–তোমাদের ভঁবুতেই আমি প্রথমে আশ্রয় নিয়েছিলাম।
–বাবা-মা ভালো আছে তো?
এ্যাঁ-হ্যাঁ-হ্যাঁ। ফ্রান্সিস আমতা-আমতা করে বললো।
নেসার্কের মনে একটু সন্দেহ দেখা দিল। বললো, সত্যি করে বলুন।
ফ্রান্সিস একটু ভাবল, এখন সামনে অনেক কাজ। নেসার্ক যদি বাবার মৃত্যুসংবাদে ভেঙে পড়ে, তাহলে সব পরিকল্পনাই ভেস্তে যাবে।
হ্যারি এখনও বন্দী, যা করবার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব করতে হবে। তবুবাবার মৃত্যু সংবাদ ছেলের কাছে গোপন রাখা উচিত হবে না। সে নেসার্কের কাঁধে হাত রাখলো। তারপর বলতে লাগলো, নেসার্ক আমাদের সামনে এখন অনেক কাজ। আমার বন্ধুকে বাঁচাতে হবে। বাট্টাহালিড্ ইউনিপেড্দের হাত থেকে উদ্ধার করতে হবে। এখন তোমার সাহায্য না পেলে আমি কিছুই করতে পারবো না।
–আপনি সত্যি কথাটাই বলুন। যত দুঃখের হোক, আমি সহ্য করবো।
–তোমার বাবাকে ইউনিপো মেরে ফেলেছে।
নেসার্ক শুধু একবার তার মুখের দিকে তাকালো। তারপর মাথা নিচু করে বসে রইলো। একটু পরেই ওর শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগলো। ফ্রান্সিস বুঝলো, ও নিঃশব্দে কাঁদছে। সে ওর দুধে হাত রেখে ডাকল, নেসার্ক, ভাই কেঁদো না, বরং প্রতিশোধ নেবার কথা ভাবো।
নেসার্ক ক্ষাণিকক্ষণ চুপ করে থেকে চোখ মুছলো। তারপর সহজ গলায় বললো, আমি এর প্রতিশোধ নেবো।
ফ্রান্সিস উৎসাহের সঙ্গে বললো, আমিও তাই বলি। ভেঙে পড়লে চলবে না। মনকে শক্ত করে কর্তব্যগুলো করে যেতে হবে। এখন এছাড়া উপায় নেই।
–আপনি কি ভেবেছেন বলুন। নেসার্ক সহজ গলায় বললো।
–আমার মূল পরিকল্পনা কার্যকর করতে গেলে প্রথমেই প্রয়োজন হ্যারিকে, মানে আমার বন্ধুকে মুক্ত করে আনা। এটা আমরা পারবো না। কারণ আমাদের ওরা সহজেই চিনে ফেলবে।
–আমি চেষ্টা করবো। নেসার্ক বললো, আপনি জানেন না, আমি অনেকদিন ইউনিপেডদের হাতে বন্দী ছিলাম। ওদের ভাষা, জীবনযাত্রার পদ্ধতি সবই আমি জানি।
–তাহলে একমাত্র তুমিই পারবে।
–বেশ, এখন আপনি কী করবেন?
–কাল সকালেই আমি রাজা সোক্কাসনের কাছে একটা বন্ধা হরিণ-টানা স্লেজগাড়ি চাইব। গাড়ি নিয়ে আমি আঙ্গামাগাসালিকে যাবো। আমার বন্ধুদের নিয়ে এখানে আসব। তার পরের পরিকল্পনাটা এখানে এসে তৈরি করবো। তুমি ততোদিন কোথাও যাবে না, এখানেই থাকবে। ইউনিপেড্দের রাজা এভাল্ডাসন যে কোন মুহূর্তে আমার বন্ধুকে মেরে ফেলতে পারে।
ঠিক আছে, আপনি আপনার বন্ধুদের নিয়ে আসুন। আমি এখানেই আপনার জন্য অপেক্ষা করবো।
ফ্রান্সিস ওর হাত জড়িয়ে ধরে ঝাঁকুনি দিল। তারপর তাঁবুর বাইরে চলে এলো। নিজের তাবুতে ফেরার সময় দেখলো, দিগন্তবিস্তৃত বরফের প্রান্তরে মৃদু জ্যোৎস্না পড়েছে। ও হিসেব করে দেখলো, এখন শুক্লপক্ষ চলছে। তার মানে আরও বেশ কদিন রাত্রে চাঁদের আলো পাওয়া যাবে। এই সুযোগ হাতছাড়া করা চলবে না।
পরদিন সকালেই নেসার্ককে সঙ্গে নিয়ে ফ্রান্সিস রাজার সঙ্গে দেখা করলো। সে মোটামুটি তার পরিকল্পনা বললো। রাজা যেন কিছুটা আস্বস্ত হলেন। বললেন, তুমি পারবে ইউনিপেডদের তাড়াতে?
