মারিয়া তারপর ওর গ্রীনল্যাণ্ড অভিযান নিয়ে প্রশ্ন করতে লাগলো। ফ্রান্সিস ওর কথা বলার প্রিয় বিষয় পেয়ে গেল। কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর দিয়েই ও মধ্যরাত্রিতে সূর্য দেখবার অভিজ্ঞতার কথা বলতে লাগলো। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ফ্রান্সিস সেই আগের ফ্রান্সিস হয়ে গেল। উৎসাহের সঙ্গে ও বরফের দেশে ওর বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা বলতে লাগলো। মারিয়া খুশি হলো যে, ফ্রান্সিস ওর শোকাহত ভাবটা কাটিয়ে উঠতে পেরেছে। গভীর মনোযোগ দিয়ে মারিয়া পরপর গল্প শুনতে লাগলো। গাড়ি এসে দাঁড়ালো ফ্রান্সিসদের বাড়ির দরজায়।
মারিয়া আগেই কোচম্যানকে সেই নির্দেশ দিয়েছিল। ফ্রান্সিস অগত্যা গল্প থামিয়ে গাড়ি থেকে নেমে এলো। মারিয়া মৃদুস্বরে বললো, আবার গাড়ি পাঠাবো–আসবেন কিন্তু।
ফ্রান্সিস মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানালো।
আস্তে-আস্তে ফ্রান্সিসের মধ্যে পরিবর্তন দেখা গেল। ও আবার আগের মতই হয়ে উঠলো। বন্ধু বান্ধবেরা আসে, জোর আড্ডা ও গল্প-গুজব চলে।
এর মধ্যে মারিয়া দুদিন গাড়ি পাঠিয়েছিল। ফ্রান্সিস সেজে-গুজে রাজবাড়ি গেছে। এরিকদ্য রেডের গুপ্তধন আবিষ্কারের গল্প বলেছে। গালে হাত দিয়ে অবাক হয়ে মারিয়া সেই গল্প শুনেছে। গল্প বলতে বলতে কখনও মার কথা মনে পড়েছে। গল্প থামিয়ে চুপ করে বসে থেকেছেও। মারিয়া বুঝতে পেরেছে সেটা। মৃদুস্বরে বলেছে, মার কথা ভেবে মন খারাপ করো না। আমি তোমার একজন শুভার্থী বন্ধু। তোমার মনে কোন দুঃখ না থাক, এটাই আমি চাই।
এই সহানুভূতির কথায় ফ্রান্সিস দুঃখ ভোলে। বলে, আমি জানি। তাই তোমার কাছে এলে আমি দুঃখ ভুলে যাই।
এরকম মাঝে-মাঝেই ফ্রান্সিস রাজবাড়িতে যেতে লাগল। মারিয়ার সঙ্গে ওর হৃদ্যতা বেড়েই চললো।
ফ্রান্সিসের বাবা একদিন সন্ধ্যেবেলা ওকে নিজের ঘরে ডেকে পাঠালো। ও ঘরে ঢুকে দেখলো, বাবা জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছেন। ও বললো, বাবা, আমাকে ডেকেছিলে?
