একটু পরেই নেসার্ক এলো৷ওরও হাতে কুঠার, ও হাঁপাচ্ছিল। বললো, গুপ্তচর খবর নিয়ে এসেছে, ইউনিপো সাক্কারটপ পাহাড়ের নীচে জড়ো হয়েছে। হয়তো এতক্ষণে আক্রমণ শুরু করবে। আপনারা বাইরে বেরোবেন না–রাজা হুকুম দিয়েছেন। আপনারা আমাদের অতিথি। আপনাদের রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য।
–ওদের কী লোকজন বেশি? ফ্রান্সিস জানতে চাইলো।
–হতে পারে। এর আগে দুদু বার আমরা ওদের হঠিয়ে দিয়েছি। এবার তাই হয়তো বেশি লোজন নিয়ে এসেছে।
নেসার্ক আর দাঁড়ালো না। ছুটে গিয়ে একটা চলন্ত স্লেজগাড়িতে উঠে পড়লো।
একটু বেলা হতেই যুদ্ধক্ষেত্রের কোলাহল এখানে এসেও পৌঁছতে লাগলো। সন্দেহ নেই, মরনপণ যুদ্ধ চলেছে।
হারি ডাকলো, ফ্রান্সিস?
–উ?
–এখন কী করবে?
–সন্ধ্যে নাগাদ যুদ্ধের কোলাহল স্তিমিত হয়ে এল। রাত নেমে আসতে আর কোন সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। দুটো একটা করে শ্লেজগাড়ি আহত-নিহতদের নিয়ে ফিরতে লাগলো। রাজবাড়ির বাইরের সব ঘরে আহতদের রাখা হলো। অনেক রাত পর্যন্ত আহতদের আর্তনাদ শোনা গেল।
তখন গভীররাত, হঠাৎ দরজায় ধাক্কা দেওয়ার শব্দ। ফ্রান্সিসের আগেই ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। ও আস্তে আস্তে হ্যারিকে ধাক্কা দিলো। ঘুম ভেঙে হারি উঠে বসলো। ফ্রান্সিস অস্ফুটস্বরে বললো, তরোয়ালটা হাতে নিয়ে তৈরি থাকো। তারপর নিজে তরোয়াল হাতে দরজার কাছে। গিয়ে দাঁড়ালো। তখন দরজায় ধাক্কা দেওয়ার বিরাম নেই। ফ্রান্সিস বললো, কে?
–আমি–-আমি নেসার্ক। নেসার্ক ঘরে ঢুকেই বললো, চলো, আগে রাজামশাই কী বলেন শুনি।
দুজনে নেসার্কের পিছু পিছু রাজবাড়ির সামনে এলো। অল্প জ্যোৎস্নায় ওরা দেখলো, অনেকগুলো স্লেজগাড়ি সাজানো হয়েছে। এসব কাজ চলেছে নিঃশব্দে। মশালও জ্বালানো হয়নি। বল্লা হরিণ-টানা একটা শ্লেজগাড়িতে রাজা-রানী বসে আছেন। রানীর কোলে ঘুমন্ত শিশু রাজকুমার। ওরা মাথা নুইয়ে রাজা-রানীকে সম্মান জানালো। রানীকে আগে ফ্রান্সিস দেখেছিল। কী সুন্দর উজ্জ্বল ছিল তার রূপ। আজকে দেখলো মলিন মুখ বিমর্ষ, চিন্তাক্লিষ্ট।
রাজা ফ্রান্সিসকে কাছে ডাকলেন। কেমন ভগ্নস্বরে বললেন, দেখুন যুদ্ধ আমাদের অনুকূলে নয়। আমার প্রজারা আমাকে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে। তারা প্রাণপণ যুদ্ধ করছে করবে, কিন্তু আমাদের জয়ের কোন আশা নেই। আমরা কোর্টন্ডে আশ্রয় নিতে যাচ্ছি। আপনাদের জন্যে গাড়ি তৈরি রাখা হয়েছে, আসুন।
ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বললো, না মহারাজ, আমরা এখানেই থাকবো। ইউনিপেড্দের সঙ্গে আমাদের তো কোন শত্রুতা নেই।
–তা’ হলেও ওরা হিংস্র বর্বর। সভ্য রীতি ওরা মানে না।
–মহারাজ, কজির জোরে নয়, বুদ্ধির জোরেই আমরা বেঁচে থাকবো। ওরা আমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না।
