ফ্রান্সিস সংক্ষেপে সমস্ত ঘটনা বলে গেল। তারপর সবাইকে সম্বোধন করে বললো, ভাইসব, অনেক বিশ্রাম করেছে। আর এক মুহূর্তও নষ্ট করা চলবে না। সাঙখুর সঙ্গে কয়েকজন চলে যাও। অন্তত চারটে শ্ৰেজগাড়ি আর কুকুর জোগাড় করে আনো। আমরা এক্ষুণি কোর্টল্ড রওনা হবো।
বিস্কো বললো, ফ্রান্সিস, আমাদের আধঘণ্টা সময় দাও। আমরা খেয়ে দেয়ে তৈরি হয়ে নিচ্ছি। তোমারও নিশ্চয় খাওয়া হয়নি?
–বেশ আমিও খেয়ে দেয়ে নিচ্ছি। কিন্তু যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সারতে হবে।
সাঙখু শ্লেজগাড়ি যোগাড় করতে চলে গেল। একটু পরেই এস্কিমো-সর্দার কালুটুলা এলো। বোধহয় সাঙখুর কাছে খবর পেয়েছে। ও মুখ গম্ভীর করে ফ্রান্সিসের কাছে সব। শুনলো তারপর ভাঙা-ভাঙা নরওয়ের ভাষায় বললো, ইউনিপেড্রা বর্বর অসভ্য। ওদের বিশ্বাস করো না, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বন্ধুকে বাঁচাও।
কালুটুলা আর কোন কথা না বলে জাহাজ ছেড়ে চলে গেল।
এ সমুদ্রের ধারেই সব শ্লেজগাড়ি তৈরি হয়ে নিল। ফ্রান্সিস সমস্ত প্রয়োজনীয় জিনিস গাড়িতে তুলে নিতে বললো। গোটাদশেক কুঠারও নিতে বলে দিলো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই তৈরি হয়ে গাড়িতে এসে বসল। ফ্রান্সিসও তার গাড়িতে উঠলো এমন সময় কুঠার হাতে সাঙখুএসে হাজির। বললো, আমিও তোমাদের সঙ্গে যাবো।
অগত্যা ওকেও গাড়িতে তুলে নেওয়া হলো। রওনা হবার আগে ফ্রান্সিস গাড়ির ওপর দাঁড়িয়ে সবাইকে লক্ষ্য করে বললো, চাবুক চালাবার সময় সাবধান, যেন চাবুকটা লম্বা। লাগামে আটকে না যায়। কারো অসুবিধে হলে সাঙখুকে ডেকো, ও সব বুঝিয়ে দেবে।
ফ্রান্সিস গাড়িতে বসে ওর গাড়ি ছেড়ে দিলে। দেখা গেল, সবাই ওর পেছনে পেছনে গাড়ি চালাতে শুরু করলো।
যাত্রা শুরু হলো, গাড়ির মিছিল চললো। গাড়ি চলাকালে বরফ ভাঙার খসখস শব্দ, ওদের কথাবার্তা, ডাকাডাকির শব্দ নির্জন বরফের প্রান্তর মুখর হয়ে উঠলো। কিছু দূরে যেতেই দুটো গাড়ি আটকে গেল। সেই চাবুক লাগামে আটকে যাওয়ার ব্যাপার। সাঙখুউঠে এসে চাবুক খুলে আবার গাড়ি চালু করল। আবার সব গাড়ির একসঙ্গে চলা শুরু হলো।
ফ্রান্সিস যতটা তাড়াতাড়ি কোর্টল্ডে পৌঁছবে ভেবেছিল, তা আর হলো না। প্রায় পাঁচদিন লেগে গেল। এখানে পৌঁছে তারা আগের তাঁবুটাতে আস্তানা নিল। পথে তুষার ঝড়ের পাল্লায় পড়তে হলো না বলে ওরা খুশি হলো।
সন্ধ্যেবেলা ফ্রান্সিস সবাইকে নিজের তাবুতে ডাকলো। সবাই এলে সে বললো, ভাইসব, আমাদের আর দেরি করা চলবে না। আমি নেসার্ককে নিয়ে কাল সকালেই বাট্টাহালিডে রওনা হবো। তোমরা দুপুর নাগাদ রওনা দেবে। সাঙখু তোমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে। তোমরা কুকুরটানা গাড়িতে যাবে, কাজেই তোমাদের ওখানে পৌঁছতে দেরি হবে। তোমরা পৌঁছবার আগেই আমরা হ্যারিকে মুক্ত করবো। তার পরের কাজ ওখানে তোমরা পৌঁছবার পর ঠিক করবো।
