–কী রয়েছে?
–একটা বইয়ের মত কিছু!
–বই?
ফ্রান্সিস কথাটা বলেই মেঝে থেকে লাফিয়ে তাড়াতাড়ি বেদীটার ওপর উঠলো। দেখলো, যে কাঠের বেদীটায় মূর্তিশুদ্ধ ক্রুশটা বসানো ছিল, তারমধ্যে চৌকোণ গর্ত রয়েছে। একটা লাল মলাটের মত কিছু দেখা যাচ্ছে। ফ্রান্সিস চেঁচিয়ে উঠলো, শীগগির মশালটা নিয়ে এসো।
একজন ছুটে গিয়ে মশালটা নিয়ে এলো। ও দেখলো, ঠিক এরিক দ্য রেডের ওল্ড টেস্টামেন্টের বইয়ের মত লাল মলাট। ও বইটা আস্তে-আস্তে বের করে মলাট ওল্টালো। লেখা দেখল, নিউ টেস্টামেন্ট।
এই বইটার বৎ, রাজা সোক্কাসন বলেছিলেন। কিন্তু এই বইটা কোথায় আছে, তা কেউ জানত না। সেই চামড়ার তৈরি কাগজে এরিক দ্য রেডের নিজের হাতে লেখা। সেই প্রথম অক্ষরগুলো মেলায়। কিন্তু শরীর অত্যন্ত ক্লান্ত। প্রায় অবধারিত মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে এসেছে। শরীর আর চলছে না, মনও আর কিছু ভাবতে পারছেনা। ওদিকে ভোর হয়েছে, বাইরে ফ্যালকন পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে।
ফ্রান্সিস বইটা হাতে নিয়ে সকলের দিকে তাকিয়ে বললো, কয়েকজন চলে যাও। আমাদের তাবু জিনিসপত্র শ্লেজগাড়িগুলো সব এখানে নিয়ে এসো। এখানে সবকিছু জলে ভিজে গেছে। শুকনো বিছানাপত্র খাবার চাই। কথাটা বলে ক্লান্ত পায়ে গীর্জার দরজার দিকে এগুলো। আর সবাই ওর পেছনে পেছনে আসতে লাগল।
গীর্জার বাইরে এসে নেসার্ক ফ্রান্সিসকে বললো, আমি আমাদের টুপিকে যাচ্ছি।
ও মাথা নেড়ে বললো, বেশ-কিন্তু তোমাকে কালকেই কোটল্ডে রওয়া হতে হবে। রাজা সোক্কাসনকে ফিরিয়ে আনতে হবে।
–ঠিক আছে, আমি কালকেই যাবো৷’ নেসার্ক কথাটা বলে চলে গেল।
যে ঘরটায় ফ্রান্সিস আর হ্যারি আস্তানা নিয়েছিল সেই ঘরটার সামনে ও এলো। শ্লেটপাথরের দরজা সরিয়ে ও ভেতরে ঢুকল। তখন আলো ফুটেছে, সেই ম্লান আলোয় দেখলো, বিছানার সবকিছু ভিজে গেছে। ভেজা বিছানাটা মেঝেয় ফেলে দিল ও। তারপর পাথরের ওপর শুয়ে পড়ল। একটু পরেই ঘুমিয়ে পড়ল।
তখন বেশ বেলা হয়েছে। এতক্ষণ কেউ আর ফ্রান্সিসকে ডাকেনি। ও একটু ঘুমিয়ে নিল। সবাই তবুখাটাতে, জিনিসপত্র গোছ-গাছ করতে ব্যস্ত। এমন সময় ওরা দেখলো নেসার্ক শ্ৰেজগাড়ি চালিয়ে আসছে। নেসার্কের সঙ্গে ও কে বসে? এ কী। এ যে হ্যারি! কাছাকাছি যারা ছিল গিয়ে গাড়ি ঘিরে দাঁড়াল। সে কি উল্লাস তাদের। হ্যারি বেঁচে আছে? অন্যরাও খবর পেল। হ্যারি গাড়ি থেকে নামতে সবাই ওকে এক এক করে। জড়িয়ে ধরল। হ্যারি হাত নাড়ছিল আর হাসছিল। হ্যারিকে বেশ রুগ্ন দেখাচ্ছিল। তবু বেঁচে আছে তো। সবাই হৈ হৈ করতে করতে ছুটল ফ্রান্সিসের ঘরের দিকে। আচমকা এই হৈ চৈতে ফ্রান্সিসের ঘুম ভেঙে গেল। ও চোখ কচলাতে-কলাতে উঠে বসলো।
বন্ধুরা চেঁচিয়ে বলতে লাগলো, হ্যারি বেঁচে আছে, হ্যারি বেঁচে আছে।
ফ্রান্সিস নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। তখনই হ্যারি ঘরে ঢুকল। সে এক লাফে বিছানা থেকে উঠে গিয়ে হ্যারিকে জড়িয়ে ধরল। ওর চোখ বেয়ে জলের ধারা নামলো। হ্যারির চোখও শুকনো রইল না। ম্যারি বেশ জোর করে ফ্রান্সিসের আলিঙ্গন থেকে মুক্ত হল। দু’জনেই হাসি-হাসি মুখে দু’জনের দিকে তাকিয়ে রইল। এক সময় ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করলো, তোমার কি হয়েছিল হ্যারি?
