ফ্রান্সিস গীর্জাটার দরজায় এসে দাঁড়ালো। দরজাটা হাঁ করে খোলা। বোঝা গেল, তালাটা ভেঙে ফেলা হয়েছে। ও ভেতরে ঢুকল। অন্ধকারে কিছুই নজরে পড়ছে না। তবে জানলা দিয়ে যে অল্প চাঁদের আলো আসছিল, তাতে দেখলো, জানলার কাঁচ অনেকটা জায়গায় ভেঙে গেছে। কেমন ফাঁকা লাগছে বেদীটা। সেই আলোতেই ও দেখলো, যীশুর বড় মূর্তিটা মেঝেয় পড়ে আছে। হয়তো জলের ধাক্কায় পড়ে গেছে। কিন্তু কিভাবে কোথায় পড়ে আছে, দেখা যাচ্ছে না। ও মেঝের কাছে কড়াটার কাছে গেল। দেখলো, একটা মশাল আটকানো রয়েছে। চক্মকি ঠুকে মশাল জ্বালতে গেল। কিন্তু বরফজলে ভেজা মশাল সহজে জ্বলতে চায় না। বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টার পর মশাল জ্বললো। মশালের আলোয় দেখলো, যীশুর মূর্তি মেঝেয় উবু হয়ে পড়ে আছে। একটা হাত ভেঙে গেছে। ও মূর্তিটা তোলার জন্য হাত লাগালো। উঃ অসম্ভব ভারী। কয়েকজন মিলে ছাড়া তোলা যাবেনা। এটা একার কর্ম নয়।
হঠাৎ দরজায় একটা ধাক্কার শব্দ হলো। ফ্রান্সিস তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল। মশালের অল্প আলোয় দেখলো, কে যেন ওর দিকে এগিয়ে আসছে। ও ভাবল, কোন ভাইকিং বন্ধু বোধহয়। পরক্ষণেই ভুল ভাঙল, লোকটার হাতে কুঠার। ভাইকিংদের হাতে তো কুঠার থাকার কথা নয়। ও মূর্তিটা ডিঙিয়ে পিছিয়ে এলো।
ভালোভাবে আলো পড়তেই দেখলো রক্তমাখা কুঠার হাতে রাজা এভাণ্ডাসন। মুখটা হিংস্র, চোখের দৃষ্টিকুটিল। ও বুঝলো, এই অসভ্য বর্বর রাজা সুযোগ পেলেই তাকে হত্যা করবে। বিন্দুমাত্র ইতস্ততঃ করবে না। ফ্রান্সিসও সেইভাবে নিজেকে তৈরি করে নিল। এক ঝটকায় খাপ থেকে তরোয়াল খুলে ফেলল।
রাজা এভাল্ডাসন একবারদাঁত বের করে হাসল। বিড়বিড় করে ওর নিজের ভাষায় কি বললো। তারপর কুঠার ওপরের দিকে তুলে কোপ দেওয়ার ভঙ্গীতে ছুটে এলো ওর দিকে। ও তৈরিই ছিল, একপাক ঘুরেই তরোয়াল চালালো। রাজার টুপিটা কেটে গেল, রক্ত বেরলো। রাজা আবার কুঠার উচিয়ে আসতেই তরোয়াল চালালে ফ্রান্সিস। কুঠারের সঙ্গে তরোয়াল লেগে ঝঝন্ শব্দ উঠলো। কুঠারের সঙ্গে লড়াই করতে ফ্রান্সিস অভ্যস্ত নয়। কাজেই বারবার সরে সরে গিয়ে আত্মরক্ষা করতে লাগল। আর সুযোগ পেলেই তরোয়াল চালিয়ে রাজাকে ক্ষতবিক্ষত করতে লাগলো। ঐ মশালের আলোতে দু’জনের লড়াই চললো। দুজনেই পরিশ্রান্ত হলো। জোরে জোরে শ্বাস পড়তে লাগলো দু’জনের।
