ফ্রান্সিস খুশি হল। অন্তত একজনকে পাওয়া গেল যে নরওয়ের ভাষা বোঝে। তখন উত্তর দিল–ফ্রান্সিস।
ফ্রান্সিস এবার লোকটার দিকে তাকালো। দেখলো, একজন অল্প দাড়ি-গোঁফওয়ালা বৃদ্ধ। মুখ–চোখ বেশ শান্ত, যদিও পরনে সেই নোংরা চামড়ার পোশাক। বৃদ্ধ বললো, আমি ইউনিপেড্দের মন্ত্রী। একমাত্র আমিই নরওয়ের ভাষা একটু বুঝি, আর একটু বলতে পারি। রাজাকে তুমি কী জরুরী কথা বলতে চাও?
–আমরা জাতিতে ভাইকিং। ফ্রান্সিস বললো, আমরা এখানে এসেছি, এরিক দ্য রেডের গুপ্তধন খুঁজে বের করতে।
এরিক দ্য রেডের নামটা শুনে রাজা মাংস খাওয়া থামিয়ে ফ্রান্সিসের দিকে তাকালো। –তোমরা কি কোন খোঁজ পেয়েছো?
–না, তবে একটা মূল্যবান সূত্র পেয়েছি।
রাজামশাই এবার অস্বস্তি প্রকাশ করলো। মন্ত্রীকে ডেকে কি বললো। মন্ত্রীও ঐ ভাষায় কিছু বললো। রাজামশাই ঠ্যাং চিবুনো বন্ধ করে কি বলে উঠলো।
মন্ত্রী বললো, রাজা এভাল্ডাসন জানতে চাইছেন, তোমরা কী ধরনের সূত্র পেয়েছো?
ফ্রান্সিস ফিসফিস করে বললো, হ্যারি ওষুধে কাজ হয়েছে। বোধহয় কতটা কাজ হয়েছে, বোঝার জন্য ফ্রান্সিস বলে উঠলো, তার আগে আমাদের হাতের বাঁধন খুলে দিতে হবে।
মন্ত্রীমশায় বলশালী লোকটাকে কি বললো। দু’জন এসে ওদের হাতের বাঁধন খুলে দিলো। ফ্রান্সিস তখন ওল্ড টেস্টামেন্ট’ বইয়ের কথা, সাংকেতিক লেখা, এসব বলে গেলো।
রাজা অধৈর্য হয়ে বারবার মন্ত্রীকে কি বলতে লাগলো। মন্ত্রী কোন কথা না বলে মনোযোগ দিয়ে ফ্রান্সিসের কথা শুনতে লাগলো। কথা শেষ হলে মন্ত্রী রাজাকে ইউনিপেড্দের ভাষায় সব বলে গেলো। রাজা ঠ্যাং ছুঁড়ে ফেলে সিংহাসনের ওপর এক লাফে উঠে দাঁড়ালো। তারপর চিৎকার করে কি বলে উঠলো।
মন্ত্রী বললো, রাজামশায় বলছেন, এরিক দ্য রেডের গুপ্তধন তাঁর এক্ষুণিই চাই।
ফ্রান্সিস মৃদু হাসলো। বললো, রাজাকে বলুন, অত তাড়াতাড়ি উদ্ধার করা সম্ভব হলে, অনেক আগেই লোকে উদ্ধার করতো। যাকগে, আমরা আর কোন সূত্র পাই কি না, সেই চেষ্টায় আছি।
মন্ত্রী রাজাকে তাই বললো। রাজমশাই আবার কি বললো, মন্ত্রী বললো, রাজামশাই জিজ্ঞেস করছেন, তোমরা কি পারবে?
–চেষ্টা করবো। তবে, দুটো শর্ত আছে।
–বলো।
–এক, যে ঘরে আমরা ছিলাম, সেই ঘরে আমাদের থাকতে দিতে হবে। দুই । আমাদের স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে দিতে হবে।
মন্ত্রী রাজাকে সব কথা বললো। রাজা কপালে হাত বুলালো একবার। তারপর কিবললো। মন্ত্রী বললো, রাজামশাই আপনাদের শর্তে রাজি হয়েছেন। তবে তারও একটা শর্তআছে।
–সেটা কী?
