ফ্রান্সিস পায়ের জুতো খুলে ফেললো। তারপর এক লাফে বেদীটার ওপর উঠলো। ওর কাঁধের কাছে পেতলের মূর্তিটা। ফ্রান্সিস মূর্তিটার মুখের কাছে মুখ আনল। মূর্তির চোখের দৃষ্টিটা সামনের দিকে নয়। একটু তেড়চা। আশ্চর্য!
ফ্রান্সিস চিৎকার করে ডাকলো, হ্যারি, শীগগির উঠে এসো।
হ্যারিও জুতোটা খুলে উঠলো।
হ্যারিও মূর্তিটার মুখের কাছাকাছি বাঁ-দিকের আংটাটা। ও বলেউঠলো, ফ্রান্সিস, আংটাটা!
ফ্রান্সিস তখন ঘরময় পায়চারি করতে করতে বলছে মেঝেয় অত কাছে আংটা–মশাল রাখবার জন্য? অসম্ভব। পায়চারী থামিয়ে বলে উঠলো, এরিক দ্য রেডের গুপ্ত ধনভাণ্ডার আমাদের হাতের মুঠোয়। আংটায় আটকানো পাথর সরাতে হবে। সবাই যাও, কুঠার নিয়ে এসো। পাথরের খণ্ড আলগা করে তুলতে হবে।
হ্যারি বেদী থেকে এক লাফে নেমে এল। ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরে চেঁচিয়ে বলে উঠলো, সাবাস ফ্রান্সিস–সাবাস! তুমি সংকেতটা ঠিক ধরতে পেরেছ।
ফ্রান্সিস তখন নীচু হয়ে আংটাটা যে পাথরের গায়ে ওটা পোঁতা আছে, সেটা পরীক্ষা করতে লাগলো। দেখলো পাথরটা বেশ বড়।
বন্ধুরা কুঠার নিয়ে এসে হাজির হল। ফ্রান্সিস ওদের বললো, দুজন দু’দিক থেকে পাথরের জোড়ের খাঁজে কুঠারের কোপ বসাও।
দুজন দুদিকে দাঁড়িয়ে কুঠারের কোপ বসাতে লাগলো। কিন্তু অনভ্যস্ত হাতের কোপ ঠিক জোরে পড়ছিল না। ওদিকটা কিছু অন্ধকার থাকাতেই এটা হয়তো হচ্ছে।
ফ্রান্সিস বললো, মশাল জ্বালিয়ে আনো৷
মশাল আনা হলো অল্পক্ষণের মধ্যেই। আবার কুঠার চালালো ওরা, কিন্তু ঠিক জোরে লাগলোনা। পাথরের চাকলা উঠে এলো শুধু। এর মধ্যেই মুখে-মুখে সবাই জেনে গেছে যে, গুপ্ত ধনভাণ্ডার খোঁড়া হচ্ছে। সবাই এসে ভীড় করে দাঁড়ালো। ফ্রান্সিস মুখ তুলে সকলের দিকে তাকাল। বললো, নেসার্ক নেই, মুস্কিল হলো।
হঠাৎ সাঙখুর দিকে নজর পড়লো। ভালুক শিকারী ও, কুঠার চালাতে ওস্তাদ। ফ্রান্সিস তাকে ডেকে বললো, ঠিক পাথরের জোড়েরওপর কুঠার চালাও পাথরটা তুলে নিতে হবে।
সাঙখু কুঠার হাতে এগিয়ে এলো। ঠিক জোড়ের মুখে কুঠারের কোপ পড়তে লাগলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই পাথরটা আলগা হয়ে গেল। ফ্রান্সিস সাঙখুকে থামতে বললো। তারপর আংটাটা ধরে টানতে লাগলো। বুঝলো, পাথরের জোড় এখনও খোলেনি। আবার সাঙখু কুঠার চালাতে লাগলো। পাথরটা আরো আলগা হতে ফ্রান্সিসের নির্দেশে থামল ও। তারপর হাঁপাতে লাগলো। ফ্রান্সিস কয়েকজনকে একসঙ্গে আংটাটা ধরে টানতে বললো। চার-পাঁচজন মিলে আংটাটা ধরে টানতে লাগলো। আস্তে আস্তে পাথরটা দেয়াল থেকে বেরিয়ে এলো। আরও কয়েকটা হ্যাঁচকা টান পড়তেই হুড়মুড় করে পাথরটা খুলে এলো। ফ্রান্সিস মশালটা নিয়ে খোঁদলের কাছে ধরে দেখলো, সিঁড়ির মতো পাথর পাতা। কিন্তু আরো পাথর না খসালে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না–নামবার সিঁড়ি কিনা? একটা পাথর খুলে আসতে খুব সুবিধে হলো। আশেপাশে পাথরগুলোর জোড় আলগা হয়ে গেল। দু’একজন মিলে টানতেই পাথরগুলো খুলে আসতে লাগলো।
