নেসার্কের মা মাথা নাড়ল, অর্থাৎ শ্লেজগাড়ি নেই। ফ্রান্সিস চিন্তায় পড়ল। শ্লেজাগাড়ি না পেলে কোট পর্যন্ত হেঁটে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। অগত্যা একটা শ্ৰেজগাড়ি বাট্টাহালিড্ড় থেকে চুরি করতে হবে। ফ্রান্সিস এবার অন্য বিছানাটার দিকে তাকাল। কিন্তু নেসার্কের বাবাকে দেখতে পেল না। জিজ্ঞেস করলো, নেসার্কের বাবা কোথায়?
বুড়ি কথাটা শুনে দু’হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠলো। বুঝলো, নেসার্কের বাবা মারা গেছে। ফ্রান্সিস বললো, কবে উনি মারা গেলেন?
বুড়ি বললো ইউনিপো ওকে মেরে ফেলেছে। বলে হাত দিয়ে কুঠার চালাবার ভঙ্গী করল, অর্থাৎকুঠার দিয়ে মেরেছে। বুড়ি নিজে বোধহয় কোনরকমে পালিয়ে বেঁচেছে।
ফ্রান্সিস নেসার্কের বাবার বিছানায় বসে, হাতের ভঙ্গী করে বললো, এখন ঘুমোব।
বুড়ি মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে আলোটা নিভিয়ে দিল। সে শুয়ে পড়লো। অনেক চিন্তা মাথায় ভীড় করে এলো। শরীর প্রচণ্ড ক্লান্তিতে ভেঙে পড়লো। আর চিন্তা না করে
ও ঘুমাবার চেষ্টায় পাশ ফিরে শুলো।
পরের সারাটা দিনও টুপিকেই রইল। একবারও বেরুলো না। ইউনিপেত্রা নিশ্চয়ই ওকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। দুপুরে নেসার্কের বুড়িমা ওকে খুব যত্ন করে খেতে দিল। এত সুস্বাদু রান্না
অনেকদিন খায়নি ও। পাছে বুড়িরকম পড়ে যায়, এইজন্যে সে একটু কম করেই খেলা।
টুপিকের ফাঁক দিয়ে ফ্রান্সিস সারাক্ষণ বাইরের দিকে নজর রাখলো। বিকেলের দিকে দেখলো দূরে একটা শ্ৰেজগাড়ি পাহানের পাশ দিয়ে বাঁক নিচ্ছে। ফ্রান্সিস তাড়াতাড়ি গুঁড়ি মেরে টুপিক থেকে বেরিয়ে এলো। তারপর বরফের কয়েকটা চাইয়ের আড়ালে পাহাড়টার নিচে এলো। একটা বিরাট বরফের মধ্যে আত্মগোপন করলো। একটু পরেই একটা শ্ৰেজগাড়ি টুপিকের সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে এস্কিমোদের ভাঙা-ভাঙা ভাষায় বলছে, ভেতরে কে আছিস বেরিয়ে আয়। বুড়ি বেরিয়ে এলো। লোকটা তেমনি চিৎকার করে জিজ্ঞেস করলো, এখানে ইউরোপিয়ান একজন এসেছিলো?
