প্রায় মাঝরাতে ওরা সক্কারটপ পাহাড়ের তলায় গিয়ে পৌঁছল। তারপর ঘুরে পাহাড়ের পেছনে গেল। সেখান থেকে পাহাড়ে ওঠা শুরু হল। এতদূর হেঁটে এসে তারপর পাহাড়ে ওঠা। সকলেই বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়লো।
বিস্কো ফ্রান্সিসকে বললো, সবাই খুব ক্লান্ত। একটু বিশ্রাম নিতে দাও।
ফ্রান্সিস বিস্কোর দিকে তাকাল। দৃঢ়স্বরে বললো, না। আজ রাতের মধ্যেই সব সারতে হবে। পাহাড়ে উঠতে শুরু কর। এইকথা বলে ফ্রান্সিস সবার আগে পাহাড়ে উঠতে লাগলো।
ফ্রান্সিসের সহ্য শক্তি দেখে সকলেই অবাক হল। তাকে দেখে মনেই হচ্ছিল না, ও এতটা পথ হেঁটে এসেছে। ওর সর্বাঙ্গে যেন প্রতিজ্ঞার দৃঢ়তা। বাকী সকলের আর বসা হল না। ওরা ফ্রান্সিসের পেছনে পেছনে পাহাড়ে উঠতে লাগলো। কেউ–কেউ চাঁদের মৃদুআলোয় বরফের পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে লাগলো। পাহাড়ের প্রায় চুড়োর কাছাকাছি ওরা পৌঁছল, তখন বিস্ময়ে সবাই হতবাক হয়ে গেল। সম্মুখে গলা জলের বিরাট সরোবর। তাতে চাঁদের আলো পড়ে এক বিচিত্র রূপময় জগৎ রচনা করেছে। উত্তুরে হাওয়ার মাঝে মাঝে মৃদু ঢেউ।
ফ্রান্সিস সকলের দিকে ফিরে তাকাল। তারপর বললো, ভাইসব বরফ কেটে এই গলা জলের স্রোত আমরা বাট্টাহালিডের দিকে নামিয়ে দেবো। ভাসিয়ে দেবো। ভাসিয়ে দেব, তছনছ করে দেব সবকিছু। একটু থেমে বললো, এবার সবাই কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে নাও কারণ এর পরে আর বিশ্রাম করার অবকাশ পাবে না। এই জলধারা নামতে শুরু করলেই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের পাহাড়ের পেছন দিকে নেমে যেতে হবে, নইলে সেই জলধারায় আমরাও ভেসে যাবো।
সবাই বরফের ওপর বসল। তখনও অনেকে হাঁপাচ্ছিল। ওখান থেকে কুয়াশার জন্যে বাট্টাহাড়িদের ঘর বাড়ি, তাঁবু গীর্জা কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু ইউনিপেড্দের ড্রাম বাজনা, হৈ-হল্লা শোনা যাচ্ছিল। বসে রইল অনেকে। কেউ কেউ বরফের ওপর ও শুয়ে পড়লো। সকলেই অবাক হয়ে চাঁদ, পাহাড়, সরোবর দেখছিল।
কিছুক্ষণ পরে ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। কুঠার হাতে নিয়ে বরফের ওপর কুঠার চালাল, শব্দ উঠল ঠক্। বেশ শক্ত বরফ। ফ্রান্সিসের দেখাদেখি আর সবাই উঠে দাঁড়াল। সবাই মিলে বরফের ওপর কুঠার চালাতে লাগলো। শুধু হাওয়ার শশশব্দ, মানুষের শ্বাসের শব্দ আর বরফে কুঠারের আঘাতের শব্দ।
ঠক্ঠক্–বরফ ভাঙার কাজ চলছে। রাত শেষ হয়ে এল প্রায়। চাঁদ দিগন্তের দিকে অনেকটা ঢলে পড়েছে। খাল কাটা শেষ হল। আবার একটু বিশ্রাম করে নিল সবাই। এবার সরোবরের দিক থেকে কয়েকটা বরফের চাই ভেঙে ফেলার পরই সরোবরের জল খাল দিয়ে নীচের দিকে ছুটল। ফ্রান্সিস কুঠার শূন্যে ঘুরিয়ে চিৎকার করে বললো, আর এক মুহূর্ত দেরি নয়। সবাই পাহাড়ের পেছন দিকে আসতে শুরু কর।
