ফ্রান্সিস পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ মুছল। তারপর আস্তে আস্তে হেঁটে দুজনে বাড়িতে ঢুকল।
ফ্রান্সিসের নতুন সংসার শুরু হলো। মারিয়া রাজকুমারী হলে কী হবে, খুব কাজের মেয়ে। কয়েকদিনের মধ্যে বাড়ির দুটো ঝিকে সঙ্গে নিয়ে খেটেখুটে ঘরদোরের চেহারাই পাল্টে ফেলল। ফ্রান্সিসের মা মারা যাবার পর ঘরদোর তেমন যত্ন করে আর কে সাজাবে গুছোবে। মারিয়া আবার ঘরদোরের আগের চেহারা ফিরিয়ে দিল। ফ্রান্সিস এতে খুব খুশি হলো।
আনন্দে কাটতে লাগল দুজনের জীবন। আজকে প্রিয় বন্ধু হ্যারির বাড়িতে নিমন্ত্রণ। কালকে আর এক বন্ধু বিস্কোর বাড়িতে। এভাবে প্রায় প্রতিদিন এ বাড়ি-ও বাড়ি নিমন্ত্রণ লেগে রইল। এর ওপর রয়েছে এখানে-ওখানে সন্ধ্যায় নাচের আসর। সবাই চায় ফ্রান্সিস আর মারিয়াকে। আনন্দের স্রোতে ভেসে চলল দিনগুলো।
কোনো-কোনো দিন বিকেলে দুজনে গাড়ি চড়ে বেরোয়। রাস্তায় ময়দানে, সমুদ্রের ধারে ধারে ঘুরে বেড়ায়। পথে লোকজন ওদের অভিবাদন জানায়। কেউ-কেউ এগিয়ে এসে করমর্দন করে। বেশ আনন্দে কাটতে লাগল দুজনের দিন।
বন্ধুরা ফ্রান্সিসের বাড়ি আসে। আগের মতোই আড্ডা বসে। সোনার ঘন্টা আনা, হীরেমুক্তো আনার সেই কষ্টকর অভিজ্ঞতার কথা বলাবলি করে ওরা। কেউ কেউ উৎসাহে বলে ওঠে–চলো ফ্রান্সিস, আবার জাহাজ নিয়ে ভাসি।
দিন কাটে। মাঝে-মাঝে ফ্রান্সিস হাঁপিয়ে ওঠে। এত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের বেকার জীবন ওর ভাল লাগে না। মারিয়া পাছে মনে ব্যথা পায়, তাই ফ্রান্সিস মুখ ফুটে কিছু বলে না। কিন্তু মাঝে-মাঝে একা বেরিয়ে পড়ে। ঘুরতে ঘুরতে সমুদ্রের ধারে চলে আসে। বন্দরে দেশ-বিদেশ থেকে এসে নোঙর করা জাহাজগুলো দেখে। কত রকমের পতাকা উড়ছে সেসব জাহাজগুলোতে। নাবিকদের সঙ্গে গল্পটল্প করে। কোত্থেকে আসছে, কোথায় যাবে, এসব কথা হয়।
একদিন এমনি একা-একা বেড়াচ্ছিল ফ্রান্সিস। রাত হয়েছে তখন। বন্দরের ধারে পরপর কয়েকটা সরাইখানা। তারই একটাতে ঢুকল ফ্রান্সিস। দোকানটায় আলো জ্বলছে, বিরাট উনুনে রুটি সেঁকা হচ্ছে। কাঠের টানা টেবিলে বেঞ্চিতে লোকজন খাচ্ছে। ফ্রান্সিসও ওদের সঙ্গে বসল। যে ছেলেগুলো খাবার দিচ্ছিল, তাদের একজনকে ডাকল। ছেলেটি কাছে এলে বলল–চারটে ফুলকো রুটি আর মাংস নিয়ে এসো।
ছেলেটি চলে গেল। দোকানদার এক পেটমোটা ইহুদি। ইয়া গোঁফ মুখে। তার সামনে একটা কালো কাঠের বাক্স। দাম নিচ্ছে, ভাঙানি ফেরত দিচ্ছে। খুব ব্যস্ত সে।
ফ্রান্সিস চারিদিকে তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখছে। বেশীরভাগই বিদেশী নাবিক। এইরকম দুটো নাবিকের দল খেয়েটেয়ে বেরিয়ে যেতেই সরাইখানাটায় ভিড় কমে গেল। ফ্রান্সিস খাচ্ছে। তখনই দোকানদারের হঠাৎ নজর পড়ল ফ্রান্সিসের দিকে। এ কী? ফ্রান্সিস আমার দোকানে? সে তাড়াতাড়ি বাক্সে তালা লাগিয়ে ছুটে এল ফ্রান্সিসের সামনে। হাত নেড়ে দ্রুত বলতে লাগল আপনি-মানে আমার দোকানে মানে আপনাকে কি বলবো মানে,ফ্রান্সিস আমার দোকানে।
আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হবেন না। নিজের কাজ করুন গে। ফ্রান্সিস বলল।
দোকানদার তবু কিছু বলতে গেল। ফ্রান্সিস তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল–উঁহু কোন কথা নয়, নিজের কাজে যান।
দোকানদার ফিরে গিয়ে কাঠের বাক্সের সামনে বসল। খদ্দেরদের কাছ থেকে দাম নিতে লাগল। ভাঙানি ফেরত দিতে লাগল। ফ্রান্সিসের খাওয়াও প্রায় হয়ে এসেছে। তখনই শুনল টেবিলের ওপাশ থেকে কে বলল–আপনিই ফ্রান্সিস?
