ফ্রান্সিসরা দরজা বন্ধ করে সরে এল। বিছানায় বসলোনা, পায়চারী করতে লাগলো। ওদিকে বিজয়ী ইউনিপেড্দের হৈ-হল্লা চিৎকার চলেছে। এক সময় হঠাৎফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে পড়ল। চিন্তিতস্বরে ডাকল, হ্যারি।
–বলো। –আমরা কী ভুল করলাম।
হ্যারি বিছানায় বসেছিল, এবার উঠে এসে ফ্রান্সিসের মুখোমুখি দাঁড়ালো। দৃঢ়স্বরে বললো, তুমি এই চিন্তাকে একেবারে প্রশ্রয় দিও না। আমরা যা করেছি, ঠিক করেছি, ঠিক করেছি। মনটা শক্ত করো।
ফ্রান্সিস বুঝলো, হ্যারি ঠিক কথাই বলেছে। এখান থেকে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের পর, আর পালানোর প্রশ্ন উঠে না। তাছাড়া এখন আর পালাবার উপায়ও নেই।
বাইরের হৈ-হল্লা সমানে চলেছে, তখন হঠাৎ প্রচণ্ড জোরে লাথি পড়তে লাগল। শ্লেটপাথরের দরজা, ভেঙে যাওয়া কিছু বিচিত্র নয়। ফ্রান্সিস আর হ্যারি দু’জনেই তাড়াতাড়ি তরোয়াল তুলে নিল। তারপর ফ্রান্সিস পায়ে-পায়ে এগিয়ে দরজাটা খুলে দিয়েই ঝট করে পিছিয়ে এলো। দু’জন ইউনিপেড্ হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে পড়লো।
ফ্রান্সিস নরওয়ের ভাষায় চিৎকার করে বললো, কী চাই?
ওরা এতক্ষণে ফ্রান্সিসদের দিকে তাকাল। ওরা এস্কিমোদের দেখবে ভেবেছিল, দেখলো দু’জন য়ুরোপীয়ানকে। একজনের হাতে একটা রক্তমাখা কুঠার, অন্যজনের হাতে বর্শা। ফ্রান্সিসের কথা ওরা কিছুই বুঝল না। দু’জনে একবার পরস্পরের মুখের দিকে তাকালো। তারপর কুঠার হাতে লোকটাই প্রথম ঝাঁপিয়ে পড়ল ফ্রান্সিসের ওপর। ফ্রান্সিস তাড়াতাড়ি সরে গিয়ে তরোয়াল চালালো। কিন্তু তরোয়ালটা ওর বুক ছুঁয়ে গেল। চামড়ার নোংরা পোশাকটা দো ফালা হয়ে গেল।
ওদিকে অন্য লোকটা হ্যারিকে লক্ষ্য করে বর্শা ছুঁড়ল। হ্যারি ঝটু করে বসে পড়লো। বর্শাটা ওর মাথার ওপর দিয়ে গিয়ে পাথুরে দেয়ালে লেগে ঝনাৎ করে পড়ে গেল মেঝের ওপর। ওদিকে কুঠার হাতে লোকটা ফ্রান্সিসকে লক্ষ্য করে কুঠার চালালো। কিন্তু ভারী কুঠার নিয়ে তাড়াতাড়ি নড়াচড়া করা যায় না, ফ্রান্সিস সেই সুযোগটা নিল। ঝট করে মাথা সরিয়ে কুঠারের ঘাটা এড়িয়ে, একমুহূর্ত দেরী করল না। নিচু হয়ে সোজা তরোয়াল বসিয়ে দিল লোকটার বুকে।
লোকটা ‘অঁক’ করে একটা শব্দ তুলে চিৎ হয়ে মেঝের ওপর পড়ে গেল। তারপর গোঙাতে লাগল। ওদিকে বর্শা হাতছাড়া হওয়ায় অপর লোকটি খালি হাতে দাঁড়িয়ে রইল। একবার দরজার দিকে তাকালো, অর্থাৎ পালাবার ধান্দা। কিন্তু ফ্রান্সিস ওকে সেই সুযোগ দিল না। ঝাঁপিয়ে পড়লো লোকটার ওপর। তারপর লোকটার পেটে তরোয়াল ঢুকিয়ে দিল। লোকটা মেঝেতে গড়িয়ে পড়ে গোঙাতে লাগল। আগের লোকটি তখন মরে গেছে। ফ্রান্সিস জোরে শ্বাস ফেলে ফেলে বললো, -দুটোকেই বাইরে ছুঁড়ে ফেলতে হবে।
ওরা তাই করল। লোক দুটোকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে বাইরে বরফের ওপর ফেলে দিল। অত লোকজনের ছুটোছুটি হৈ-হল্লার মধ্যে কারো নজরে পড়লোনা ব্যাপারটা।
ওরা ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। সারাটা দিন আর কেউ ওদের ঘরের দিকে এলো না। কিন্তু সন্ধ্যের পর ওদের দরজার সামনে অনেক লোকের পায়ের শব্দ শুনলো ওরা। দরজা একটু ফাঁক করে দেখলো, একদল ইউনিপেড্ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মশাল হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বোধহয় রাজবাড়ির ঘরগুলোতে হানা দিতে বেড়াচ্ছে।
বিছানায় বসল দু’জনে। খুব চিন্তিতস্বরে ফ্রান্সিস হ্যারিকে বললো, এখন কী করা যাবে?
