পরেরদিনঅনেক বেলা পর্যন্ত গাড়ি চালালো। কিন্তু গাড়ির গতি কমে এলো। কুকুরগুলো অনেকক্ষণ ছুটে বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সে নিজেও যথেষ্ট ক্লান্তবোধ করছিল, তাই গাড়ি থামালো। কুকুরগুলোকে ছেড়ে দিলে, তারা বসেজিভ বার করে হাঁপাতে লাগল। সে এবার গাড়িটায় কী কী আছে পরীক্ষা করে দেখলো, সিন্ধুঘোটকের শুকনো মাংস, সীলমাছের টুকরো যত্ন করে রাখা। ঠ্যাং চর্বি-নাড়িভুঁড়ি এসব কুকুরের খাদ্যও আছে। শুকনো কাঠের টুকরো পেল কিছু, কিন্তু তবু নেই। সেই খোলা প্রান্তরে ও চক্মকি ঠুকে আগুন জ্বেলে মাংস রাঁধলো। নিজেও খেলো, কুকুরগুলোকেও খেতে দিল। তারপর আবার সব গুটিয়ে নিয়ে দক্ষিণমুখো গাড়ি চালালো। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কোর্টল্ডে পৌঁছতে হবে।
সন্ধ্যে হলো, তবু ফ্রান্সিস গাড়ি থামালো না। একটু রাত হতেই গাড়ি থামিয়ে আবার আগুন জ্বেলে রান্না করলো। নিজে খেলো, কুকুরগুলোকেও খেতে দিল। তারপর উন্মুক্ত বরফের প্রান্তরে বল্গা হরিণের চামড়া পেতে শুয়ে পড়লো। পায়ের কাছে আগুন জ্বালিয়ে রাখল। ওর ভাগ্য ভাল, তুষার বৃষ্টি হলো না, শান্তিতেই কাটল রাতটা।
পরদিন আবার যাত্রা। এই পথে অনেক চাই-ভাঙা বরফ ভেঙে গাড়ি চালাতে হলো। খুব সাবধানে গাড়ি চালাতে গিয়ে গাড়ির গতি গেল কমে। এবড়ো খেবড়ো সেই বরফের প্রান্তর পেরোতে দুপুর গড়িয়ে গেল। দুপুরে বিশ্রাম করে খাওয়া দাওয়া সেরে, সে আবার গাড়ি চালাতে লাগল।
সন্ধ্যের আবছা অন্ধকারে কোর্টল্ডের পাথরের বাড়িঘর নজরে পড়ল। নির্বিঘ্নে পথটা পার হতে পেরেছে বলে, সে মনে-মনে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানালো।
রাজা সোক্কাসনের বাসস্থান খুঁজে পেতে বেশি দেরি হলো না। একটা পাথরের বাড়িতে পুত্র ও রানীকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। বাড়িটার চারদিকে পাহারা দিচ্ছে একদল সৈন্য। ফ্রান্সিসকে দেখে ওরা চিনতে পেরে পথ ছেড়ে দিল।
একটা ঘরে বল্গা হরিণের চামড়ার বিছানায় রাজা সোক্কাসন বসেছিলেন। একটা মৃদু আলো জ্বলছিল ঘরে। ফ্রান্সিস রাজাকে মাথা নুইয়ে সম্মান জানালো। রাজা কেমন যেন শূন্যদৃষ্টিতে ওর দিকে তাকালেন। রাজার দুশ্চিন্তাগ্রস্ত চোখ-মুখ দেখে সে মনে ব্যথা পেল। আস্তে-আস্তে বাট্টাহালিডে কী ঘটেছে, কী করে ও পালালো এইসব কথাই বলে গেল। রাজা শুনে গেলেন। তারপর বিষাদগ্রস্ত স্বরে বললেন, ফ্রান্সিস, আমি রাজ্যোদ্বারের কোন আশাই দেখছি না। বাকী জীবনটা আমাকে এখানেই নির্বাসনে কাটাতে হবে।
ফ্রান্সিস বললো, উদ্যম হারাবেন না মহারাজ। আমি একটা পরিকল্পনা ছকে নিয়েছি। যদি সফল হই, তাহলে আপনি আবার রাজ্য ফিরে পাবেন।
