জাহাজ চলতে লাগলো। কয়েকদিন পরেই দেখা গেল, সমুদ্রে আর হিমশৈল ভাসছে । এবার বেশ গরম বোধ হতে লাগল। ভাইকিংরা এস্কিমোদের মাথাঘাড় ঢাকা পোশাক ছেড়ে তাদের পোশাক পরতে লাগলো। সমুদ্র শান্ত। বাতাসও বেগবান। পাল ফুলে। উঠলো। জাহাজ চললো দ্রুতগতিতে। একদিন শুধু ঝড়ো আবহাওয়ার মধ্যে পড়লো ওরা। কয়েক ঘণ্টা পরেই সে আবহাওয়া আর রইলো না।
জাহাজ একদিন ভাইকিংদের দেশে পৌঁছল। তখন দুপুরবেলা। বন্দরে লোকজনের ভীড় ছিল। ফ্রান্সিসদের জাহাজ ভিড়লে অনেকেই ফ্রান্সিস আর হ্যারিকে চিনলো। ওরা হৈ হৈ করে উঠলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফ্রান্সিসদের ফেরার খবর রাজধানীতে ছড়িয়ে পড়লো। হাজার-হাজার লোক জাহাজঘাটায় এসে ভীড় করলো। চিৎকার করে বলতে লাগলো, ফ্রান্সিস, তোমরা কি এনেছ, আমাদের দেখাও।
অগত্যা ফ্রান্সিস ওর বন্ধুদের এরিক দ্য রেডের বাক্সটা নিয়ে গিয়ে দেখাতে বললো। ওরা বাক্সটা বাইরে নিয়ে এলো। কয়েকজন মিলে উঁচু করে বাক্সটা দেখাতে লাগলো। হীরে জহরৎ আর চুনি-পান্নার কারুকাজ করা ছোরা, কুঠার দেখে ওরা অবাক হয়ে গেল। এবার বন্ধুরা অনেকে এসে বললো, ফ্রান্সিস, অনেকদিন আমরা বাড়ি ছাড়া। আমাদের বাড়ি যেতে দাও।
ফ্রান্সিস কী আর করে। বললো, আমি আর হ্যারি থাকছি। রাজার সৈন্য না আসা পর্যন্ত আরো কয়েকজন থাকো। বাকীরা বাড়ি যাও।
অনেকেই জাহাজ থেকে নেমে ঘোড়ার গাড়ি ধরতে ছুটল। ফ্রান্সিস বিস্কোকে বললো, তুমি বাড়ি যাবার সময় রাজপ্রাসাদে আমাদের আসার সংবাদটা দিয়ে যেও।
কিছুক্ষণ পরে দেখা গেল, বেশ কিছু বন্ধু জাহাজে ফিরে এলো। একসময়ে বিস্কোও ফিরে এলো। ফ্রান্সিস আর ম্যারিএর অর্থ বুঝলো না। কী ব্যাপার? ওরা সব ফিরে এলো কেন?ওরা সবাই কেমন ফ্রান্সিসকে এড়িয়ে–এড়িয়ে যেতে লাগলো। ফ্রান্সিস যত ওদের ফিরে আসার কারণ জানতে চাইল, ওরা ততোই কোন কথা না বলে সরে সরে যেতে লাগলো।
হ্যারি এবার বিস্কোকে ধরলো। আড়ালে ডেকে নিয়ে বললো, কী হয়েছে বলে তো? তোমরা ফ্রান্সিসকে অমন এড়িয়ে–এড়িয়ে যাচ্ছো কেন?
বিস্কো একটু চুপ করে রইলো। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, হ্যারি অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলছি, ফ্রান্সিসের মা দিন-পাঁচেক আগে মারা গেছেন। যারা বাড়িতে গেছে, তারাই খবরটা শুনেছে। ফ্রান্সিসের এই দুঃখের দিনে ওর পাশে না থেকে, বাড়িতে শুয়ে আমবা বিশ্রাম করবো? তাই ফিরে এসেছি।
হ্যারি মহা সমস্যায় পড়লো। ওকে কীভাবে এই ভীষণ শোকাবহ কথাটা জানাবে? তখনই দেখলো, ফ্রান্সিস তার দিকেই আসছে। ও এসেই জিজ্ঞেস করলো, কী ব্যাপার বলো তো? ওরা এ-রকম ব্যবহার করছে কেন?