হ্যারি বললো, অতলোকের মোকাবিলা করতে যাওয়া বোকামি। লড়াই নয়, বুদ্ধি খাঁটিয়ে বাঁচতে হবে।
হ্যারির কথা শেষ হতে না হতেই দরজায় দমাদ্দম লাথি পড়তে লাগল। সেইসঙ্গে দরজায় ধাক্কা। ফ্রান্সিস এগিয়ে দরজা খুলে পিছিয়ে দাঁড়ালো। ইউনিপেড়া মশাল হাতে দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। কারোর হাতে বর্শা, কারোর হাতে কুঠার। মশালের আলোয়ওদের ভাবলেশহীন কাদা মাখা মুখ বীভৎস লাগছে দেখতে। ওরা ফ্রান্সিসের দেখে একটু অবাক হলো।
ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বললো, হ্যারি তরোয়াল ফেলে দাও।
দু’জনেই তরোয়াল ফেলে দিল। পাথরের মেঝেতে শব্দ হলো–ঝনাৎঝনাৎ। ওরা যে যুদ্ধ চায় না, বরং আত্মসমর্পণ করছে, ফ্রান্সিস এটা ওদের বোঝাল। ওদের মধ্যে একজন বলশালী চেহারার লোক এগিয়ে এসে এস্কিমোদের ভাষায় কী বলল। সবটুকু না বুঝলেও ফ্রান্সিস বুঝল, ও বলতে চাইছে তোমরা এখানে কী করছো? ফ্রান্সিস চিৎকার করে নরওয়ের ভাষায় বললো, আমরা রাজা এভাল্ডাসনের সঙ্গে কথা বলতে চাই।
ফ্রান্সিস বারবার কথা বলতে লাগল, আর রাজা এভাল্ডাসন শব্দটার ওপর জোর দিতে লাগল। ওরা ফ্রান্সিসের কথা না বুঝলেও রাজা এভাল্ডাসন’ শব্দটা বুঝল। ওদের মধ্যে দু’একজন দুর্বোধ্য ভাষায় কী বলে উঠে কুঠার তুলে ধরল। বলশালী লোকটা হাত তুলে ওদের নিরস্ত করল। তারপর একজনের হাত থেকে দড়ি নিয়ে এগিয়ে এলো। ফ্রান্সিস আবার চিৎকার করে বললো, রাজা এভাল্ডসনের সঙ্গে আমরা দেখা করতে চাই। এদিকে বলশালী লোকটা ও আর একজন মিলে, ফ্রান্সিস ও হ্যারির হাত পিছমোড়া করে বেঁধে তারপর ফ্রান্সিসকে দরজার দিকে ধাক্কা দিল। ফ্রান্সিস রাগে ফুঁসতে লাগলো। কিন্তু এখন এই পরিবেশে মাথা গরম করা বোকামি। এখন বাঁচতে হবে।
ইউনিপেড্দের দল ওদের নিয়ে চললো। রাজবাড়ির ভেতরে ঢুকল ওরা। তারপর সভাগৃহেঢুকল। ফ্রান্সিস দেখলো, অনেকগুলো মশাল জ্বলছে। রাজার পাথরের বেদীমত আসনটায় কে মোটামত একটা নোক হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছে। ফ্রান্সিস বুঝল, এই লোকটাই ইউনিপেড্দের রাজা–এভাল্ডাসন। রাজার পরণেও নোংরা পোশাক। মুখটা বেশ ভারী। কপালের ওপর খোঁচা খোঁচা চুল নেমে এসেছে। মুখে সামান্য দাড়ি-গোঁফ। কুকুতে চোখ। দেখলো, রাজা এই বল্গা হরিণের আস্ত ঠ্যাং থেকে মাংস ছাড়িয়ে খাচ্ছে। রাজার আসনের পাশেই একটা রক্তমাখা কুঠার পড়ে আছে। সেই বলশালী লোকটা একনাগাড়ে কী বলে যেতে লাগলো, আর রাজামশাই কুতকুতে চোখে ফ্রান্সিসদের দেখতে লাগলো। লোকটার কথা শেষ হলে রাজামশাই মাংস খাওয়া থামিয়ে চিৎকার করে কী বলে উঠলো। দু-তিনজন ইউনিপেড্ ছুটে এসে ফ্রান্সিসদের ধাক্কা দিতে লাগলো। ফ্রান্সিস বুঝলোনা, রাজা কী আদেশ দিলো। তবে এটা বুঝলো, যে বিপদ কাটে নি। ও তাড়াতাড়ি ফিরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললো, রাজা এভাল্ডাসন আপনাকে একটা জরুরি কথা বলতে চাই। এদিকে ইউনিপো ওদের দুজনকে ঠেলছে আর ফ্রান্সিস একনাগাড়ে কথাটা বলে চলেছে ওখানে। কেউই ওর কথা বুঝল না। এমন সময় অমাত্যদের আসনে বসা একজন লোক উঠে রাজাকে গিয়ে কী বললো, তারপর ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে ভাঙা-ভাঙা নরওয়ের ভাষায় বললো–তোমার নাম কি?
