ফ্রান্সিস আর হ্যারি সিঁড়ি দিয়ে পর-পর ওপরে উঠে এলো। ওরা আসতেই সবাই একজন-একজন করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে ধনভাণ্ডার দেখে যেতে লাগলো। দু’চারজন মৃত এস্কিমোটাকে দেখে ভয়ে চিৎকার করে উঠলো। ওরা দেখে একে-একে ওপরে উঠে আসছে যখন, বিস্ময়ের ঘোর তখনও তাদের কাটেনি। এত ধনসম্পদ? একসঙ্গে?
সবারই দেখা হলো। ফ্রান্সিস তখন বললো, এবার বাক্সটা ঘরে নিয়ে যেতে হবে। এখানে এত ধনসম্পদ ফেলে রাখা যাবে না। কে-কে যাবে যাও।
চার-পাঁচজন ভাইকিং তৈরি হলো। দু’জনে ঘরের ভেতরে নামল। বাক্সটার দু’পাশে দুটো পেতলের কড়া। সেই দুটো ধরে ওরা বাক্সটা সিঁড়ির কাছে নিয়ে এলো। বেশ ভারী বাক্সটা বেশ পরিশ্রম হলো ওটা তুলে আনতে। অন্য দু’জন তখন একে-একে সিঁড়ি বেয়ে বাক্সটা বাইরে নিয়ে এলো। তারপর চারজন বাক্সটা কাঁধে তুলে নিয়ে গীর্জার বাইরে এলো। তারপর সবাই মিলে চললো, ফ্রান্সিসের আস্তানার দিকে। ওরা খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। হৈ-হৈ করতে করতে বরফ কাদার মধ্যে দিয়ে চললো-গানও ধরল কে যেন।
ফ্রান্সিস ও হ্যারির ঘরে বাক্সটা রাখলো ওরা। তারপরেও এসব নিয়ে বসে কিছুক্ষণ নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বললো। তারপর নিজেদের তাবুতে, রাজবাড়ির যে সব ঘরে আশ্রয় নিয়েছিল, সে-সব ঘরে ফিরে গেলো।
পরের দিন ফ্রান্সিস আর হ্যারি ঘর থেকে বেরলো না। শুয়ে-বসে দিনটা কাটিয়ে দিল। রাত হলে ভাইকিংরা তাবুর সামনে আগুন জ্বেলে, অনেক রাত পর্যন্ত আনন্দ হৈ হল্লা করলো। আগুনের চারপাশে ঘুরে-ঘুরে নাচল, গান গাইল।
পরের দিন, তখন বিকেল। ফ্রান্সিস আর হ্যারি নিজেদের ঘরে বসে কথাবার্তা বলছে। ফ্রান্সিস বললো, বাবাকে কথা দিয়েছিলাম, দেড় মাসের মধ্যে ফিরবো। কিন্তু বোধহয় কথা রাখতে পারবো না। যা বুঝতে পারছি আরো কয়েকদিন দেরি হবেই। এখন রাজা সোক্কাসন এলে বাঁচি। সব ধনদৌলত তার হাতে না তুলে দেওয়া পর্যন্ত নিশ্চিন্ত হতে পারছি না।
ওদের এসব কথাবার্তা চলছে, তখনই একজন ভাইকিং এসে খবর দিল, রাজা সোক্কাসন নিজে এসেছেন।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি তৈরি হয়ে বাইরে বেরোতে যাবে, তার আগেই রাজা এসে ঘরে ঢুকলেন, পেছনে রানী। দুজনেই মাথা নীচু করে সম্মান জানালো। রাজা ছুটে এসে ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরলেন। ও তখন ভাবছে, রাজা-রানীকে কোথায় বসাব? রাজার আলিঙ্গন থেকে মুক্ত হয়ে বললো, আপনাদের কোথায় যে বসতে দিই?
রানী হেসে বললেন, আমরা এখানেই বসছি।
রানী হ্যারির বিছানায় বসলেন, রাজা ফ্রান্সিসের বিছানায়। বসেই যখন পড়েছেন, তখন আর কী করা যাবে?
ফ্রান্সিস বললো, আপনারা তো এখনো এরিক দ্য রেডের গুপ্তধন দেখেন নি।
কথাটা শেষ করেই ও চাবি দিয়ে বাক্সটার তালা খুলে ডালাটা তুললো। রাজা-রানী দু’জনেই বিস্ময়ে হতবাক। এত মূল্যবান সম্পদ?
