ফ্রান্সিস হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো, গাড়ি জোরে চালাও।
গাড়ির কোচম্যান সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিল। ভীড় পেছনে রইলো। গাড়ি দ্রুতগতিতে ছুটল। বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো। আস্তে-আস্তে গাড়ি থেকে নামলো। দেখলো, সেই নীলফুলের লতাগাছটা দেয়ালের গায়ে আরো আরো অনেকদূর পর্যন্ত ছড়িয়েছে। কত নীলফুল ফুটে আছে। এই গাছটা তো মা-ই লাগিয়েছিল।
গেট খুলে ভেতরে ঢুকলো ফ্রান্সিস। ফুলে-ফুলে ছেয়ে আছে সারা বাগানটা। মার বরাবরের অভ্যেস ছিল, খুব সকালে বাগানটার পরিচর্যা করা। দাঁত–ফোকলা মালীটাকে নিয়ে সারা সকালটাই মার এই বাগানে কাটতো। ফুলগাছের জটলার মধ্যে থেকে মালীটা তখনি উঠে দাঁড়ালো–হাতে বেলচা। বোধহয় ফুলগাছের নীচের মাটি আগা করে দিচ্ছিল। ওকে দেখেও কিন্তু বরাবরের মতো ফোকলা দাঁতে হাসলো না। কেমন চুপ করে একদৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে রইল।
ফ্রান্সিস বাড়ির ভেতর ঢুকল। যেখানে যে জিনিস থাকবার, তাই আছে। মা যেমন করে ঘরদোর সাজিয়ে রাখত, সেভাবেই সাজানো রয়েছে। ও নিজের ঘরে ঢুকলো। বিছানা আসবাবপত্র সব পরিচ্ছন্ন ভাবে গোছানো, যেমন বরাবর দেখে এসেছে। বিছানায় বসলো একটু, ভালো লাগলো না বসে থাকতে। ঘর থেকে বেরিয়ে গেল মার ঘরে। সব পরিপাটি সাজানো। বিছানাটা বরাবরের মতো সুচারুভাবে পাতা, যেন এক্ষুনি এসে শোবে। শেষের দিকে মা খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছিল। যখন-তখন এসে বিছানায় শুয়ে থাকতো। বাবার ঘরে গেল ও, সেই একই ভাবে সাজানো গোছানো। দেয়ালে মার। একটা ছবি, হাতে আঁকা রঙিন ছবি। ও এক দৃষ্টিতে ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলো। ছবিতে হাসি-হাসিমুখ। এমনি হাসিহাসি মুখেই মা বলতো–হ্যাঁরে, কবে তোর পাগলামি সারবে? বুড়ি মা’টার কথা কি তোর একবারও মনে পড়ে না?
ফ্রান্সিস আর তাকিয়ে থাকতে পারল না। পাগলের মত সারা বাড়িতে প্রতিটি ঘর। ঘুরে বেড়ালো। বাবা আর ছোট ভাইটা নেই। কাউকে পেলো না, শূন্য বাড়ি–মা নেই। ভাবতে-ভাবতে ছুটে এলো নিজের ঘরে। তারপর বিছানার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে শিশুর মতো ডুকরে কেঁদে উঠলো। সমস্ত শরীর ওর কাঁপতে লাগলো। বুকটা যেন খালি হয়ে গেছে–শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। শরীরের এই অবস্থা নিয়ে ও কাঁদতে লাগলো।
কখন বিকেল হয়েছে ও জানে না। হঠাৎ বাবার ডাক শুনলো, ফ্রান্সিস
ও বিছানা থেকে আস্তে আস্তে উঠে বসলো৷ দেখলো, বাবা আর ছোট ভাই দরজায় দাঁড়িয়ে। ও চোখ মুছে নিল। বাবা আস্তে-আস্তে এসে বিছানায় ওর পাশে বসলেন। একটু কেশে নিয়ে সহজভাবেই বললেন, রাজবাড়িতে তোমাদের ফেরার সংবাদ পেয়েছি।
একটু থেমে বললেন, শরীর ভালো আছে তো?