রাজা কিছুক্ষণ ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, দেখুন চেষ্টা করে।
–আচ্ছা নেসার্ক কোথায়? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
–ও আঙ্গাগাসালিকে গেছে, খাবার-দাবার জিনিসপত্র আনতে।
–কবে ফিরবে।
–আজকেই ফেরার কথা।
–তাহলে আমি কিছুক্ষণ পরে আসবো।
ফ্রান্সিস ঘরের বাইরে এলো। ও নুয়ালিকের খোঁজে বেরলো। খুঁজতে-খুঁজতে ও স্থানীয় এস্কিমো-সর্দারের তাঁবুতে এলো। নুয়ালিক তাঁবুতেই ছিল, তাকে দেখে হাসল। ফ্রান্সিস বললো, নুয়ালিক, একটা থাকবার আস্তনা দাও।
নুয়ালিক সব কথা বুঝল না, শুধু হাসতে লাগল। ফ্রান্সিস তখন অঙ্গ-ভঙ্গী করে । বোঝালো, ও শুয়ে থাকবার জায়গা চায়। নুয়ালিক মাথা ঝাঁকিয়ে বোঝালো, তার একটা আস্তানাও করে দেবে। সেটা করে দিলও। বড় তাবুটার, কোণার দিক থেকে একটা ছোট ছেঁড়া তাবুর জায়গাগুলো দেখে ফ্রান্সিস হতাশ হলো। এই ছেঁড়া তাবুতে কি থাকা যাবে? নুয়ালিক ওর মনের ভাব বুঝতে পারল। একটু হেসে ও নিজের তাবু থেকে উঁচ আর চামড়া–পাকানো সুতো নিয়ে এলো। এক ঘণ্টার মধ্যে তাবুটা সেলাই করে একেবারে নতুনের মতো করে দিল। তাঁবুর ভেতরে একটা কাঠের পাটাতনমত পেতে দিল। তার ওপর সিন্ধুঘোটকের চামড়া পেতে দিল। ফ্রান্সিস চুরি করা শ্ৰেজগাড়িতে কিছু বিছানার সরঞ্জাম পেল। সে সব পেতে কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা সুন্দর বিছানামত হয়ে গেল। একটা সীলমাছের তেলের প্রদীপও জ্বেলে দিয়ে গেল।
ফ্রান্সিস কিছুক্ষণ এই নতুন আস্তানাটায় রইলো। বিছানায় শুয়ে-শুয়ে পরবর্তী যে কাজগুলো করতে হবে, সে সব ভাবল। সবার আগে নেসার্ককে চাই। একমাত্র সেই হ্যারির খোঁজ আনতে পারবে। এইসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে সে উঠে পড়লো। চললো, যে বাড়িতে রাজা আছেন সেইদিকে। বাড়িটার কাছাকাছি পৌঁছল যখন তখন রাত হয়েছে। বাইরে একজন এস্কিমো সৈন্য ভাবভঙ্গীতে জানালো, রাজা শুয়ে পড়েছেন। এখন দেখা হবে না। ফ্রান্সিস ওকে বারবার বলতে লাগলো, নেসার্ক ফিরেছে কিনা, সেই খবরটা আমার চাই।
সৈন্যটা কিছুই বুঝতে পারল না। তখন সে বারবার নেসার্কের নাম করতে লাগল। সৈন্যটা তখন আঙ্গুল দিয়ে একটা তাবু দেখালো। তাহলে নেসার্ক ঐ তবুটাতেই আছে।
ফ্রান্সিস তাবুটার কাছে গিয়ে নেসার্কের নাম ধরে ডাকতেই, সে বেরিয়ে এলো। ও তো ফ্রান্সিসকে দেখে অবাক, ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। দু’জনে তাবুটাতে ঢুকল। আরো দু’জন এস্কিমো সৈন্য ভেতরে শুয়ে আছে। নেসার্ক বাট্টাহালিডের খবর জিজ্ঞেস করলো। সে সব ঘটনা বলে গেল, হ্যারির বন্দীদশার কথাও বললো। এবার নেসার্ক জিজ্ঞেস করলো, আমার বাবা-মার সংবাদ কিছু জানেন?