বেশ মোটা ভারী গলা লোকটার! ফ্রান্সিস তাকাল লোকটার দিকে। লোকটা মধ্যবয়সী। মুখে কাঁচাপাকা দাড়িগোঁফ। মাথায় কাঁচাপাকা বাবরি চুল, বেশ বলিষ্ঠ চেহারা। পরনে নাবিকদের ঢিলে হাতাঅলা পোশাক। ফ্রান্সিস দেখল লোকটা খাওয়া বন্ধ করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ও হ্যাঁ বলল তারপর আবার খেতে লাগল।
লোকটা বলল–আপনার কথা আমরা অনেক শুনেছি। পাত্রীদের সোনার ঘন্টা এনেছেন, হীরে, মুক্তো এনেছেন। আপনি তো এই দেশের শ্রেষ্ঠ পুরুষ।
ফ্রান্সিস খেতে-খেতেই হাসল। কোনো কথা বলল না। লোকটা চুপ করে থেকে বলল–রূপোর নদীর কথা শুনেছেন?
ফ্রান্সিস চমকে উঠল কথাটা শুনে। খাওয়া থামিয়ে লোকটার দিকে তাকাল। কাঁচাপাকা ভুরুর নীচে লোকটার চোখ দুটো কেমন রহস্যময়। ফ্রান্সিস মাথা নাড়ল–না।
তারপর একটু থেমে বলল–আপনি জানেন রূপোর নদী কী? কোথায় আছে তো?
হ্যাঁ জানি। রূপোর নদী আছে কঙ্কাল দ্বীপে।
আপনি দেখেছেন সেই নদী?
লোকটা মাথা নাড়ল বলল–না, তারপর তার পাশে বসা আরো দুজন নাবিককে দেখিয়ে বলল–আমরা সবাই মিলে দীর্ঘ ছমাস ঐ দ্বীপে ছিলাম। তন্নতন্ন করে খুঁজেছি। কিন্তু খুঁজে পাই নি।
কঙ্কাল দ্বীপ কোথায়? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
ডাইনির দ্বীপ চেনেন?
হ্যাঁ।
তার পাঁচশ মাইল পশ্চিমে।
দ্বীপটা কি জনহীন?
না। ইকাবো নামে এক জাতীয় লোক ওখানে বাস করে। তাদের গায়ের রঙ তামাটে। চোখ নীল। মাথায় লম্বা চুল। ওরা মাথার চুল বেণী পাকিয়ে রাখে। এদের রাজা আছে।
ফ্রান্সিস বেশ মনোযোগ দিয়ে নাবিকদের কথা শুনছিল। এবার বলল–আচ্ছা, ইকাবোরা আপনাদের এতদিন কঙ্কাল দ্বীপে থাকতে দিয়েছিল কেন?
লোকটা দাড়ির ফাঁকে হাসল। বলল-ওদের বাগে আনতে হয়েছিল কী করে জানেন? আয়না, চিরুনি, টুপি, চকচকে পুঁতির মালা এসব রাজাকে দিয়েছিলাম। রূপোর মদীর কথা ইকাবোদর মুখেই শুনেছিলাম। কিন্তু কোথায় সেই নদী, অনেক খুঁজেও আমরা তার হদিস পাই নি।