ফ্রান্সিস ক্লান্ত হলো বেশি। কারণ সন্ধ্যের পর থেকে ও একরকম বিশ্রামই পায়নি। অতটা পথ হেঁটেছে, পাহাড়ে উঠেছে, খাল কেটেছে, তারপর কাদা বরফের মধ্যে দিয়ে হেঁটে এখানে এসেছে। এই মোকাবিলার আগে একটু বিশ্রামের দরকার ছিল। কিন্তু এখন আর সে-সব ভেবেলাভ নেই। সম্মুখে মৃত্যুদূতের মতো দাঁড়িয়ে রাজা এভাল্ডাসন। হিংস্র বর্বর রাজা। ফ্রান্সিস নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ল। চললো লড়াই। ও বেশ বুঝতে পারল, তার দম ফুরিয়ে আসছে। জোরে জোরে হাঁপাতে লাগল ।
এক সময় রাজা এপাশ-ওপাশ কুঠার ঘোরাতে ঘোরাতে এগিয়ে এলো। একবার কুঠারের ফলাটা ওর প্রায় মাথা ছুঁয়ে গেল। ও সঙ্গে সঙ্গে তরোয়াল চালালো, রাজার মাথাটা লক্ষ্য করে। কিন্তু রাজা দ্রুত মাথা সরিয়ে নিল। কোপটা পড়ল রাজার কাঁধে। কাধ থেকে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে এলো। কিন্তু তরোয়ালটা বের করে নিয়ে আসার আগেই রাজা কুঠারটা তুলে মারতে উদ্যত হলো। ও মেঝেয় পড়েথাকা যীশুর মূর্তিতে পা লেগে বেদীর ওপর চিৎ হয়ে পড়ল। ঠিক মাথার ওপর রাজার উদ্যত কুঠার। ডান কাঁদে তরোয়ালের গভীর ক্ষতের জন্য রাজা কুঠারটা সবল হাতে ধরতে পারছিল না। তবু ঐ অবস্থাতেই কুঠারে ঘা দিলে ওর বুকেই সেটা লাগবে।
ফ্রান্সিসের তখন অসহায় অবস্থা। কিন্তু কুঠারের ঘাটা নেমে আসার আগেই হঠাৎ রাজারহাতটা কেমন যেন অবশ হয়ে এলো। হাত থেকে কুঠারটা পড়ে গেল মেঝেয়। রাজা হুমড়ি খেয়ে পড়ল তার ওপর। ও এক ধাক্কায় রাজাকে সরিয়ে দিল। বেদীর গা থেকে গড়িয়ে রাজা উপুড় হয়ে মেঝেয় পড়ে গেল ও দেখলো, রাজার পিঠে একটা কুঠার আমূল বিঁধে আছে। মুখ তুলে দেখলো, দরজার কাছে কে যেন দাঁড়িয়ে। লোকটা এগিয়ে আসতেই ও দেখলো, নেসার্ক। তাহলে নেসার্কই দূর থেকে কুঠার ছুঁড়ে মেরেছে-নির্ভূল নিশানা।
নেসার্ক কাছে এলে ফ্রান্সিস হাঁপাতে হাঁপাতে বললো, নেসার্ক তুমি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছ। রাজার কুঠারের শেষ ঘাটা আমি বোধহয় এড়াতে পারতাম না।
ও দেখলো, নেসার্কের চোখে জল। সে মৃদুস্বরে কাঁদো-কাঁদো গলায় বললো শেষ অবধি বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ আমি নিয়েছি।
এমন সময় আরো কয়েকজন ভাইকিং এসে গীর্জায় ঢুকল। তারা ফ্রান্সিসকে অক্ষত দেখে খুশিইহলো। ওরা বললো, ফ্রান্সিস, ইউনিপেড্দের প্রায় সবাই মারা গেছে, বাকীরা পালিয়েছে। এখন বাট্টাহালিড্ ওদের হাত থেকে মুক্ত।
ফ্রান্সিস হাসল, তারপর পাথরে বেদীটায় হেলান দিয়ে বসল। ভাইকিংরা ঘুরে ঘুরে গীর্জাটা দেখতে লাগল। একজন বেদীটার ওপরে উঠলো। দেখলো, আরও ওপরে আর একটা কাঠের বেদী। ও জিজ্ঞেস করলো, আচ্ছা ফ্রান্সিস, এই কাঠের বেদীটার ওপর কী ছিল?
–ঐ যে মেঝেয় যীশুর মূর্তিটা আছে, সেটা বসানো ছিল?
–কিন্তু এই ঢোকানো গর্তটার মধ্যে কী যেন একটা রয়েছে?