–সে এক কাণ্ড!হ্যারি বলতে লাগলো, জানো তো আমার মৃগীরোগের মত একটা অসুখ হয়েছে। তোমার মনে আছে বোধহয়, জাহাজে একবার অজ্ঞানের মত হয়ে গিয়েছিলাম।
–হ্যাঁ-হ্যাঁ মনে পড়েছে। ফ্রান্সিস বললো।
–এখানেই একদিন রাত্রে আমার ও-রকম হল। বোধহয়, যে আমাকে রাতের খাবার দিতে এসেছিল, সেই পাহারাদারটাই আমাকে ঐ অবস্থায় প্রথম দেখে। জানিনা ওরা বদ্যি–টদ্যি ডেকেছিল কিনা। বোধহয় নয়। নিজেরাই ধরে নিয়েছিল আমি মরে গেছি। তারপর আমাকে ওরা সক্কারটপ পাহাড়ের দুটো বরফের ফাটলের মধ্যে রেখে আসে। যখন আমার জ্ঞান ফিরলো দেখি, বরফের ফাটলের মধ্যে আমি পড়ে আছি। একে শরীর দুর্বল তার ওপর ভয়ানক ঠাণ্ডায় তখন হাত-পা অসাড় হয়ে গেছে। ভেবে দেখলাম, এইভাবে হাল ছেড়ে দিয়ে পড়ে থাকলে আমার মৃত্যু অবধারিত। কাজেই শরীরের অবশিষ্ট সমস্ত শক্তি একত্র করে উঠে বসলাম। তারপর দাঁড়ালাম। দেখলাম, পায়ের কোন সাড়া পাচ্ছি না। কোনরকমে ফাটলের বাইরে এলাম। কোথায় যাবো এবার? বাট্টাহালিডে যাওয়ার কোন প্রশ্ন ওঠে না। হঠাৎ মনে পড়ল, ওপাশে নেসার্কের টুপিক আছে। তুমি আর আমি ওখানে গিয়েছিলাম। হ্যারি থামল।
–তারপর?
–অসাড় পা দুটো হিঁচড়ে-হিঁচড়ে চললাম পাহাড় পেরিয়ে। তখনই গলা জলের জলাশয়টা আমি দেখেছিলাম। অপূর্ব সেই দৃশ্য। বরফের ওপর শুয়ে বিশ্রাম করি, আবার চলি। এভাবে পাহাড়ের ওপরে গিয়ে পৌঁছলাম। তখন ভোর হয়ে গেছে। আকাশ পরিষ্কারই ছিল। নেসার্কের টুপিকটা দেখতে পাচ্ছিলাম। কিন্তু আর চলার ক্ষমতা নেই তখন। বরফের ওপর দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে চললাম। একটু থামি, দম নিই, তারপর আবার শরীরটা বরফের ওপর দিয়ে হিঁচড়ে চলি। অনেক কষ্টে নেসার্কের টুপিকের সামনে এলাম। নেসার্কের মা তখন চামড়া শুকোতে দিচ্ছিল। আমাকে দেখে ঠিক চিনল না। আমার তখন কথা বলার শক্তিও নেই। নেসার্কের মা আমাকে ধরে ধরে টুপিকের মধ্যে নিয়ে গেল। কাঠকুটো দিয়ে আগুন জ্বাললো। তারপর আমার গায়ে, হাতে পায়ে, সেঁক দিতে লাগলো। কিছুক্ষণ সেঁক চললো। আমি আস্তে আস্তে হাত-পায়ের সাড়া পেলাম। একটু পরেই বেশ সুস্থ বোধ করলাম। আমি বারবার নেসার্কের মাকে ধন্যবাদ দিলাম। তারপর ওখানেই থেকে গেলাম। নেসার্কের মাকে অবশ্য বললাম, আমরা নেসার্কের সঙ্গে এখানে বেড়াতে এসেছিলাম। কিন্তু বুড়ি-মা আমার কোন কথাই বুঝল না। তার ছেলের মত আমাকে সেবা করে একেবারে সুস্থ করে তুললো।
