ফ্রান্সিস কিছুক্ষণ সেই বরফের প্রান্তরে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর তাঁবুতে ঢুকে বিছানায় শুয়ে পড়লো। কিন্তু ঘুমুতে পারলো না। নানা চিন্তা ভিড় করে এলো। মাঝে-মাঝে তন্দ্রা এলো। পরক্ষণেই তন্দ্রা ভেঙে উঠে বসতে লাগলো। নেসার্ক কখন ফেরে এই চিন্তা। হ্যারি কেমন আছে, কে জানে?
রাত শেষ হয়ে এসেছে তখন। নেসার্কের ডাকে ওর তন্দ্রা ভেঙে গেল। নেসার্ক বিছানায় বসে হাঁপাতে লাগলো। অনেকটা পথ হেঁটে এসেছে। ফ্রান্সিসের মন চিন্তাকুল, উৎণ্ঠিতও। তবু কোন প্রশ্ন করলো না। একটু পরে নেসার্ক বললো, আপনাদের ঐ ঘরে হ্যারি নেই।
ফ্রান্সিস চমকে উঠে বসলো। তবে ও কোথায়?
–তার হদিশ করতে পারিনি, তবে খবর জোগাড় করেছি যে, কিছু এস্কিমোকে রাজা এভাল্ডাসন রাজবাড়িতে বন্দী করে রেখেছে। কাল রাত্রে সেখানে খোঁজ করবো।
পরের দিনটা শুয়ে বসে কাটালো। আবার রাত হলে নেসার্ক কুঠার হাতে বাট্টাহালিডের দিকে চললো।
সারারাত ফ্রান্সিস দুশ্চিন্তায় ঘুমোতে পারলো না। কিছুক্ষণ শুয়ে থাকে। আবার উঠে তাবুর বাইরে এসে দাঁড়ায়। দেখে নেসার্ক আসছে কিনা। শেষ রাতের দিকে নেসার্ক ফিরে এলো। বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করলো। তারপর ডাকলো ফ্রান্সিস?
–বলো। হ্যারিকে পেলে?
–একটা দুঃসংবাদ আপনাকে দিতে হচ্ছে।
–শিগগির বলল।
–হ্যারি-মারা গেছে।
ফ্রান্সিস দ্রুত বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালো। ওর বুক থেকে গভীর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। ও দ্রুত এগিয়ে এসে নেসার্কের দু’কাঁধে হাত রাখলো, সব বলো নেসার্ক।
রাজবাড়িতে যারা বন্দী আছে, তাদের মধ্যে হারিকে দেখলাম না। তাহলে হ্যারিকে কোথায় রাখা হয়েছে? রাজবাড়ির অন্য ঘরগুলো, টুপিকগুলো, সব জায়গায় খুঁজে-খুঁজে দেখলাম। হতাশ হলাম, কোথাও হ্যারি নেই। নেসার্ক একটু থামলো। তারপর বলতে লাগল, ওদের নাচ-গানের এক আসরে গিয়ে বসলাম। সেখানেই ইউনিপেড্দের এক সর্দারের সঙ্গে ভাব জমালাম।
–হ্যাঁ, ঐ লোকটাকে আমি চিনেছি। আমাদের দেখাশোনার ভার ছিল ঐ লোকটার ওপরে। ওর স্লেজগাড়িটা নিয়েই আমি পালিয়েছিলাম।
–তারপর?
–কথায় কথায়ও বললো, একদিন রাত্তিরে ওরা নাকি দেখে, হারি ঘরে মরে পরে আছে।
–তাহলে ওরা হ্যারিকে মারেনি?
