–তারপর থেকে ওখানেই রইলে?
–হ্যাঁ। অবশ্য ভেবেছিলাম স্লেজগাড়ি চড়ে কোর্টল্টে যাবো। কিন্তু গাড়ি পাইনি ওখানে। তাছাড়া শরীরও দুর্বল, সাহস পেলাম না। একটু থেমে বললো, নেসার্কের তাঁবুতেই অপেক্ষা করতে লাগলাম তোমাদের জন্যে। তারপর গত রাতে ঘন-ঘন বরফের চাই ভাঙছে কেন, প্রথমে বুঝলাম না। একটু ভেবে-চিন্তে বুঝলাম, পাহাড়ের ওপরের দিকে যে সরোবরটা দেখেছিলাম, তার জলের ধারা নেমে আসতেই বরফের চাই ভাঙছে, তাই পাহাড়টা কেঁপে কেঁপে উঠছে। বুঝলাম, খাল কেটে জল নামানো হয়েছে, আর এর পেছনে তুমি আছো। তখন মনে মনে সহস্রবার তোমার বুদ্ধির প্রশংসা করলাম। তারপর সকালেই নেসার্ক এলো। সব শুনলাম ওর কাছে।
এতক্ষণ ফ্রান্সিস গভীর মনোযোগের সঙ্গে হ্যারির কথা শুনছিল। হঠাৎ ওর মনে পড়ল, যীশুর বেদিতে পাওয়া এরিক দ্য রেডের টেষ্টামেন্ট’ বইটার কথা। ও তাড়াতাড়ি পোশাকের পকেট থেকে বইটা বের করে বললো, এই বইটা দেখো।
–এটাতো এরিক দ্য রেডের লেখা বাইবেল–আগেই দেখেছি।
–সেটা ছিল একই রকম দেখতে ওল্ড টেষ্টামেন্ট। এটা নিউ টেষ্টামেন্ট-অন্য খণ্ডটা।
–কোথায় পেলে এটা?
–হ্যারি সাগ্রহে বইটা হাতে নিল। ফ্রান্সিস কী করে বইটা পেল, রাজা এভাল্ডাসনের মৃত্যু–সব বললো।
হ্যারি আস্তে আস্তে বললো, এবার বোঝা যাচ্ছে ঐ সাংকেতিক কথাটার অর্থ–যীশুর চরণে বিশ্বাস রাখো। অর্থাৎ মূর্তির পায়ের নিচেই ছিল এটা।
মাথা নীচু করে কিছুক্ষণ ভাবলো হ্যারি। তারপর মাথা তুলে বললো, ফ্রান্সিস এই বইটাতে নিশ্চয়ই কোন সংকেত আছে।
মুখ ফিরিয়ে নেসার্ককে বললো, রাজবাড়ি থেকে আমাদের জন্য এক টুকরো কাগজ আর কালি নিয়ে এসো।
তারপর ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে বললো, তুমি শুয়ে বিশ্রাম কর। আমি সংকেতটা উদ্ধার করছি।
–মাথা খারাপ? তুমি সংকেত উদ্ধার করবে, আর আমি শুয়ে থাকবো? উঁহু সেটি হবে না। আমার বিশ্রাম নেওয়া হয়ে গেছে।
একটু পরেই নেসার্ক কাগজ-কলম নিয়ে এলো। দুই বন্ধু বইটার ওপর ঝুঁকে পড়লো। হ্যারি বইটার পাতা পেছন থেকে ওল্টাতে লাগলো আর প্রত্যেক পরিচ্ছেদের প্রথম মোটা অক্ষরটা বলে যেতে লাগলো আর লিখতে লাগলো। হ্যারি সবগুলো অক্ষর বললো। লেখা হল সব অক্ষরগুলো। দুই বন্ধু উত্তেজনায় ঝুঁকে পড়ল কাগজটার ওপর। স্পষ্ট অর্থবহ কথা, যীশুর দৃষ্টির সম্মুখে কিছুই গোপন থাকে না। দুই বন্ধু মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো। ফ্রান্সিস বললো, কী বুঝছো হ্যারি?
–আমার মনে হয়, এরিক দ্য রেডের গুপ্তধন ঐ গীর্জাতেই আছে। যীশুর মূর্তি তৈরি করা এবং এখানে বেদীর ওপর রাখার পেছনে নিশ্চয়ইএরিকদ্য রেডের কোন উদ্দেশ্য ছিল।
–তা–তো বুঝলাম। কিন্তু এই সংকেত থেকে গুপ্ত ধনভাণ্ডারের হদিশ পাবে?
