নেসার্ককে বললো, অত নীচে মশাল রাখলে আলো তো ঢাকা পড়ে যাবে।
নেসার্ক বললো, ওটা মশাল রাখারই আংটা। বরাবর উৎসবের দিনে ওখানেই মশাল রাখা হয়। এরিক দ্য রেডের আমল থেকে নাকি তা চলে আসছে। ও পাশের দিকটা দেখিয়ে বললো, ও দিকেও ঠিক এরকম একটা আংটা আছে। ফ্রান্সিস সেদিকে লক্ষ্য করে দেখলো ঠিক ও রকম একটি আংটা আছে। ফ্রান্সিস সেদিকে লক্ষ্য করে দেখলো, ঠিক ও রকম একটা আংটা মেঝের কাছাকাছি দেয়ালে গাঁথা। হ্যারির দিকে ফিরে বললো, হ্যারি, ব্যাপারটা একটা অদ্ভুত লাগছে না? অতনীচে মশাল রাখবার আংটা?
–হুঁ। হয়তো আগে কিছু রাখা হত, এখন মশাল রাখা হয়।
–আগে কী রাখা হত?
–এ-বিষয়ে আমরা সবাই অন্ধকারে। কারণ, ব্যাপারটা আজকের না অনেকদিন আগের।
ফ্রান্সিস মাথা ঝাঁকিয়ে বললো, ঠিক। তবে ব্যাপারটা অদ্ভুত।
দু’জনে আর কিছুক্ষণ গীর্জাটার ভেতরে ঘোরাঘুরি করলো মনোযোগ দিয়ে সবকিছু দেখলো। তারপর আস্তানার দিকে ফিরে আসতে লাগলো, তখনই একটু দূরে উত্তরদিকে পাহাড়টা দেখলো ফ্রান্সিস। এসে অবধি সব জায়গা দেখা হয়েছে, কিন্তু পাহাড়টা দেখা হয়নি। ও নেসার্ককে ডাকলো, নেসার্ক?
–বলুন?
–ঐ পাহাড়টার কী নাম?
–সক্কারটপ পাহাড়।
–কত উঁচু?
–খুব বেশি নয়?
–ও!
–পাহাড়টার ওপাশের নিচের দিকে আমার টুপিক।
–চলো, তোমার টুপিক কালকে দেখতে যাবো। হ্যারি বললো।
–বেশ তো আপনারা গেলে আমাদের বুড়ো বাবা-মাও খুব খুশিহবে। নেসার্ক বললো।
পরের দিন দুটো শ্ৰেজগাড়িতে চড়ে ফ্রান্সিস আর হ্যারি চললো পাহাড়টার ওপাশে। সঙ্গে নেসার্ক। পাহাড়টাকে বাঁ দিকে রেখে ওরা ঘুরে ওপাশে গেলো। দূর থেকেই নেসার্কের টুপিক দেখা গেল। আজকের দিনটা অন্যদিনের চেয়ে বেশ উজ্জ্বল। সাদা বরফের পাহাড়টা থেকে যেন আলো ছিটকে পড়ছে। আজকে শীতটাও একটু কম। খুব ভালো লাগছিলো ফ্রান্সিসের।
ওরা নেসার্কের টুপিকের সামনে এসে গাড়ি থামালো।
টুপিকের বাইরে দড়িতে হরিণের চামড়া শুকোতে দেওয়া হয়েছে, এস্কিমোদের তাঁবু যেমন হয়ে থাকে। নেসার্কের বাবা-মা বেরিয়ে এলো টুপিক থেকে। ফ্রান্সিস আর হ্যারিকে ওরা জড়িয়ে ধরলো। এস্কিমোদের ভাষায় কি যেন বলতে লাগলো। নেসার্ক হেসে বললে, বাবা-মা বলছে, আমাদের গরীবের টুপিক। আপনাদের উপযুক্ত সমাদর করতে পারবো না বলে কিছু মনে করবেন না যেন।
ওদের টুপিকের মধ্যে বিছানায় বসতে বললো। ওরা দুজনে বসলো। সকালেই নেসার্কের মা ওদের জন্য বন্ধু হরিণের মাংস বেঁধে রেখেছিলো। তাই খেতে দিলো সঙ্গে রুটি। এতো সুস্বাদু হয়েছে রান্না, যে এক বাটি মাংস ফ্রান্সিস এক লহমায় খেয়ে নিলো।
ব্যারিওরকাণ্ড দেখে হাসলো। তারপর নিজের বাটি থেকে কিছুটা মাংস আর ঝোল ওর বাটিতে ঢেলে দিলো। নেসার্ক অবশ্য বলতে লাগলো, আরো মাংস আছে। আপনারা পেট ভরে খান।
কিন্তু ফ্রান্সিস লজ্জায় চাইতে পারলো না।
খাওয়া-দাওয়ার পর ওরা চারপাশটা একটু ঘুরে ফিরে দেখলো। দেখবার কিছুই নেই। শুধু বরফ আর বরফের বিরাট বিরাট চাই পাহাড়টার গায়ে।
বিদায় দেবার সময় ফ্রান্সিস নেসার্কের বাবা-মার হাত ধরে বারবার বললো, কুয়অনকা! কুয়অনকা।
এস্কিমোদের ভাষার এই শব্দটাইও জানে শুধু। নেসার্ককে বললো, তুমি এরকমভাবে তোমাদের বসতি থেকে দূরে থাকো কেন?
