূপোর নদী আসলে ছিল না, সবটাই মন ভোলানো গপ্পো।
কিন্তু–
মারিয়া–তুমি ভালো করেই জানো–এই সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের বেকার জীবন আমার কাছে অসহ্য। আবার জাহাজ নিয়ে ভেসে পড়ব, সে কথা ভাবতে ভাবতে আমি বোধহয় আজ রাতে ঘুমোতে পারবো না।
আমার কোনো আপত্তি নেই। মারিয়া খেতে–খেতে বলল।
এই তো চাই মারিয়া। ফ্রান্সিস খুশিতে প্রায় লাফিয়ে উঠল। বলল–আমি জানতাম তুমি আপত্তি করবে না।
মারিয়া হাসল। বলল–তোমার মন আমি বুঝি ফ্রান্সিস। তুমি ভালোবাসো দুরন্ত জীবন।
ফ্রান্সিস বলল–তা ঠিক।
কিন্তু তোমার বাবাকে রাজী করাতে পারবে এবার?
দেখি বলে কয়ে। না পারলে আবার পালাতে হবে।
বরং আমিই তোমার বাবাকে বুঝিয়ে বলবো। মনে হয় আমি বললে উনি আপত্তি করবেন না।
পরদিনই ফ্রান্সিস সব বন্ধুদের খবর পাঠালো বিস্কোকে দিয়ে। বিস্কো সবাইকে খবর দিয়ে এল রাতে সেই পোড়ো বাড়িটায় আসতে।
একটু রাত হতেই ফ্রান্সিস তৈরী হলো সেই পোড়ো বাড়িতে যাবার জন্যে। মারিয়াও চলল ওর সঙ্গে। ওরা যখন পোড়ো বাড়িতে পৌঁছল, তখন ফ্রান্সিসের অনেক বন্ধুরাই এসে গেছে। ফ্রান্সিসের সঙ্গে মারিয়াকে দেখে সবাই আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল। অল্পক্ষণের মধ্যেই ফ্রান্সিসের সব বন্ধুরা এসে হাজির হলো। গল্পগুজব আনন্দ উল্লাসের শব্দে বাড়িটা গম গম করতে লাগল। একসময় ফ্রান্সিস দুহাত তুলে গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসব। আমরা আবার সমুদ্রযাত্রায় বেরুবো।
সবাই একসঙ্গে আওয়াজ তুলল–ও হো-হো।
ফ্রান্সিস বলতে লাগল–ডাইনির দ্বীপের পশ্চিমে একটা দ্বীপ আছে। কঙ্কাল দ্বীপ। জানি না কেন দ্বীপটার নাম কঙ্কাল দ্বীপ। সেখানে ছিল রূপোর নদী। কিন্তু আজ কেউ সেটার খোঁজ জানে না। পাঞ্চো নামে একজন স্পেনীয় লোক ঐ দ্বীপে ছমাস রূপোর নদীর সন্ধানে কাটিয়েছে। কিন্তু কোনো হদিস পায়নি। এবার আমরা যাবো সেই রূপোর নদীর সন্ধানে। ফ্রান্সিস থামল।
একজন ভাইকিং বলল–রাজা কি এই অভিযানের জন্যে জাহাজ দেবেন?
ফ্রান্সিস তার দিকে তাকিয়ে বলল–যদি দেন ভালো, না দিলে আবার চুরি করবো।
সবাই চেঁচিয়ে উঠলো–ও হো-হো।
এবার হ্যারি এগিয়ে এল। বলল–কিন্তু সত্যিই কি রূপোর নদীর অস্তিত্ব আছে।
ফ্রান্সিস বলল–ইকাবো নামে এক উপজাতি বাস করে ওখানে। ওদের পূর্বপুরুষরা পাহাড়ের ধারে তৈরী করেছে রূপোর থামওলা একটা মন্দির। ওদের উপাস্য দেবতার মন্দির। এত রূপো তারা পেল কোথায়? নিশ্চয়ই রূপোর নদী থেকে। রূপোর থামও আছে মন্দিরের সামনে।
ঐ দ্বীপে কি কোনো নদী আছে? একজন ভাইকিং জিজ্ঞাসা করল।
ফ্রান্সিস বলল–ঐ দ্বীপে মাত্র একটা নদী–কুনহা। ইকাবোদের ভাষায় কুনহা শব্দের অর্থ রূপো।
ওদের কথাবার্তা ভাইকিংরা নিবিষ্ট মনে শুনল। ফ্রান্সিস এবার চেঁচিয়ে বলল–ভাইসব তোমরা কি এই অভিযানে বেরোতে রাজী?
সবাই চিৎকার করে উঠল–ও-হো-হো।
ফ্রান্সিস বলল–আজকের মত সভা এখানেই শেষ। আমি আর হ্যারি এর মধ্যে সব পরিকল্পনা করবো। কারা যাবে, তার তালিকা তৈরী করবো। তারপর আর একটি সভা ডাকা হবে এবং শেষ সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