রানী বিছানা থেকে নেমে কিছু গয়নাগাটি তুলে-তুলে দেখলো।
ফ্রান্সিস বললো, আপনারা এসে গেছেন। বাক্সটা লোক পাঠিয়ে রাজবাড়িতে নিয়ে যান। এবার আমাদের ছুটি দিন।
রাজা কিছুক্ষণ বাক্সটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরস্বরে বললেন, এই গুপ্ত ধনভাণ্ডার তুমিই আবিষ্কার করেছ–এর সবটাই তোমার প্রাপ্য।
ফ্রান্সিস বললো–না মহারাজ। উত্তরাধিকার সূত্রে এই সম্পদ আপনারই প্রাপ্য।
রাজা মাথা নাড়লেন, না তা হয় না। তোমাকেই নিতে হবে এই ধন ভাণ্ডার।
হ্যারি এতক্ষণ চুপ করেছিল। এবার এগিয়ে এসে বললো, মহারাজ এবার আমি একটা কথা বলবো?
–বলো।
–বলছিলাম, আপনি যদি ফ্রান্সিসকে অর্ধেক ধনভাণ্ডার দেন, তাহলে আর কোন সমস্যাই থাকে না।
ফ্রান্সিস ভেবে দেখলো, এছাড়া সমাধানের কোন পথ নেই। ও বললো, আপনি যখন আমাকে দিতেই চান, তখন অর্ধেক দিন। তাতেই আমি খুশি হবো।
–বেশ। রাজা উঠে দাঁড়ালেন। রানী বিছানা ছেড়ে উঠতে উঠতে বললেন, আজ রাত্রে রাজবাড়িতে আপনাদের সকলের নিমন্ত্রণ। আসবেন কিন্তু।
–নিশ্চয়ই। ফ্রান্সিস বললো। আবার ওরা রাজা-রানীকে সম্মান জানালো। রাজা ও রানী চলে গেলেন।
রাত্রে ফ্রান্সিসরাও রাজবাড়িতে খেতে গেল। একটা বড় ঘরে খাওয়ার আয়োজন করা হয়েছে। সব এস্কিমো সৈন্যরা ওদের মাথা নুইয়ে সম্মান জানালো। ফ্রান্সিসকে বসতে হলো রাজা ও রানীর মাঝখানে। নেসার্কের মুখে পরে ফ্রান্সিস শুনেছিল, এটা একটা নাকি দুর্লভ সম্মান। অন্য দেশের রাজা-মহারাজাকেই এই সম্মান দেওয়া হয়। অনেক রাত পর্যন্ত খাওয়া-দাওয়া চললো। রাজা ওদের বিদায় জানাতে রাজবাড়ির প্রধান ফটক পর্যন্ত এলেন। তখনই ফ্রান্সিসকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা কবে ফিরে যাবেন?
–কালকে দুপুর নাগাদ আমরা দেশের উদ্দেশ্যে রওনা হব।
রাজা বললেন, ধনভাণ্ডার দু’ভাগ করার দায়িত্ব মন্ত্রীকে দিয়েছি। কাল সকালেই তোমার প্রাপ্য অর্ধাংশ পৌঁছে দেওয়া হবে।
একটু আমতা-আমতা করে ফ্রান্সিস বললো, যদি কিছু মনে না করেন আর একটা অনুরোধ।
–বলো।
–ধনভাণ্ডারের বাক্সটা আমার খুব পছন্দ। বড় সুন্দর বাক্সটা।
রাজা হেসে উঠলেন। এ আর বেশি কথা কি। ওটা তোমাকেই দেব।
ওরা রাজার কাছে বিদায় নিয়ে চলে এল নিজেদের আস্তানায়।
পরের দিন সকাল থেকেই শুরু হল ভাইকিংদের কর্মতৎপরতা। সবাই হাত লাগালোর জিনিসপত্র গোছগাছ করতে। কথাবার্তা, ডাকাডাকিতে মুখর হয়ে উঠলো বাট্টাহালিড্ড়। ওরা যাবার আয়োজনে ব্যস্ত, তখনই রাজার বলগা হরিণে টানা শ্লেজগাড়িটা নিয়ে নেসার্ক এল। গাড়িটায় এরিক দ্য রেডের অর্ধেক ধনভাণ্ডারসহ বাক্সটা রাখা। নেসার্ক ফ্রান্সিসকে বললো, রাজার নির্দেশে এই বাক্সটাসহ আপনাকে আঙ্গামাগাসালিক বন্দর পর্যন্ত পৌঁছে দিতে হবে।