ফ্রান্সিস মাথা নাড়লো। ভাবলো, বাবা এত সহজ ভাবভঙ্গীতে কথা বলছেন, যেন কিছুই হয়নি। ও বাবার মুখের দিকে তাকালো। বাবা মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। কিছুক্ষণ জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ উঠে চলে গেলেন। ছোট ভাইটা তখনও দরজায় দাঁড়িয়ে। ফ্রান্সিস ওকেই ডাকল, ও কাছে আসতে জিজ্ঞেস করলে, হারে, মা খুব কষ্ট পেয়েছিল?
–নাঃ। ভাইটি মাথা নাড়লো। বললো, সেদিন বিকেল থেকে হঠাৎ শরীরটা ভালো লাগছেনা বলে, বিছানায় এসে শুয়ে পড়লো। বাবা বাড়িতেই ছিলেন। রাজবৈদ্যকে ডেকে আনা হলো। মা তখনও জ্ঞান হারায় নি। কেবল তোমার কথা বলছিল–পাগল ছেলেটা এখনও ফিরলো না-ওকে দেখতে বড় ইচ্ছে করছে।
কথাটা শুনে ফ্রান্সিস আর নিজেকে সংযত করতে পারল না। দু’হাতে মুখে ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো, ওর ভাইয়ের চোখেও জল এলো। একটু সুস্থির হয়ে ফ্রান্সিস বললো, তারপর?
–সন্ধ্যের সময় মা জ্ঞান হারালো। রাজবদ্যি ওষুধ-টষুধ দিল, কিন্তু কাজ হলো না। সারারাত এভাবে কাটল। ভোরের দিকে একটু জ্ঞান ফিরেছিল, চারদিকে তাকাচ্ছিল মা। তারপর আবার অজ্ঞান। একটু বেলা হতেই মা–
ও আর বলতে পারল না। ফ্রান্সিস অনেকক্ষণ শূন্যদৃষ্টিতে জানলার বাইরের দিকে। তাকিয়ে রইলো। একটা পাখি কিচ কিচ্ শব্দ করে একবার ঘরে ঢুকছে, আবার বেরিয়ে যাচ্ছে। ও একসময় চোখ ফিরিয়ে দেখলো, ভাইটি ঘর ছেড়ে চলে গেছে।
রাতের দিকে হ্যারি বিস্কোরা কয়েকজন এলো। সবাইচুপচাপ বসে রইলো, কথা বললো না বেশি। আগে যখন আসত, কত কথা হলো ওদের মধ্যে। কিন্তু আজকে সবাই চুপচাপ ফ্রান্সিস এখনও মার মৃত্যুশোকের ধাক্কাটা পুরোপুরি সামলাতে পারেনি। তাই ওর মন চাইছিল অন্য বিষয় নিয়ে কথা বলতে। অই জিজ্ঞেস করলো, এরিক দ্য রেডের’ গুপ্তধন কীভাবে আনা হলো?
–সব উৎসব, শোভাযাত্রা রাজা বাতিল করে দিয়েছেন। রাজবাড়ির একটা গাড়িতে করে বাক্সটা এনে রাজার যাদুঘরে রাখা হয়েছে। হ্যারি বললো।
–আসল কথা তোমার মার মৃত্যুতে রাজা অত্যন্ত শাক পেয়েছেন। তিনি কোনরকম আনন্দ-উৎসব এ সময় করতে চান না। বিস্কো বললো।
ফ্রান্সিস আর কোন কথা বলল না। আরো কিছুক্ষণ বসে রইলো ওরা। তারপর একটু রাত হতে সকলে চলে গেল।
ফ্রান্সিস যেন অন্য মানুষ হয়ে গেল। কোথাও বেরোয় না। চুপচাপ নিজের ঘরে বসে থাকে। কখনও কখনও মার ঘরে গিয়েও বসে থাকে। সেদিন মার ঘরের কাছে এসে দেখলো, বাবা একদৃষ্টিতে মার ছবিটার দিকে তাকিয়ে বসে আছে। চোখের জল গাল বেয়ে পড়ছে। এই ঘটনাটা ওর মনকে ভীষণভাবে নাড়া দিল। বুঝলো, বাবাকে বাইরে থেকে বোঝা যায় না। বড় চাপা স্বভাবের মানুষ। বুঝলো, বাবার শোক ওর চেয়ে কিছু কম নয়।
