খাওয়া-দাওয়া সেরে সবাই রওনা হবার জন্যে তৈরি হল। রাজা সোক্কাসন, মন্ত্রী, কয়েকজন অমাত্য এলেন ওদের বিদায় জানাতে। রাজা ফ্রান্সিসকে আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর ফ্রান্সিস এসে গাড়িতে উঠলো।
যাত্রা শুরু হল।
সকলেই খুশি। আবার স্বদেশে ফিরে যাচ্ছে। হৈ হৈ করে বরফের প্রান্তরের ওপর দিয়ে গাড়ি চালাতে লাগলো। দিনটা মেঘ আর কুয়াশায় মুক্ত। রোদ খুব উজ্জ্বল নয়। তবু অনেকদূর পর্যন্ত আলো ছড়ানো দেখা যাচ্ছে। চিৎকার করে ওরা কুকুরগুলোকে উৎসাহ দিচ্ছে। বাতাসে চাবুকের ঘা-এর শব্দ উঠছে। বেশ জোরেই চললো শ্লেজগাড়িগুলো। সবার সামনে ফ্রান্সিসের গাড়ি। নেসার্ক চালাচ্ছে গাড়িটা। ও-ইপথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে। তুষার আর বরফে ঢাকা প্রান্তরে পথ বলে কিছু থাকে না। শুধু দিক ঠিক করে গাড়ি চালাতে হয়। লক্ষ্য রাখতে হয়, হিমবাহ আর গলা বরফের এলাকার দিকে। গাড়ি যেন হিমবাহ আর গলা বরফের মধ্যে গিয়ে না পড়ে। সামনে রয়েছে নেসার্ক। ও-ওর অভিজ্ঞ দৃষ্টিতে সব দিকে নজর রেখে চলেছে।
দু’দিন বেশ নির্বিঘ্নেই কাটল। কিন্তু কোর্টল্ড পৌঁছবার আগের দিন বিকেলের দিকে কুয়াশায় চারদিক অন্ধকার হয়ে এলো। ফ্রান্সিস গাড়ি চালক সবাইকে নির্দেশ দিল গাড়ি থামিয়ে আসন্ন ঝড়ের মোকাবিলা করতে। নইলে ঝড়ের মধ্যে যে কোন গাড়ি দলছুট হয়ে যেতে পারে। ফ্রান্সিসের এই ব্যাপারে পূর্বঅভিজ্ঞতা ছিল। ওর নির্দেশমতো গাড়িগুলো নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইলো। একটু পরেই শুরু হলো তুষার বৃষ্টি, আর সেই সঙ্গে প্রবল ঝড়ো হাওয়ার ঝাপ্টা। কেউ কেউ কুকুরগুলোর আড়ালে বরফের ওপর উবু হয়ে রইলো। ফ্রান্সিস এর আগেও ঝড়ের কবলে পড়েছে। কিন্তু আজকের ঝড়টা আরো প্রচণ্ড। নাক মুখ চাপা দিয়ে সে গাড়িতে বসে রইলো। প্রায় সকলেরই এক অবস্থা। শুধু নেসার্ক আর সাঙখুঝড়ের মধ্যে বলগা ও কুকুরগুলোর পরিচর্য্যা করতে লাগলো। এগুলোর গায়ে জমা তুষার পরিষ্কার করে দিতে লাগলো। গাড়ির লাগাম, দড়ি-দড়া ঠিক করতে লাগলো।
ভাগ্য ভাল, অল্পক্ষণের মধ্যেই ঝড়ো হাওয়া কমলো। তুষারবৃষ্টিও কমে এলো। আবার যাত্রা শুরু হল। কিন্তু আকাশ পরিষ্কার হলো না। কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্ধকার গাঢ় হলো। রাত্রি নামলো। ওরা সে রাত্রের মত থামলো। তাবু খাটাল, রান্না করে খাওয়া দাওয়া সারলো। তারপর রাতের মত ঘুমিয়ে পড়লো।
পরদিন আবার যাত্রা শুরু হল। দুপুরের দিকে ওরা কোর্টল্ড পৌঁছল। একদিন পুরো বিশ্রাম নিল। তারপর আবার যাত্রা।