–তোমরা একজন যখন বাইরে বেরোবে, অন্যজনকে তখন ঘরে থাকতে হবে। দু’জনে একসঙ্গে কোথাও যেতে পারবে না।
ফ্রান্সিস রাজার মুখের দিকে তাকলো। দেখলো, অল্প-অল্প গোঁফেরাকে রাজা মিষ্টি মিষ্টি হাসছে। ও বুঝলো, বর্বর অসভ্য হলে কি হবে, রাজা এভাল্ডাসন নির্বোধ নয়। ও সেই শর্তে রাজি হল। এখন যা শর্ত দেবে, তাই মেনে নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। মন্ত্রী বললো, কবে থেকে কাজে লাগবে?
–কাল থেকেই।
–রাজা আবার আসনে বসলো। আরো কয়েকজন এস্কিমোদের ধরে আনা হয়েছে। এবার তাদের বিচার হবে বোধহয়।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি নিজেদের আস্তানায় ফিরে এলো।
পরের দিন ঘুম ভাঙতে ফ্রান্সিস দরজার বাইরে কাদের চলাফেরার শব্দ শুনলো। ও দরজা খুললো। দেখলো, দু’জন ইউনিপেড্ কুঠার হাতে দরজায় পাহারা দিচ্ছে। তার মানে রাজা এভাল্ডাসন ওদের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়নি। হ্যারিকে ডেকে তুলল ও, পাহারার কথা বললো। হ্যারি বললো, এসব মেনে নিতেই হবে–উপায় নেই।
সারাদিন ফ্রান্সিসরা ঘরে বসে কাটালো। বিকেলের দিকে ফ্রান্সিস বেরলো। পাহারাদার দু’জনও ওর সঙ্গে সঙ্গে চললো। সে গীর্জায় গেল, কোমরে গোঁজা ছিল চাবিটা। ও দরজা খুলে গীর্জায় ঢুকলো, ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল চারদিক। আজকেও সেই কড়া দুটো ওর নজর কাড়লো। এত নীচে দুটো কড়া গাঁথার অর্থ কী? এ সব সাত পাঁচ ভাবতে * ভাবতে আবার আস্তানায় ফিরে এলো।
এদিকে ইউনিপেড্রা এসে বাট্টাহালিডের যে কটা পাথরের বাড়ি ছিল, সে-কটা রাজ বাড়ির ঘরগুলো যত টুপিক ছিল দখল করে নিয়েছে। টুপিকের বাইরে আগুন জ্বেলে ওরা মাংস ঝলসায়, খায় আর অনেক রাত পর্যন্ত হৈ হল্লা করে।
সেদিন ওরা দু’জনে বিছানায় বসে আছে। বাইরে যথারীতি পাহারাদার দু’জন পাহারা দিচ্ছে। ব্যারি ডাকল, ফ্রান্সিস।
–বলো।
–আমাদের একজনকে পালাতেই হবে।
–হ্যাঁ, আমিও তাই ভাবছিলাম। দেখ, গুপ্তধন খুঁজছি, এই ধোঁকা দিয়ে বেশীদিন চলবেনা। তার আগেই আমাদের কাউকে আঙ্গামাগাসালিকে যেতে হবে–বন্ধুদের নিয়ে আসতে হবে। তারপর কোর্ট থেকে রাজা সোক্কাসনের যত সৈন্য আছে, সবাইকে একত্র করে বাট্টাহালিড্ আক্রমণ করতে হবে। এখান থেকে ইউনিপেড্দের তাড়াতেই হবে।
–তাহলে তুমিই পালাও–হ্যারি বললো।
–পালালে তো আমাকেই পালাতে হবে, তুমি এত ধকল সহ্য করতে পারবে না। কিন্তু আমি পালালে তোমার না কোন বিপদ হয়।
–শোন–হ্যারি বললো, তুমি পালালে আমি বলবো যে, আমি একটা নতুন সূত্র পেয়েছি। রাজা এরিক দ্য রেডের যাদুঘরটা আমাকে ভালো করে দেখতে হবে। প্রত্যেকদিন অনেকক্ষণ ধরে ঐ যাদুঘরে কাটাবো। এভাবে রাজা এভাল্ডাসনের বিশ্বাস অর্জন করবো। যাদুঘরের জিনিসপত্র নাড়া-চাড়া করবো। পাথরে মেঝে খুঁড়তে বলবো, এসব করতে করতে তুমি লোকজন নিয়ে আসতে পারবে। তারপর শেষ লড়াই।
