হুঁ তাই করো। আর সময় নষ্ট করা উচিত হবে না।
পরের সারাটা দিন ফ্রান্সিস বা হ্যারি কেউই বেরলো না। সারাদিন এই পরিকল্পনা নিয়েই পরামর্শ করল। একটু রাত হতে ফ্রান্সিস তৈরি হলো। বেশী পোশাক পরলো, বিছানা থেকে হরিণের চামড়াটা তুলে নিয়ে গায়ে জড়ালো। তরোয়ালটাও নিল। দু’জন দু’জনকে জড়িয়ে ধরলো। তারপরও ঘরের বাইরে এলো। পাহারাদার দু’জন ওর সাজসজ্জা দেখে একটু অবাকই হলো। তবে এও বোধহয় ভাবলো যে ঠাণ্ডার রাত, তাই বেশি পোশাক পরেছে।
ফ্রান্সিস গীর্জার দিকে হাঁটতে লাগল। পাহারাদার দু’জন পেছনে চললো। ওরা তো আর জানে না, সে মনে-মনে কী ফন্দী এঁটেছে?
গীর্জায় পৌঁছে সে চাবি দিয়ে বিরাট তালাটা খুললো। ভেতরে ঢুকে চকমকি ঠুকে মোমবাতি জ্বালাল। এটা-ওটা দেখতে লাগল। দরজার বাইরে পাহারাদার দু’জন দাঁড়িয়ে রইল।
একটু রাত হলে, একজন পাহারাদার দরজায় ঠেস দিয়ে ঘুমুতে লাগল। অন্যজন দাঁড়িয়ে রইল। ফ্রান্সিস দেখলো, এই সুযোগ। ও আংটায় বসানো একটা মশাল নিয়ে দরজার কাছে এলো। যে লোকটা জেগেছিল, তাকে আকারে ইঙ্গিতে বোঝালো যে, মশালটা ও জ্বালাতে পারছেনা। ও যেন এসে জ্বেলে দিয়ে যায়। লোকটা গীর্জার ভেতর ঢুকলো। হাতের কুঠারটা মেঝে উপর রেখে, চকমকি পাথরে ইস্পাতের টুকরো টুকতে লাগল। ফ্রান্সিস অভিজ্ঞতা থেকে জানতে এখানকার ঠাণ্ডায় মশাল জ্বলতে সময় লাগে। লোকটা চকমকি ঠুকে চলল। আস্তে আস্তে গীর্জার বাইরে চলে এলোফ্রান্সিস। ঘুমন্ত লোকটাকে ঠেললো কয়েকবার। ঠেলতেই লোকটা উঠে দাঁছাল। চোখ কচলে দেখে সামনে ফ্রান্সিস। ফ্রান্সিস ইঙ্গিতে ওকে বোঝাল যে, গীর্জার ভেতরে তোমার বন্ধু তোমাকে ডাকছে। লোকটা ঘুমচোখে ব্যাপারটা তলিয়ে দেখল না। ও তাড়াতাড়ি গীর্জার মধ্যে ঢুকে পড়লো। ফ্রান্সিস এই সুযোগের প্রতীক্ষাতেই ছিল, ও সঙ্গে সঙ্গে হ্যাঁচকা টানে দরজাটা বন্ধ করল। তারপর চাবি বের করে তালা লাগিয়ে দিল। আরএক মুহূর্ত দেরী নয়, সে সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত নেমে এলো। তারপর বরফের ওপর দিয়ে ছুটে চললো সাক্কারটপ পাহাড়টার দিকে। উপায় নেই, ওই পাহাড়টা ডিঙোতে হবে। পাহাড়ের ধার দিয়ে যেতে গেলে, ওরা স্লেজগাড়ি চালিয়ে ওকে সহজেই ধরে ফেলবে। কিন্তু গাড়ি তো আর পাহাড়ে উঠতে পারবে না।
বরফের ওপর দিয়ে ছুটতে-ছুটতে পাহাড়ের নীচে পৌঁছে ফ্রান্সিস হাঁপাতে লাগল।