–নিশ্চয়ই পাবো। তবে গভীরভাবে ভাবতে হবে। সেইজন্যে সময় চাই।
–বেশ ভাবো। ফ্রান্সিস বললো।
বন্ধুরা সবাই চলে গেল। দুই বন্ধু থরের ওপর বসে রইলো। একটু পরে সাঙখু আর দু’জন ভাইকিং শুকনো চামড়া দিয়ে ওদের বিছানা তৈরি করে দিয়ে গেল। হ্যারি বিছানায় শুয়ে কাগজের লেখাটা পড়তে লাগলো। সেই দিনটা ওরা শুয়ে-বসে ঘরেই কাটাল। বাইরে বেরোলোনা।
পরদিন নেসার্ককে ওরা কোর্টল্ড পাঠাল রাজা সোক্কাসনকে এখানে নিয়ে আসতে। তাঁর রাজত্ব তাকে ফিরিয়ে দিতে পারলেই একটা কর্তব্য শেষ হবে।
নেসার্ক বলগা হরিণ-টানা গাড়িটা নিয়ে রওনা হয়ে গেল।
দু’জনে ঘরের দিকে ফিরে আসছে, তখনই ফ্রান্সিস বললো, হ্যারি, তুমি তো এসে গীর্জাটাকে দেখোনি।
–না।
–জলে ধাক্কায় নীচুদিকের জানালাটার কাঁচ ভেঙে গেছে, গীর্জার মাথার ক্রুশটা ভেঙে গেছে, মূর্তিটাও মেঝের ওপর পড়ে আছে। একবার দেখে আসি চলো।
–বেশচলো। এই বলে গীর্জার দিকে যেতে যেতে ফ্রান্সিস তিন-চারজন ভাইকিং বন্ধুকে ডেকে নিল।
ওরা গীর্জার সামনে গিয়ে পৌঁছল। ফ্রান্সিসের মাথায় তখনও ঐ সাংকেতিক কথাটা, যীশুর দৃষ্টির সম্মুখে কিছুই গোপন থাকে না’ ঘুরছিল। ও নানাভাবে কথাটা ভাবতে ভাবতে গীর্জার অন্ধকার পরিবেশে ঢুকলো। ভাঙা জানালার মধ্য দিয়ে যেটুকু আলো? আসছে, তাতেই যা দেখা যাচ্ছে। ফ্রান্সিস বন্ধুদের বললো, মূর্তিটা তুলে বেদীতে বসাতে হবে। হাত লাগাও সবাই।
সবাই মূর্তিটার কাছে এলো। ধরাধরি করে মূর্তিটা তুললো। তারপর কাঠের বেদীটায় বসাতে গিয়ে দেখলো, উল্টোমুখো হয়ে যাচ্ছে।
হ্যারি বলে উঠলো, আরে উল্টো হয়ে যাচ্ছে, সোজা করে বসাও।
কথাটা ফ্রান্সিসের কানে যেতেই ও চমকে উঠলো। পর-পর কয়েকটা কথা ওর মনে বিদ্যুৎ ঝলকের মত খেলে গেলো, যীশুর চরণে বিশ্বাস রাখো’, পায়ের নীচেই পাওয়া গেল বাইবেলের পরের খণ্ড, দুটো বই-এর উল্টো দিক থেকে অক্ষর সাজিয়ে অর্থময় ইঙ্গিতপূর্ণ কথা পাওয়া গেছে, মূর্তিটার মুখও যদি উল্টোদিকে করা যায়, যীশুর দৃষ্টির সম্মুখে কিছুই গোপন থাকে না।
উল্টোদিকের মুখ দৃষ্টির লক্ষ্য। কিসের দিকে সেই দৃষ্টি? ফ্রান্সিস চিৎকার করে উঠলো, মুর্তিটা উল্টোদিকে মুখ করেই রাখো। দেখো রাখা যায় কিনা।
সকলেই ফ্রান্সিসের এই কথায় আশ্চর্য হলো। হঠাৎ উল্টোমুখি করে মূর্তি রাখার কল্পনা ওর মাথায় এলো কেন? যাহোক ওরা মূর্তিটা উল্টোমুখি করে বেদীতে বসাল। আশ্চর্য ঠিক মাপে আটকে গেলো।