নেসার্ক হেসে আঙ্গুল দিয়ে পাহাড়টা দেখালো। বললো, জ্যোৎস্না রাত্রে এই পাহাড়ের রূপ দেখেন নি। সে–যে কী অপরূপ দৃশ্য! টুপিকের ফাঁক দিয়ে সেই দৃশ্য দেখি। মনে হয়, সমস্ত পাহাড়টা যেন একটা বিরাট হীরের খণ্ড। মৃদু আলো ঠিকরোয় বরফের চাঁইগুলো থেকে। আমার কাছে এই সবকিছু ঈশ্বরের আশীর্বাদ বলে মনে হয়। আপনারা হয়তো আমাকে পাগল ঠাওরাবেন কিন্তু–
–না নেসার্ক। তুমি যা বলছো, তা মিথ্যে নয়। তোমার মত দেখার চোখ, আর অনুভবেরমন পাওয়া ভাগ্যের কথা। ফ্রান্সিস নেসার্কেরাধে হাত রেখে কথাগুলো বললো।
নেসার্কট্রপবেই থেকে গেল। ফ্রান্সিস আর ম্যারি একটা শ্ৰেজগাড়ি চড়ে বাট্টাহালিডে ফিরে এলো।
ফ্রান্সিসদের দিন কাটতে লাগলো। ও নেসার্কের কাছ থেকে গীর্জার চাবিটা নিয়ে রেখেছে। কখনো হ্যারিকে নিয়ে কখনো একা গীর্জাটায় ঢোকে। চারদিক ঘুরে ঘুরে দেখে হয়তো এই গীর্জার নীচেই লুকনো আছে গুপ্তধন? কিন্তু কোথায়? পায়চারী করে আর ভাবে কোথায়, কিভাবে লুকনো আছে সেই গুপ্তধন? কিন্তু ভেবে ভেবে কুল-কিনারা পায় না। আর কোন নতুন সূত্রও পায় না।
রাজা সোক্কাসন মাঝে-মাঝে ডেকে পাঠান, জিজ্ঞাসা করেন–অনুসন্ধানের কাজ কেমন চলছে? ফ্রান্সিস বলে, চেষ্টা করছি, কিন্তু কোন সূত্র পাচ্ছি না।
একদিন ফ্রান্সিস রাজাকে জিজ্ঞেস করল–এরিক দ্য রেডের লেখা আর কোন বই আপনার যাদুঘরে আছে?
না। তবে শুনেছি, নিউ টেস্টামেন্ট’ ও অনুবাদ করেছিলেন। কিন্তু সেই বইখানা আমরা কেউ চোখে এখনও দেখি নি।
এভাবেই ফ্রান্সিসের দিন কাটতে লাগলো।
এরমধ্যেই একদিন ভোরবেলা রাস্তায় নোকজনের খুব হৈ-হৈ ডাকাডাকি শোনা গেল। ফ্রান্সিসের ঘুম ভেঙে গেল। ও বাইরে এসে দেখলো, দলে-দলে এস্কিমোরা, রাজার সৈন্যরা কুঠার, বর্শা হাতে পাহাড়টার দিকে চলেছে। হ্যারিরও ঘুম ভেঙে গেল। ও এসে ফ্রান্সিসের পাশে দাঁড়ালো। কী ব্যাপার, কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।