রাজা সোক্কাসন ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ ভাবলেন। ওদিকে রাজাও অমাত্যদের পরিবারের লোকজন নিয়ে অন্য গাড়িগুলো রওনা হতে শুরু করেছে। রাজা সেদিকে একবার তাকালেন। তারপর ফ্রান্সিসদের দিকে ফিরে বললেন, দেখুন আমি আপনাদের নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাবার সব বন্দোবস্ত করেছিলাম। কিন্তু আপনারা রাজি হলেন না। এরপরে আপনাদের যদি কোন ক্ষতি হয়, তার জন্যে আমাকে দায়ী করবেন না।
–না মহারাজ। আমরা নিজেদের দায়িত্বেই এখানে থাকছি।
–বেশ। রাজা গাড়িচালককে ইঙ্গিত করলেন।
বন্ধ হরিণে-টানা গাড়ি বরফের ওপর দ্রুতবেগে ছুটলো। অন্য গাড়িগুলোও ছুটলো। ফ্রান্সিস আর হ্যারি নিজেদের ঘরে ফিরে এলো। দুজনেই আর ঘুমুতে পারলো না। হ্যারি একসময় বললো, এভাবে থেকে যাওয়াটা কী ভালো হলো?
–পালিয়ে গিয়েই বা কী হতো? অলস সময় কাটাতাম শুধু। কিন্তু এখানে থাকলে গুপ্তধনের খোঁজ চালিয়ে যেতে পারবো।
–কিন্তু ইউনিপেড়া কি আমাদের শান্তিতে থাকতে দেবে?
–দেবে, কারণ ওদের রাজা এভান্ডাসনের লক্ষ্য এরিক দ্য রেডের গুপ্তধন। আমরা ওর এই ধনলিপ্সাটাকেই কাজে লাগাবো। আমরা সেই ধনভাণ্ডার খুঁজে দেবো, এই শর্তে আমাদের কোন ক্ষতি করবে না।
–হুঁ কথাটা ঠিক। কিন্তু এভাল্ডসন কেমন লোক, তা এখনও জানি না।
–দেখা যাক। এই সব কথাবার্তার মধ্যে দিয়ে বাকী রাতটুকু কেটে গেল। পরের দিন সকাল থেকেই আবার হৈ-হল্লা। যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে যেতে লাগল সৈন্যরা।
দুপুর নাগাদ আহত-নিহত সৈন্যদের নিয়ে গাড়ি ফিরতে লাগল। তার পেছনেই দলে-দলে ইউনিপেরা বাট্টাহালিডে ঢুকতে লাগল। বোঝাই গেল, রাজা সোক্কাসনের সৈন্যরা হেরে গেছে। ফ্রান্সিস ও হ্যারি এই প্রথম ইউনিপেড্দের দেখলো। এস্কিমোদের মতই পোশাক ওদের। তবে অত্যন্ত নোংরা আর ভেঁড়াখোঁড়া। মুখে-হাতে কাদা মাখা, ঘাড় মাথা–ঢাকা নোংরা টুপির মতো। মাথায় খোঁচা খোঁচা চুল তারই ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আছে। চোখ মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, ওরা হিংস্র। ওদের হিংস্রতার নমুনা ফ্রান্সিস আর হ্যারি দেখলো। আহত এস্কিমোদের একটা গাড়ি রাস্তার পাশে ছিল। ইউনিপো চিৎকার করে ঝাঁপিয়ে পড়লো সেই গাড়ির ওপর। কুঠার চালিয়ে বর্শা দিয়ে খুঁচিয়ে মেরে ফেলতে লাগল সেইআহতদের। তাদের করুণ চিৎকারে আকাশ ভরে উঠলো। আর একদল ইউ নিপেড় কুঠোর আর বল্লম হাতে কাছাকাছি টুপিকগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। নারী শিশুদের কান্নার রোল উঠলো। ওরা বোধহয় কাউকে বেঁচে থাকতে দেবে না। নির্বিবাদে হত্যা করবে সবাইকে। শ্মশান করে ছাড়বে বাট্টাহালিড্কে।