ফ্রান্সিস মশাল এগিয়ে নিয়ে দেখলো, একটা গহ্বরের মতো। নীচের দিকে পাথরের সিঁড়ি নেমে গেছে, অন্ধকারে আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। ও কিছুক্ষণ মশাল হাতে দাঁড়িয়ে, ভেতরের বদ্ধ বাতাসটা বেরিয়ে যাবার জন্য অপেক্ষা করল। তারপর মাথা নীচু করে ঢুকে দেখলো, ভেতরটা বেশ বড়। মাথা না নামিয়ে ও সিঁড়ি বেড়ে নিচে নামতে লাগলো। পেছনে-পেছনে চললো হ্যারি।
একটা ঘরেরমতো জায়গায় এসে সিঁড়িটা শেষ হয়েছে। ঘরটার দেওয়াল পাথরের তৈরি। ঘরের ঠিক মাঝখানে একটা বিরাট কাঠের বাক্স। সোনার পাত নিয়ে বাক্সটায় নানা কারুকাজ করা। মিনে করা আছে তাতে। মশালের আলোয় ঝিকিয়ে উঠলো মিনে করা সোনার পাত। বাস্কটা বেশপরিষ্কার, ঠাণ্ডা ও বরফের দেশ বলেই বাক্সটায় ধূলোরআস্তরণ পড়েনি।
বাক্সটায় খোলার দিকটায় দেখা গেল, একটা রূপোর তালা ঝুলছে। রূপোর তালাটাতেও মিনের কাজ করা। ফ্রান্সিস আর হ্যারি মুখ চাওয়া চাওয়ি করল। লা বুশের গুপ্তধনের বাক্সগুলোর দ্বিগুণ এই বাক্সটা। ওরা দুজনেই বাক্সটার কারুকাজ দেখে অবাক হলো। হঠাৎ হ্যারি ওর কানের কাছে ফিসফিস করে বললো, ফ্রান্সিস ডান কোণায় দেখো।
ফ্রান্সিস মুখ তুলে ডানদিকে মশালটা বাড়াতে নিজে ভীষণ ভাবে চমকে উঠলো। দেখলো, এস্কিমোদের পোশাকপরা একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে। ডানহাতটা বাড়ানো। বোঝাই যাচ্ছে মৃত মানুষ, ভীষণ শীতের দেশ বলেই অবিকৃত আছে মৃতদেহটা। কিন্তু বড় জীবন্ত। এবারও মৃতদেহটার বাড়ানো হাতের দিকে লক্ষ্য করল। দেখলো, হাতের তেলোয় একটা বড় আকারের সোনার চাবি। ও আস্তে আস্তে হাত বাড়িয়ে চাবিটা তুলে নিল। কী ঠাণ্ডা মৃতের হাতটা।
চাবিটা দিয়ে তালা খুললো ফ্রান্সিস। তারপর এক াচকা টানে বাক্সের ডালাটা খুলে ফেললো। দেখলো, মশালের আলোয় ঝিকমিক করছে সোনার মোহর, হীরে-মুক্তো-চুনি পান্না বসানো বিচিত্র সব অলঙ্কার। মোহর, অলংকারে বাক্সটা ঠাসা। দামী মণি-মুক্তো বসানো খাপেভরা কয়েকটা ছোরা। কয়েকটা ছোট্ট সোনার কুঠার, মিনের কাজকরা তাতে।
ওদিকে ফ্রান্সিসের বন্ধুরা বাইরে অধৈর্য হয়ে উঠেছে। কতক্ষণে এরিক দ্য রেডের গুপ্তধন দেখবে। এদিকে সিঁড়ি দিয়ে একেজনের বেশি নামা যায় না। ফ্রান্সিস ওদের কথাবার্তা শুনতে পাচ্ছিল। বললো, হ্যারি, চলো বাইরে যাই। ওরা একে একে এসে দেখে যাক্।