-ও তো তাই বললো। ওরা আর বৈদ্যি-টদ্যি ডাকেনি, একটা বিদেশীর জন্যে কে আর ঝামেলা অতো পোহায়? ওরা মৃতদেহটা সক্কারটপ পাহাড়ের এক গুহায় ফেলে দিয়েছিল।
ফ্রান্সিস মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে রইলো। ও নিজেকে সংযত করার অনেক চেষ্টা করলো কিন্তু পারলোনা। একসময় দু’হাতে মুখ ঢেকেও কেঁদে উঠল। নেসার্ক ওর কাঁধে হাত রাখলো সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করলো। কিন্তু ফ্রান্সিসের কান্না বন্ধ হল না। ওর বারবার হ্যারির কথা মনে হতে লাগলো। হ্যারির হাস্যোজ্জ্বল মুখ, ওর কথা বলার ভঙ্গী ও প্রতিজ্ঞাদৃঢ় মুখ, সবই মনে পড়তে লাগলো। ফ্রান্সিস কাঁদতে লাগলো।
সে যখন একটু শান্ত হল, তখন ভোর হয়ে গেছে।
একটু বেলায় ফ্রান্সিসের বন্ধুরা এসে পৌঁছল। বিস্কো ছুটে এল ফ্রান্সিসের কাছে। দেখলো, সে শুয়ে আছে। ওরা এল, অথচ সে একবারও তাবুর ভেতর থেকে বেরল না, এটা বিস্কোর কাছে একটু অদ্ভুত লাগলোও বুঝলো, নিশ্চয়ই সাংঘাতিক কিছু ঘটেছে। ও আস্তে আস্তে ফ্রান্সিসের গায়ে ধাক্কা দিল। বললো, তোমার কী হয়েছে বলো তো?
ফ্রান্সিস এতক্ষণ চোখ চাপা দিয়ে শুয়ে ছিল। এবার চোখের ওপর থেকে হাতটা সরালো। বিস্কো দেখলো, ফ্রান্সিসের চোখে জল। বলে উঠলো কী হয়েছে ফ্রান্সিস?
ফ্রান্সিস কোন কথা বলতে পারলো না। বিস্কো বুঝলো, হ্যারি নিশ্চয়ই কোন বিপদে পড়েছে। ও জিজ্ঞেস করলো, হ্যারি কেমন আছে?
ফ্রান্সিস ভগ্নস্বরে আস্তে আস্তে বললো, বিস্কো স্যারি মারা গেছে।
বিস্কো চমকে উঠে বললো, বলো কি?
তখন ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে নেসার্ক যে খবর এনেছে, সব বললো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ফ্রান্সিসের বন্ধুরা খবরটা শুনলো। এতক্ষণ ওরা বেশ খুশি মনে তাবুতে কাটাচ্ছিল। নতুন দেশ, ভালোই লাগছিল ওদের। হ্যারির মৃত্যু সংবাদ মুহূর্তে ওদের সবাইকে স্তব্ধ করে দিলো। সবাই নিঃশব্দে ফ্রান্সিসের তাবুতে এসে ওকে ঘিরে দাঁড়াল।
ফ্রান্সিস উঠে বসল। তারপর ধীরস্বরে বলতে লাগলো, ভাইসব, আজকে আমাদের বড় শোকের দিন। আমার অভিন্নহৃদয় বন্ধু হারি মারা গেছে। কিন্তু আমি কোনদিন হার মানি নি, আজকেও মানবো না। হ্যারির মৃত্যুর প্রতিশোধ আমি নেবই। একটু থেমে ও বলতে লাগলো, ভাইসব, আমি পরিকল্পনা ছকে রেখেছি। আজ রাত্রেই আমরা বাট্টাহালিড্কে ডানদিকে রেখে অনেকটা ঘুরে সক্কারটপ পাহাড়ে যাবো। সবাই সারাদিন বিশ্রাম করে নাও। সন্ধ্যের পরেই অন্ধকার হলে আমরা আবার যাত্রা শুরু করব।
সবাই আস্তে-আস্তে নিজেদের তাবুতে ফিরে গেল। সন্ধ্যের পর ভাইকিংদের মধ্যে কর্মতৎপরতা শুরু হল। সবাই বরফের প্রান্তরে এসে দাঁড়ালো।
বিস্কো ফ্রান্সিসকে ডাকতে এল। ফ্রান্সিস, আমরা তৈরি, চলো।
ফ্রান্সিস তাঁবুর বাইরে এল। বিস্কো বললো, আমরা কি শ্লেজগাড়িতে যাবো।
–না। ফ্রান্সিস বললো, গাড়ির ককুর নিশ্চয়ই চুপ করে থাকবে না, ডাকবে। তাহলে আমরা ধরা পড়ে যাবো। আমাদের হেঁটে যেতে হবে। সবাইকে কুঠার নিতে বলল।
পরপর সবাই দাঁড়াল। একটু রাত হতেই যাত্রা শুরু হলো। আকাশে ভাঙা চাঁদ উঠল একটু পরেই। নরম জ্যোৎস্না পড়ল বরফের প্রান্তরে। শুধু জুতোর তলায় বরফ ভাঙার শব্দ আর উত্তরে হাওয়ার শশন্ শব্দ। চারদিকে আর কোন শব্দ নেই।