–চেষ্টার ত্রুটি করবো না। এখন আমার একটা দ্রুতগামী গাড়ি চাই।
–তুমি আমার গাড়িটাই নাও। আমি তো আর এখন কোথাও বেরোচ্ছি না। সেইমত নির্দেশ দিলেন।
বাইরে এসে ফ্রান্সিস নেসার্ককে বললো, তুমি গাড়িটা নিয়ে আমার তাবুর কাছে এসো। প্রয়োজনীয় সব জিনিস গাড়িটাতে দিও। আমিও আমার প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো নিয়ে তৈরি থাকবো।
তাড়াতাড়ি খেয়ে দেয়ে ফ্রান্সিস তৈরি হয়ে নিল। একটু পরেই নেসার্ক রাজার বল্গা হরিণে টানা গাড়িটা নিয়ে হাজির হলো। সব দেখে-শুনে সে দক্ষিণমুখো গাড়ি চালাতে লাগলো।
বল্গা-হরিণে-টানা গাড়ি। তুষারের প্রান্তর দিয়ে অত্যন্ত বেগে ছুটে চললো। ও স্থির করল, সন্ধ্যের আগে আর গাড়ি থামাবে না। কিন্তু বিকেলের দিকে কুয়াশার গাঢ় আস্তরণের সামনে সবকিছু ঢেকে দিল। একটু পরেই প্রায় মাথার কাছে নেমে আসা মেঘ কুয়াশা, তুষারবৃষ্টির মধ্যে দিয়ে ওর গাড়ি ধীরে ধীরে চললো। ওর সমস্ত পোশাক তুষারে ঢেকে গেল।
ওর ভাগ্য ভালো বলতে হবে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে প্রচণ্ড হাওয়ার ঝাঁপটা শুরু হলো। মেঘ-কুয়াশা উড়ে গেল, হাওয়ার বেগের প্রচণ্ডতাও কমলা। সন্ধ্যের মুখে আকাশে মেরু নক্ষত্র দেখা দিল। একটু পরে অস্পষ্ট চাঁদের আলোও দেখা গেল। ফ্রান্সিস বুঝল, হরিণগুলোর বিশ্রাম দরকার। নিজেও ক্লান্ত, এবার বিশ্রাম চাই। দুটো চাইয়ের কাছে এসে ও গাড়ি থামালো। দুটো চাইয়ের মাঝামাঝি জায়গায় তাবু খাটালো। চক্মকিতুকে আগুন জ্বেলে, শুকনো মাংস রাধলো। খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়ল। নানা চিন্তা মাথায় ভীড় করে এলেও, ওরই মধ্যে একসময় ঘুমিয়ে পড়লো।
পরদিন আবার পথ চললো। গাড়ির গতি যথেষ্ট বাড়িয়ে দিল। একেবারে সন্ধ্যে পর্যন্ত একনাগাড়ে গাড়ি চালালো। দুপুরে বিশ্রামও নিল না, কিছু খেলোও না। সন্ধ্যেয় গাড়ি থামলো, রাত্রির মতো বিশ্রাম।
তিনদিনের দিন ও আঙ্গামাগাসালিক বন্দরে পৌঁছল। দূর থেকে সাঙুই ওকে প্রথম দেখলো, তখন দুপুর। সাঙখু ছুটতে ছুটতে কাছে এলো। গাড়ি থামিয়ে সাঙখুকে তুলে নিল। যেতে যেতে বললো, কেমন আছো সাঙখু?
সাঙখু হেসে মাথা ঝাঁকালো।
সমুদ্রের ধারে এসে থামল। দেখলো, ওদের জাহাজটা দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ি থেকে নেমে ও বন্ধুদের ডাকতে লাগলো। জাহাজের ডেকেই দাঁড়িয়ে ছিল বিস্কো। ফ্রান্সিসকে দেখে ওর মুখ খুশিতে ভরে উঠলো। ও ছুটোছুটি করে সবাইকে ডাকতে লাগলো। সবাই এসে ডেক-এ জড়ো হলো। কিন্তু ওরা বেশ অবাক হলো ফ্রান্সিসের সঙ্গে হ্যারিকে না দেখে। ওরা তাড়াতাড়ি জাহাজ থেকে দড়ির সিঁড়ি ফেলে দিল। ফ্রান্সিস আর সাঙখু সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে জাহাজে উঠে এলো। সব বন্ধুরা ফ্রান্সিসকে ঘিরে ধরল। হ্যারির কথা জিজ্ঞেস করতে লাগলো।