সবাই ছুটল পাহাড়ের পেছনদিকে। বরফের চাঁইয়ে সান্ধনে পা রেখে-রেখে সবাই নামতে লাগলো।
ওদিকে মুক্ত জলস্রোত ছুটলো নীচের দিকে। গলা জল বরফের চাঁইয়ের ফাটলগুলোতে ঢুকতে লাগলো। বরফের চাঁইগুলো আগা হয়ে যেতে লাগলো।
প্রচণ্ড শব্দে ঠাইগুলো ফেটে যেতে লাগলো। বড়-বড় টুকরো চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। ফ্রান্সিসদের কাটা খাল বড় হতে লাগল। মুহুর্মুহু বরফের চাই ফাটতে লাগলো। জলপ্রপাতের মত জলধারা প্রচণ্ড বেগে ছুটল বাট্টাহালিডের দিকে। জলধারার প্রথম ধাক্কাতেই টুপিকগুলো খড়কুটোর মত ভেসে গেল। ফ্রান্সিসরা নামতে নামতে বুঝতে পারছিল, মুহুর্মুহু বরফের চাই ফাটার ধাক্কায় পাহাড়টা কেঁপে–কেঁপে উঠছে। বাট্টাহালিডের দিক থেকে ভেসে এল চিৎকার, কান্নাকাটির শব্দ। বিরাট বিরাট বরফের চাই পাহাড়ের নীচে ভেঙে পড়তে লাগলো। গীর্জা, রাজবাড়ি আর অন্য সব পাথরের বাড়ি-ঘর ভেঙে পড়ল। গীর্জার চূড়োর কাঠের কুশটা ভেঙে পড়ল। শুধু রাজবাড়িটার বিশেষ কোন ক্ষতি হলো না। তবে জলের প্রচণ্ড ধাক্কা থেকে রেহাই পেল না কিছুই।
বেশ কিছুক্ষণ ধরে চললো বরফ ফাটার শব্দ এবং জলস্রোত। ফ্রান্সিসরা ততক্ষণ অপেক্ষা করল পাহাড়ের ওপাশে। তারপর সবাই আসতে লাগল বাট্টাহালিডের দিকে। প্রান্তরের বরফ আর শক্ত নেই। যেখান দিয়ে জলধারা বয়ে গেছে সেখানে বরফ আর কাদায় জায়গাটা দুর্গম করে তুলেছে। তারই মধ্যে দিয়ে ওরা হেঁটে চললো।
ওরা যখন বাট্টাহালিডে ঢুকল দেখলো, এখানে-ওখানে ইউনিপেড্ সৈন্যরা মরে পড়ে আছে। একটা টুপিকও দাঁড়িয়ে নেই, সব ভেসে গেছে। শুধু রাজবাড়ি আর চূড়াভাঙা গীর্জাটা দাঁড়িয়ে আছে। রাজবাড়িটার অনেক জায়গায় পাথরের দেওয়ালের পাথর খসে পড়েছে। ফ্রান্সিস ভেবেছিল, এই জলধারায়, ইউনিপেড্ সৈন্যরা ভেসে গেছে। কিন্তু রাজবাড়ির কাছাকাছি আসতেই, বেশ কিছু সৈন্যকে রাজবাড়ি থেকে আসতে দেখলো।
ফ্রান্সিস বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বললো এখনও কিছু ইউনিপেড্ আছে। তোমরা তাদের মোকাবিলা করো। আমি গীর্জাটায় যাচ্ছি।
ফ্রান্সিস একা গীর্জার দিকে চললো। এর মধ্যেই ভাইকিংদের সঙ্গে অবশিষ্ট ইউনিপেড্দের রাস্তায়, রাজবাড়িতে লড়াই শুরু হয়ে গেল। ইউনিপেডরা কুঠার চালাতে ওস্তাদ। ভাইকিংরা কুঠার ফেলে তরোয়াল বের করে ওদের সঙ্গে লড়তে লাগলো। চাঁদের মৃদু আলোয় এই লড়াই চললো! উভয়পক্ষের চিৎকার ছুটোছুটিতে বাট্টাহালিড্ জেগে উঠলো।