সভা ভেঙে গেল। কথা বলতে বলতে ওর বন্ধুরা নিজেদের তাবুতে চলে গেল। রাত্রে শুয়ে শুয়ে সে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ভাবতে লাগলো।
ভোর হতেই নেসার্কওর কাছে এলো। রাজা সোক্কাসনের বল্গা হরিণ টানা স্লেজগাড়িটা ওর তাঁবুর বাইরে রাখা ছিল। খুব তাড়াতাড়ি সব গোছ-গাছ করে নিয়ে ও আর নেসার্ক গাড়িতে উঠে বসল। বন্ধুরা কয়েকজন এসে বিদায় জানালো। ও গাড়ি ছেড়ে দিতে বললো। নেসার্ক গাড়ি চালাতে লাগলো। ও গাড়ি চালাতে ওস্তাদ। নিপুণ হাতে বেশ দ্রুতগতিতে ও গাড়ি চালাতে লাগলো।
গাড়ি চললো বরফের প্রান্তরের ওপর দিয়ে। আকাশ অনেকটা পরিষ্কার। বেশ দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। দুপুরের একটু আগেওরা দুটো মেরুল্লুক দেখলো। কাছাকাছি আসতে দেখলো, একটা মা-ভালুকআর বাচ্চা। নেসার্ক গাড়ি চালাতে চালাতে বললো, বাচ্চাটা ধরবো নাকি?
–না। ফ্রান্সিস দৃঢ়স্বরে বললো, এখন প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের কাছে মূল্যবান।
নেসার্ক আর কোন কথা না বলে গাড়ি চালাতে লাগলো। ভালুক দুটোর কিছু দূরে গাড়িটা চললো। নেসার্ক বেশি কাছে গেল না। এক মা ভালুক তার ওপর সঙ্গে বাচ্চা আছে। হয়তো আক্রমণ করে বসতে পারে।
কিছুদূর এগিয়ে ওরা তাঁবু খাটালো। রান্না-খাওয়া সেরে আবার গাড়ি ছোটালো। পথে ওরা মেরু জ্যোতি দেখলো, কি অপরূপ দৃশ্য। ফ্রান্সিস আগেও দেখেছে, তাই খুব অবাক হলো না। তাছাড়া ওর মনে তখন নানা চিন্তা, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার মত মনের অবস্থা নয়।
দিন চারেকের মধ্যে ওরা বাট্টাহালিডের কাছাকাছি পৌঁছে গেল। তখন সকাল, আকাশে মেঘকুয়াশা নেই। অনুজ্জ্বল রোদে ওরা দূর থেকে বাট্টাহালিডের ঘর-বাড়ি, টুপিক দেখতে পেল। ফ্রান্সিস তখন গাড়ি চালাচ্ছিল, ও গাড়ি থামালো। আর এগুনো ঠিক হবে না। ইউনিপেডদের নজরে পড়ে যেতে পারে ওরা। গাড়ি থামিয়ে তাবু খাটালো। একটু বিশ্রাম করেদুপুরের খাওয়া-দাওয়া সারল।
তারপর ফ্রান্সিস নেসার্ককে বললো, নেসার্ক, তুমিতো আমাদের থাকবার ঘরটা দেখেছ। আমার বন্ধু হ্যারি এ ঘরেই আছে। খুব সাবধানে তাকে মুক্ত করতে হবে।
–এখন নয়, আমি রাত্রে যাবো। নেসার্ক বললো।
–বেশ-ফ্রান্সিস বললো।
সন্ধে গেল, রাত হলো। রাত বাড়তে নেসার্ক একটা কুঠার হাতে নিল। তারপর তাঁবু থেকে বেরলো। ওখানে শ্লেজগাড়ি নিয়ে যাওয়া চলবে না, হেঁটে যেতে হবে। ফ্রান্সিস নেসার্কের হাত ধরে ঝাঁকুনি দিল, নেসার্ক মৃদু হাসল। তারপর বরফের প্রান্তরের ওপর দিয়ে বাট্টাহালিডের দিকে হাঁটতে লাগলো। আকাশে ভাঙাচাঁদ, মৃদু জ্যোত্মা পড়েছে বরফের ওপর। নেসার্ক হেঁটে চললো।