বুড়ি জোরে-জোরে মাথা নাড়তে লাগল।
লোকটা বিশ্বাস করলো না। টুপিকের ভেতরে ঢুকলো। একটু পরে বেরিয়ে এলো। গাড়িতে উঠতে-উঠতে বললো, কাউকে দেখলে খবর দিবি।
বুড়ি মাথা নেড়ে বললো, আচ্ছা।
বরফের ওপর ছড়ছড় শব্দ তুলে শ্লেজগাড়িটা চলে গেলো। কিছুক্ষণ পর্যন্ত কুকুরগুলোর ডাক শোনা গেল। তারপর গাড়িটা পাহাড়ের আড়ালে চলে গেলো। ফ্রান্সিস বরফের ফাটলের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো। বুঝলো, এখানে থাকা নিরাপদ নয়। ইউনিপো নিশ্চয়ই হন্যে হয়ে খুঁজছে। কোর্টন্ডের দিকে পালাতে হবে। কিন্তু তার জন্যে একটা শ্লেজগাড়ি চাই।
ও সন্ধ্যে থেকে বেশ কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিলো। ঘুম থেকে উঠে খেয়ে নিলো। তারপর বুড়ি আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লো। রাত একটু গম্ভীর হতেই ফ্রান্সিস তরোয়ালটা কোমরে ঝুলিয়ে, চামড়ার আর পশুর লোমে তৈরি চাদরটা গলায় জড়িয়ে নিলো। তারপর টুপিক থেকে বেরিয়ে এলো। বুড়িকে ডাকলো না।
বাইরে কালকের রাতের মতোই জ্যোত্মা পড়েছে। অপরূপ দেখাচ্ছে বরফের পাহাড়টা, যেন চাঁদের নরম আলো গায়ে মেখে শূন্যে ভাসছে ওটা।
পাহাড়ের পাশ দিয়ে ঘুরে ফ্রান্সিস বেশ কিছুক্ষণ পর বরফের ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গীর্জাটার কাছে এলো। অনেকক্ষণ থেকেই ইউনিপেড্দের ড্রাম বাজানো, হৈ হল্লা শুনতে পাচ্ছিল। একবার দেখলো, পাশে একটা বড় অগ্নিকুণ্ড জ্বলছে। অনেক ইউনিপেড্ আগুনটার চারপাশে গোল হয়ে ঘিরে বসেছে। ড্রামের বাদ্যি চলছে, গানও গাইছে অনেকে। আর আগুনে মাংস ঝলসানো চলছে।
ফ্রান্সিস চারদিকে তাকাতে লাগলো, যদি কোন শ্লেজগাড়ি পাওয়া যায়। দেখল, শ্লেজগাড়ি কয়েকটাই আছে। কিন্তু কুকুর আর বন্ধু হরিণগুলো খুঁটিতে বাঁধা। হরিণ বা কুকুরগুলো নিয়ে গিয়ে গাড়িতে জোড়া, বেশঝুঁকির ব্যাপার। ও যখন ভাবছে শেষ পর্যন্ত এই ঝুঁকি নিতেই হবে তখনই দেখলো, একটা শ্ৰেজগাড়ি রাস্তার পাশে এসে দাঁড়াল। দুটো লোক নামলো গাড়িটা থেকে। ম্লান চাঁদের আলোয় ও একটা লোককে চিনলো, সেই শক্তিশালী চেহারার লোকটা। সঙ্গীটিকে নিয়ে লোকটা আগুনের কুণ্ডের দিকে যেতে লাগলো। ফ্রান্সিস আনন্দে লাফিয়ে উঠলো, একেবারে তৈরি শ্লেজগাড়ি পাওয়া গেছে। লোকটা বোধহয় এই গাড়ি চড়ে তাকেই খুঁজে বেড়াচ্ছে।
ফ্রান্সিস পাথরের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। তারপর বরফের ওপর গুঁড়ি মেরে মেরে শ্লেজগাড়িটার কাছে এলো। ইউনিপেরা তখন ড্রাম পেটাচ্ছে, হৈ-হল্লা করছে। সে আস্তে আস্তে গাড়িটাতে উঠে বসল। ধীরগতিতে গাড়িটা পাথরের বাড়ির আড়ালে আড়ালে চালিয়ে নিয়ে কিছুটা দূরে এলো। এমন সময় ঐ অগ্নিকুণ্ডের দিক থেকে, কে যেন চিৎকার করে বললো। ও দেখলো, কয়েকজন ইউনিপেড কুঠার হাতে ছুটে আসছে। ও এবার কুকুরগুলোর গায়ে জোরে চাবুক হাঁকালো। কুকুরগুলো জোরে ছুটতে লাগল। গাড়ি ছুটল দ্রুতগতিতে। একটু পরেই গাড়িটা বরফের প্রান্তরে এসে পৌঁছল। ও পেছনে তাকিয়ে দেখলো, বিস্তৃত তুষার প্রান্তরে লোকজন বা গাড়ির কোন চিহ্ন নেই।
গাড়ি চললো, ফ্রান্সিস আর গাড়ি থামাল না। বাকী রাতটুকু সমান গতিতে চালাতে লাগলো। বলা যায় না, বল্গা হরিণ-টানা শ্ৰেজগাড়ি নিয়ে যদিইউনিপো ওরনাগাল পায়।
