সারাদিন ফ্রান্সিসের একা-একা কাটে। রাতের দিকে বন্ধুরা আসে। একটু কথাবার্তা হয়, তারপর ওরা চলে গেলে আবার ও একা। এভাবেই দিন কাটতে লাগলো ওর। এর মধ্যে একদিন রাজা রাজপরিবারের একটা গাড়ি পাঠালেন ফ্রান্সিসের কাছে। কোচম্যান এসে ওর সঙ্গে দেখা করলো। মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে রাজার একটা চিঠি ওর হাতে দিল। চিঠিটা পড়লো ও। ছোট্ট চিঠি–
স্নেহের ফ্রান্সিস,
তোমার মনের অবস্থা বুঝতে পারছি। তবু আমার কাছে একবার এসো।
নীচে রাজার স্বাক্ষর। রাজা ডেকেছেন কাজেই একবার যেতেই হবে। ও যখন সাজপোশাক পরছে, তখনই মার কথা মনে পড়লো। রাজবাড়িতে যাবার সময় মাই ওকে সাজিয়ে গুছিয়ে দিত। পোশাক পরতে থাকা ওর হাতটা থেমে গেল। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো ও। বুক ঠেলে একটা দীর্ঘশ্বাস উঠে এলো। ও আবার পোশাক পরতে লাগলো। অনেকদিন পরে আয়নায় নিজের মুখ দেখলো। বেশ রোগাই হয়ে গেছে, ও ওটা বুঝলো। মাথায় শেষবারের মতো চিরুনী বুলিয়ে ও গাড়িতে গিয়ে উঠলো।
গাড়ি চললো। গ্রীনল্যাণ্ড থেকে এসে পর্যন্ত ও বাড়ির বাইরে বেরোয় নি। এতদিন পরে পথে বেরিয়ে ওর ভালোই লাগলো। জমজমাট বাজারের কাছে আসতে গাড়ির গতি কমে এলো। রাস্তার ভীড়ের মধ্যে যারাই ওকে চিনল, তারাই হেসে হাত নাড়লো। অগত্যা ওকেও কখনও কখনও হাত নাড়তে হলো, হাসতে হলো।
একসময় গাড়ি রাজবাড়িতে এসে পৌঁছল। রাজার একজন দেহরক্ষী ওকে রাজবাড়ির মধ্যে নিয়ে চললো। সাজানো-গোছানো দেয়ালে, জানলায় নানা কারুকাজ করা অনেকগুলো ঘর পেরিয়ে মন্ত্রণা কক্ষের সামনে এসে দেহরক্ষী দাঁড়িয়ে পড়লো। ঘরটা দেখিয়ে দিতে মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে দেহরক্ষী চলে গেল। ফ্রান্সিস ঘরে ঢুকে দেখলো, রাজা বসে আছেন। সামনে শেতপাথরের বিরাট গোল টেবিল। আঁকা-বাঁকা আবলুম কাঠের পায়া ওলা কয়েকটা সবুজ গদীআঁটা চেয়ার টেবিল চারপাশে পাতা। রাজাকে ও মাথা নুইয়ে কি সম্মান জানালো। রাজা ওকে বসতে ইঙ্গিত করলেন।
রাজা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, ফ্রান্সিস, তোমার মার মৃত্যুতে আমরা গভীর শোক পেয়েছি। রাজবাড়ির উৎসবে উনি বড় একটা আসতেন না। তবু যে কদিন তার সঙ্গে কথা বলেছি তার কথাবার্তা ব্যবহারে এটা বুঝেছিলাম, উনি খুব শিক্ষিতা ও রুচিশীলা মহিলা ছিলেন।
রাজা থামলেন। ফ্রান্সিস কী বলবে বুঝে উঠতে পারল না, ও চুপ করে রইলো। রাজা একটু কেশে নিয়ে বললেন, তোমাকে যে কারণে ডেকে পাঠিয়েছি সেটা বলি।
–বলুন।
–এরিক দ্য রেডের যে ধনসম্পদ তুমি এনেছ, সেটা কী করতে চাও?