-হ্যাঁ। বলে বাবা ফিরলেন বসো–একটা জরুরি কথা আছে।
ফ্রান্সিস বসলো। বাবা একটু কেশে নিয়ে বললেন, দেখো, তোমার মা বেঁচে থাকলে তিনিই সব ব্যবস্থা করতেন। যাকগে কথাটা হলো–রাজামশায়ের খুব ইচ্ছে, তুমি রাজকুমারী মারিয়াকে বিয়ে করো।
ফ্রান্সিস অনুমান করেছিল, এমনি এটা কথা উঠবে। কাজেইও খুব আশ্চর্য হলো না এতে।
বাবা বলতে লাগলেন, রাজা-রানী দু’জনেই কয়েকদিন ধরেই বলছেন। একটু থেমে বললেন, রাজকুমারী মারিয়াকে ছোটবেলা থেকেই জানি। ওর মতো বুদ্ধিমতী সহৃদয় মেয়ে হয়না। আমার মত যদি জানতে চাও তাহলে বলি, এই বিয়ে হলে আমি খুব খুশি হবো। তোমার মা বেঁচে থাকলে তিনিও খুশি হতেন।
ফ্রান্সিস বাবার মুখের দিকে লজ্জায় তাকাতে পারলো না। মাথা নীচু করে আস্তে আস্তে বললো, তুমি খুশি হলে আমার আপত্তি নেই।
বাবা হেসে ফ্রান্সিসের দিকে তাকালেন। এগিয়ে এসে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
রাজামশাই একদিন রাজসভায় বিয়ের কথাটা ঘোষণা করলেন। রাজ্যের লোকেরা খুব খুশি হলো। বন্ধুরা দল বেঁধে এসে ফ্রান্সিসকে অভিনন্দন জানিয়ে গেল।
রাজকুমারী মারিয়া এরপর আর গাড়ি পাঠায় না। ফ্রান্সিসও লজ্জায় আর রাজবাড়ি যায় না। এক শুভদিনে নগরের সবচেয়ে বড় গীর্জায় রাজকুমারী মারিয়ার সঙ্গে ফ্রান্সিসের খুব আড়ম্বর করে বিয়ে হয়ে গেল। সাতদিন ধরে উৎসব চললো। ’এরিক দ্য রেডের’ গুপ্তধনের বাক্সটা রাজকুমারী যৌতুক হিসেবে পেলো।
একে রাজকুমারীর বিয়ে, তাও আবার সকলের প্রিয় ফ্রান্সিসের সঙ্গে। দেশের অধিবাসীরা আনন্দে যেন পাগল হয়ে গেল। হৈ-হল্লা, খাওয়া-দাওয়া, নাচ-গান সাতদিন ধরে চলল।
হাজার-হাজার বাজী পুড়লো রাতের আকাশে।
-:শেষ:-
রূপোর নদী
রাজকুমারী মারিয়ার সঙ্গে বিয়ে হলো ফ্রান্সিসের। ভাইকিং দেশের অধিবাসীরা সাত দিন ধরে আনন্দ উৎসব করল। সকলের প্রিয় ফ্রান্সিস। তার বিয়ে। কনে রাজকুমারী মারিয়া। কাজেই দেশের লোকের আনন্দ আর ধরে না।
বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা করে বিয়ের পর ফ্রান্সিস আর মারিয়া এল ফ্রান্সিসদের বাড়ি। সামনে ঘোড়সওয়ারের সারি। রূপোর ঝালর ঝুলছে ঘোড়াগুলোর মুখে-পিঠে। ঘোড়সওয়ারদের পরনে সবুজ-হলুদ পোশাক। টুপি থেকে ঝুলছে সোনালী ঝালর। ঘোড়সওয়ারদের সারির পরে একটা কালো ওক কাঠের গাড়িতে বরকনের সাজে ফ্রান্সিস আর মারিয়া। গাড়িটা খোলা গাড়ি। গাড়ির গায়ে সোনালী কাজ করা লতাপাতা। গাড়ি চলছে মন্থর গতিতে। দুপাশের রাস্তার ধার থেকে, বাড়িগুলো থেকে লোকজন ফুল ছুঁড়ে দিচ্ছে ফ্রান্সিসদের গাড়িতে। ওদের দুজনের গাড়ির পর কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তিদের গাড়ি। তার মধ্যে ফ্রান্সিসের বাবার গাড়িও আছে।
শোভাযাত্রা এসে শেষ হলো ফ্রান্সিসদের বাড়ির সামনে। গাড়ি থেকে নেমে বরকনে পাশাপাশি হেঁটে ঢুকল বাড়িতে। এত আনন্দ হৈ-হল্লার মধ্যেও বাড়িতে ঢুকতে গিয়ে ফ্রান্সিসের বুকটা হাহাকার করে উঠল। বারবার মার কথা মনে পড়তে লাগল। মা বেঁচে থাকলে কত খুশি হতো। ফ্রান্সিসের চোখে জল এল। মারিয়া পাশে-পাশে যাচ্ছিল। ও ফ্রান্সিসের মনের অবস্থাটা বুঝতে পারল। মৃদুস্বরে সান্ত্বনা দিল, মার কথা ভেবে মন খারাপ করো না। কারণ মা তো চিরদিন থাকেন না।