কয়েকদিন পরে আঙ্গামাগাসালিক বন্দরে পৌঁছল। পথে তুষার ঝড়ের কবলে পড়তে হয়নি। যাত্রা নির্বিঘ্নেই শেষ হল। পথে সাঙখু একটা শ্বেতভালুক শিকার করেছিল। ছুরি দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ভালুকটার চামড়া ছাড়িয়ে গাড়িতে তুলে নিয়েছিল। হারি একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। অবশ্য কোর্টন্ডে একদিন বিশ্রাম নিয়ে হ্যারি অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছিল।
আঙ্গামাগাসালিকে ওরা পৌঁছল বিকেলের দিকে। তখনই চারদিক প্রায় অন্ধকার হয়ে এসেছে। শ্লেজগাড়িগুলো থেকে জিনিসপত্র নিয়ে একেবারে অন্ধকার হয়ে আসার আগে জাহাজে তোলা হল। খুব উৎসাহের সঙ্গে সবাই কাজ করে গেল। রাত্রে জাহাজ চালানো বিপজ্জনক। কারণ এখানকার সমুদ্রে বহুদূর পর্যন্ত হিমশৈল ভেসে বেড়াচ্ছে। কোন একটার সঙ্গে অন্ধকারে ধাক্কা লাগলে জাহাজডুবি হবে। কাজেই স্থির হল সকালে রওনা হব। রাত্রি হল। খাওয়া-দাওয়ার পর ওরা নৌকো করে তীরে এল। কালুটুলার তাবুতে গেল। কালুটুলা খুব খুশি হল। আগুন জ্বেলে এক্সিমোরা আগুনের চারপাশে নাচছিল, ড্রাম বাজাচ্ছিল, গান গাইছিল। ওরা সেই নাচ-গানের আসরে যোগ দিল। অনেক রাত পর্যন্ত নাচ-গান চললো। তারপর জাহাজে ফিরে এল।
পরদিন নেসার্ক ওদের কাছ থেকে বিদায় নিতে এল। ফ্রান্সিস নেসার্ককে জড়িয়ে ধরল। আবেগে ও কথা বলতে পারছিল না। নেসার্কের এক অবস্থা। ফ্রান্সিস বাক্স থেকে একটা মনিমুক্তো খচিত খাপওয়ালা ছোরা বের করে রেখেছিল। সে ওটা নেসার্কের হাতে দিল। নেসার্ক নিতে রাজি হচ্ছিল না। তখন ফ্রান্সিস বললো, এটা তোমাদেরই অতীতের এক রাজার সম্পত্তি। এটা তোমারই প্রাপ্য।
নেসার্ক নিল ছোরাটা। ওর চোখমুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ওর ওপর ফ্রান্সিসের কেমন একটা মায়া পড়ে গিয়েছিল। ও বার-বার ফ্রান্সিসকে ধন্যবাদ দিতে লাগলো। তারপর হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে বলগা হরিণে-টানা শ্লেজগাড়িটা নিয়ে চলে গেল।
এবার এস্কিমো সর্দার কালুটুলা আর সাঙখুর কাছ থেকে বিদায় নেবার পালা। ফ্রান্সিস আর হ্যারি কালুটুলার তাঁবুতে গেলো। জাহাজে যে কটা রঙীন কাপড় ছিল সব নিয়ে গেল। রঙীন কাপড়গুলো কালুটুলাকে উপহার দিল। কালুটুলা বারবার বলতে লাগলো ‘কুয়অনকা’ অর্থাৎ ‘তোমাকে ধন্যবাদ’। সাঙখুকে ওরা জড়িয়ে ধরল। ওদের জন্যে অনেক করেছে সাঙখু। ফ্রান্সিস দু’জনকে দুটো মুক্তো দিল। ওরা রঙীন কাপড় আর মুক্তো পেয়ে খুব খুশি হল। ওরা জাহাজে ফিরে এল। এবার স্বদেশের উদ্দেশ্যে সমুদ্রযাত্রা। দড়ি-দড়া ঠিক করে পাল খাঁটিয়ে জাহাজ ছেড়ে দিল। বরফের দেশ পেছনে পড়ে রইল। জাহাজ চললো দক্ষিণমুখো। সমুদ্রের জলে এখানে-ওখানে হিমশৈল ভাসছে। তার মধ্যে দিয়ে ধাক্কা এড়িয়ে সাবধানে জাহাজ চালাতে লাগলো। ওরা খুব দক্ষ জাহাজচালক।