হ্যারি নিজেও ফ্রান্সিসের মাকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করত, ভালোবাসত। এরকম মা পাওয়া ভাগ্যের কথা। এই খবর শুনে পর্যন্ত বুকে একটা টন্টনে ব্যথা ও অনুভব করছিল। প্রাণপণে সেই ব্যথাটা সহ্য করছিল। একটু ধরা গলায় ও বললো তুমি বাড়ি যাও।
–সে কি! তুমি একা থাকবে?
–তা কেন?বিস্কো থাকবে, যারা ফিরে এসেছে, তারাও থাকবে।
ফ্রান্সিস এবার ঘুরে হ্যারির চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। একটু গম্ভীর স্বরে বললো, কী ব্যাপার বলো তো? তোমাদের সকলের ব্যবহারেই আমি কেমন একটা অস্বাভাবিক লক্ষ্য করছি। মনে হচ্ছে, তোমরা আমার কাছে কিছুলুকচ্ছো।
–তুমি বাড়ি যাও। হ্যারি সহজ গলায় বলতে চেষ্টা করল, কিন্তু পারলো না। ওর গলার ব্যথা কাতর ভাবটা চাপা থাকল না।
হঠাৎ ক্রুদ্ধস্বরে চিৎকার করে উঠলো, ফ্রান্সিস, বাড়ি যাবো না আমি।
তারপর দ্রুত এগিয়ে হ্যারির গলার কাছে জামাটা মুঠো করে চেপে ধরে দাঁতচাপা স্বরে বলে উঠলো, পরিষ্কার বলো, কী হয়েছে?
হ্যারির প্রায় দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হলো। হ্যারি তবু চুপ করে রইলো। কোন কথা বললো না।
–হ্যারি ই-ই। ক্রুদ্ধস্বরে ফ্রান্সিস বলে উঠলো।
হ্যারি শান্ত স্বরে বললো, আমার জামা ছেড়ে দাও।
ফ্রান্সিস ওর জামা ছেড়ে দিল। হ্যারি আগের মতই শান্তস্বরে বললো, দুঃখের সঙ্গে বলছি, কথাটা তুমি আমাকে বলতে বাধ্য করলে।
হ্যাঁ-হ্যাঁ বলো। ফ্রান্সিস একটু হাঁপাতে-হাঁপাতে বললো।
–পাঁচদিন আগে তোমার মা মারা গেছেন।
ফ্রান্সিস কেমন যেন শূন্যদৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে রইলো। একটা কথাও বলতে পারল না। চোখের সামনে ও যেন কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। ও আস্তে-আস্তে জাহাজ ঘাটার সঙ্গে লাগিয়ে রাখা পাটাতন দিয়ে হেঁটে জাহাজঘাটায় নামলো। বিস্কো ছুটে এলো হ্যারির কাছে। হাঁপাতে হাঁপাতে বললো, ওকে এই অবস্থায় একা ছেড়ে দিলে? বলেই ও ফ্রান্সিসের দিকে ছুটে যেতে গেল।
হ্যারিওকে আটকে দিল। বললো, ওকে একাই যেতে দাও, আমরা বরং জাহাজে থাকি।
ওদিকে ফ্রান্সিসকে জাহাজ থেকে নামতে দেখে, জনতার ভীড়ে উল্লাসধ্বনি উঠলো–ফ্রান্সিস দীর্ঘজীবী হও।
ইতিমধ্যে সবাই ঘিরে ধরলো ফ্রান্সিসকে। সকলেই ওর সঙ্গে করমর্দন করতে চায় ওর গায়ে হাত দিতে চায়। কিন্তু ওর নিরাসক্ত উদাসীন ভাব দেখে সকলেই একটু আশ্চর্য হলো। ফ্রান্সিস দৃঢ় পায়ে ভীড়ের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসতে গেল। সবাই ওকে যাবার পথ করে দিল। সে কোন দিকে তাকালো না। সোজা গিয়ে একটা গাড়িতে উঠলো, গাড়ি চলতে শুরু করলো। কেউই তার এই নিরাসক্ত ব্যবহারের কারণ বুঝলোনা। তবু দু’পাশে ভীড় করে লোকেরা গাড়ির সঙ্গে সঙ্গে যেতে লাগলো।