এতটা পথ একছুটে চলে এসেছে, এতক্ষণ মেঘ-কুয়াশায় অন্ধকার ছিল চারদিক। এবার মেঘ-কুশায়া কেটে গেল। আকাশে দেখা গেল পূর্ণিমার চাঁদ। বেশ কিছুদূর পর্যন্ত পরিষ্কার দেখা যেতে লাগল। ইউনিপো যখন এখনও শ্ৰেজগাড়ি নিয়ে তাড়া করেনি, তার মানে ঐ পাহারাদার দুটো গীর্জা থেকে বেরোতে পারেনি। গীর্জাটা লোকালয় থেকে একটু দূরেই। ওরা দরজা ধাক্কা দিলেও কারো কানে সে শব্দ পৌঁছবে না। তাছাড়া ইউনিপেড়া অনেকেই আগুন জ্বেলে মাংস ঝলসাচ্ছে আর আগুনের চারপাশে বসে ড্রাম পেটাচ্ছে আর গাইছে, হৈ-হল্লা করছে। কাজেই দরজায় ধাক্কা দেবার শব্দ কানেই যাবে না।
বরফের চাঁইয়ের ওপর সাবধানে পা ফেলে–ফেলে ফ্রান্সিস পাহাড়টায় উঠতে লাগল। দম নেবার জন্যে মাঝে-মাঝে থামছে, আবারউঠছে। এতউৎকণ্ঠা দুশ্চিন্তার মধ্যেও পাহাড়ের গায়ে চাঁদের মৃদুআলো পড়ে, যে অপরূপ সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছে, তা ওর দৃষ্টি এড়ালো না। সত্যিই, অপূর্ব দৃশ্য। সারা পাহাড়টা থেকে একটা নরম আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। নেসার্ক যে কেন এই সৌন্দর্যকে ঈশ্বরের আশীর্বাদ বলেছে, এবার তার কারণ খুঁজে পেল ও।
এমন সময় চুড়োয় পৌঁছল ফ্রান্সিস। চাঁদটা তখন কিছুটা পূর্বদিকে ঢলে পড়েছে। ঘুরে দাঁড়াতে চুড়োর ওপাশে ওর দৃষ্টি পড়ল। ও চমকে উঠলো একটা দৃশ্য দেখে। চুড়োর ওপাশেই পাহাড়ের বুকে একটা বিরাট জলাশয়, প্রকৃতির কি আশ্চর্য খেয়াল। সেইটলটলে জলের ওপর কোথাও কোথাও স্বচ্ছ কাঁচের মত বরফের পাতলা আস্তরণ। সেই জলাশয়ে চাঁদের আলো পড়ে এক অপার্থিব সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছে। সে কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখলো। তারপর জলাশয়ের ধার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পাহাড়ের পেছন দিকে এলো। উঁচু-নীচু বরফের চাইয়ের ওপর পা রেখে রেখে ও নীচে নেমে এলো। অস্পষ্ট দেখতে পেল নেসার্কের চামড়ার তাবু।
ও যখন তাঁবুর সামনে পৌঁছল, তখন একেবারে দম শেষ। একটু দাঁড়িয়ে থেকে দম নিল। তারপর তাঁবুর চামড়া একটু সরিয়ে ডাকল, নেসার্ক–নেসার্ক।
ও জানতো, নেসার্ক রাজার সঙ্গে কোটর্ল্ডে চলে গেছে। থাকলে এখানে তার মা . বাবা আছে। বারকয়েক ডাকার পর কার নড়া-চড়ার শব্দ পেল। ও এবার একটু গলা চড়িয়ে ডাকল নেসার্কের মা আছেন? নেসার্কের মা?
এস্কিমোদের ভাষায় কে বলে উঠলো, কে?
ফ্রান্সিস বুঝলো, এটা নেসার্কের মার গলা, ও খুশি হলো। অন্ধকারে এগিয়ে গিয়ে বললো, আমি ফ্রান্সিস, নেসার্কের বন্ধু।
এবার চক্মকি ঠোকার শব্দ শুনলো ও। প্রদীপ জ্বালাল, দেখল নেসার্কের মা বিছানা থেকে উঠে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ঐ আলোতে বুড়ি ফ্রান্সিসকে চিনে হাসল, মুখে বলিরেখাগুলো স্পষ্ট হলো। ফ্রান্সিস এস্কিমোদের ভাঙা-ভাঙা ভাষায় বললো, আমি পালিয়েছি, এখানে থাকব–শ্ৰেজগাড়ি চাই।