–আপনি যা ভাল বুঝবেন করবেন।
–তা হয় না ফ্রান্সিস। এনর সোক্কাসন এটা ব্যক্তিগতভাবে তোমাকেই দিয়েছেন। তুমি যা বলবে তাই হবে।
–আমি এখন-মানে-ঠিক গুছিয়ে কিছু ভাবতে পারছি না।
রাজা একটু চুপ করে রইলেন তারপর বললেন, আমারই ভুল হয়েছে। তোমার এই মানসিক অবস্থায়-ঠিক আছে, তুমি পরেই বলো।
–তাহলে আমাকে যাবার অনুমতি দিন।
–হ্যাঁ, এসো। আমরা পরে কথা বলবো। রাজা বললেন। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়িয়ে রাজাকে সম্মান জানালো। তারপর ঘরের বাইরে চলে এলো। দেহরক্ষী ঘরের বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিল। ওকে পাশে নিয়ে দেউড়ী পর্যন্ত এগিয়ে দিল।
ফ্রান্সিসের দিন একইভাবে কাটতে লাগলো। তবে এখন ও আর বাড়িতে সবসময় থাকে না। মাঝে মাঝে বিকেলের দিকে বেরোয়। লোকজনের ভীড় এড়িয়ে সমুদ্রের ধারে আসে। নোঙর করা জাহাজগুলো দেখে। লোভ হয়, আবার একটা জাহাজ নিয়ে বেরিয়ে পড়তে। সাত-পাঁচ ভাবে, আর একা একা সমুদ্রের তীরে ঘোরে।
একদিন এইরকম সমুদ্রের তীরে বেড়াচ্ছে। লক্ষ্য করেনি, রাজবাড়ির একটা সুদৃশ্য ঘোড়ার গাড়ি ওর কাছাকাছি এসে থামলো। ও নিজের মনেই সমুদ্রের দিকে মুখ করে হাঁটছিল। ঝালর লাগানো রঙীন পোশাক পরা রাজবাড়ির কোচম্যান ওর সামনে এসে দাঁড়াল। মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে বললো, আপনাকে রাজকুমারী ডাকছেন।
ফ্রান্সিস ঘুরে তাকিয়ে দেখলো, রাজকুমারী মারিয়া একা গাড়িটায় বসে আছে। ওকে দেখে মৃদু হাসল। ও গাড়িটার কাছে এগিয়ে গেল। রাজকুমারীকে মাথা নুইয়ে সম্মান জানালো। রাজকুমারী বললো, খুব যদি ব্যস্ত না থাকেন, আমার গাড়িতে আসতে পারেন।
ফ্রান্সিস একটু দ্বিধায় পড়লো, ওর মন চাইছিল একা-একা ঘুরে বেড়াতে। কিন্তু ওদিকে রাজকুমারীর আমন্ত্রণও উপেক্ষা করা যায় না। অগত্যা ও গাড়িতেই উঠল। রাজকুমারীর নির্দেশেই গাড়ি চললো। ঝলমলে পোশাক পরা রাজকুমারী, গাড়ির ভিতরে একটা তৃপ্তিদায়ক সুগন্ধ, ডুবন্ত সূর্যের আলো, ঘোড়ার পায়ের শব্দ–এই সবকিছু হঠাৎ ওর ভালো লাগলো।
রাজকুমারীর সেই উচ্ছ্বলতা আজকে নেই। হয়তো শোকগ্রস্ত ফ্রান্সিসের সামনে কি সেটা বেমানান লাগবে, এই জন্যেই রাজকুমারী চুপ করে রইলো। গাড়ি চললো। একসময় রাজকুমারী বললো, আপনার মার মৃত্যুতে আমরা সকলেই শোক পেয়েছি।
ফ্রান্সিস মৃদু হাসল। রাজকুমারীর দিকে তাকিয়ে রইলো। কোন কথা বললো না। রাজকুমারী বললো, আপনার শরীরটা বেশ খারাপ হয়ে গেছে।
ফ্রান্সিস মৃদু হাসল। রাজকুমারী বললো, যদি আপনার ইচ্ছে হয়, আমাদের বাড়ি যেতে পারেন। অনেকদিন আপনার মুখে গল্প শুনিনি।
প্রথমে ওর যেতে ইচ্ছে হলো না। একা থাকতেই ভালো লাগছিল। কিন্তু পরক্ষণেই ইচ্ছে হলো। ওখানে গেলে, রাজকুমারীর সঙ্গে কথাবার্তা বললে হয়তো মনটা একটু শান্ত হবে। ফ্রান্সিস বললো, আজকে নয়, আর একদিন গাড়ি পাঠাবেন যাবো।
