ফ্রান্সিস কোন কথা না বলে হাসলো। তারপর উল্টো দিক থেকে বইটার পরিচ্ছেদভাগ অনুযায়ী অক্ষরগুলো বলে যেতে লাগলো। ছুরির ডগায় রক্ত শুকিয়ে গেলে আবার আঙ্গ ল থেকে রক্ত নিয়ে দিতে লাগলো। সব অক্ষর লেখা হলো। দুই বন্ধুই ঝুঁকে পড়ল সমস্ত লেখাটার ওপর। স্পষ্ট অর্থ পাওয়া যাচ্ছে, যীশুর চরণে বিশ্বাস রাখো। দু’জনেইদু’জনের দিকে তাকালো। ওরা কল্পনাও করে নি যে উল্টোদিক থেকে অক্ষরগুলো সাজালে একটা অর্থ বেরিয়ে আসবে। অথচ তাই হলো। ফ্রান্সিস দু’হাত তুলে লাফিয়ে উঠলো। বললো, হ্যারি, একেবারে অন্ধকারে ছিলাম। একটু আলোর আভাস পেয়েছি।
–কিন্তু কথাটা আমাদের কোন কাজে লাগবে? হ্যারি বললো।
–লাগবে–লাগবে। আজ না হয়, কাল। আসল কথা এরিক দ্য রেড সূত্র রেখে গেছেন। সেইটাই বুদ্ধি খাঁটিয়ে বের করতে হবে।
–তুমি কি এই কথাটাকে একটা সূত্র মনে কর।
–নিশ্চয়ই। নইলে অক্ষরগুলোকে এভাবে সাজিয়ে ব্যবহার করা হবে কেন? এটা অনেক ভেবেচিন্তেই করা হয়েছে।
–হুঁ। হ্যারি আর কোনো কথা বললো না।
ফ্রান্সিস বললো, একটা ব্যাপার বোঝা যাচ্ছে যে, তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধর্মবিশ্বাসী। রাজবাড়ি নয়, গীর্জাটাই হবে আমাদের লক্ষ্য। সমাধানের সূত্র আছে গীর্জাতেই, অন্য কোথাও নয়।
–হু–কথাটা চিন্তা করবার। হ্যারি বললো।
ফ্রান্সিস আবার লেখাটার দিকে ঝুঁকে পড়ে ভালো করে পড়লো, যীশুর চরণে বিশ্বাস রাখো’, বইটার পাতাগুলো এলোমেলো ওল্টালো। কিন্তু আর কিছু বিশেষত্ব দেখলো না। পরদিনই ফ্রান্সিস নেসার্ককে দিয়ে রাজাকে খবর পাঠালো। মন্ত্রণাঘরেই রাজা ওদের সঙ্গে দেখা করলেন। ফ্রান্সিস বইটা ফেরৎ দিয়ে বললো, একটা ক্ষীণ সূত্র পেয়েছি বইটা থেকে।
–সত্যি। রাজার মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হলো।
ফ্রান্সিস তখন বইটার উল্টো দিক থেকে অক্ষর সাজিয়ে কীভাবে একটা অর্থপূর্ণ কথা পেয়েছে সেসব বললো। রাজা বেশ আশ্চর্য হলেন। বললেন, অবাক কাণ্ড আমরা তো কতদিনই বইটা দেখে আসছি। কিন্তু এভাবে তো ভাবিনি। আপনি যে কত বুদ্ধিমান, সেটা এতেই বোঝা গেল।
ফ্রান্সিস বললো, আমার মনে হয়, গীর্জাটাতেই আমরা সন্ধানের সূত্র পাবো। যীশুখৃষ্ট এবং খৃষ্টধর্মের সঙ্গে যোগ আছে, এই ধনভাণ্ডার গোপন রাখার ব্যাপারে।
–দেখুন চেষ্টা করে। তবে যা করবার তাড়াতাড়ি করবেন। রাজা বললেন।
–কেন মহারাজ’ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করলো।
–আমাদের চিরশত্রু ইউনিপেড্দের আক্রমণের আশঙ্কা করছি।
–বলেন কি?
–হ্যাঁ। আমাদের গুপ্তচর সংবাদ এনেছে, উত্তরদিকে ওদের মধ্যে যুদ্ধের আয়োজন চলছে। ওরা স্লেজগাড়ি, অস্ত্র এসব সংগ্রহ করছে। যে কোনদিন আমাদের আক্রমণ করতে পারে।
–হুঁ। দেখি কাল থেকেই আমরা কাজে নামছি।
–তাই করুন। ওদের রাজা এভাল্ডাসন অত্যন্ত হিংস্র প্রকৃতির লোক। বছর কয়েক হল রাজা হয়েছে। এই বাট্টাহালিড্ জয় করার উদ্দেশ্য একটাই, এরিক দ্য রেডের গুপ্ত ধনভাণ্ডার উদ্ধার করা। ওরা অসভ্য বর্বর। ওরা পাহাড়ের গুহায় নয়তো মাটিতে গর্ত করে থাকে। এই হিংস্র মানুষদের দয়া-মায়া বলে কিছু নেই। রাজা বললেন।
ফ্রান্সিস আর কিছু বলল না। নিজের আস্তানায় ফিরে এল। হ্যারি তখন বেড়াতে যাবার জন্যে তৈরি হচ্ছিল। বললো, রাজাকে সব বলেছে।
–হ্যাঁ।
–কি বললেন রাজা।
–খুব খুশি হলেন। কিন্তু হ্যারি?
ফ্রান্সিস একটু থেমে বললো, একটা বিপদের সূচনা লক্ষ্য করছি।
–কি বিপদ? হ্যারি জিজ্ঞাসা করলো।
ফ্রান্সিস রাজামশাইয়ের আশঙ্কার কথা বর্বর ইউনিপেড্দের কথা সব বললো।
–তাহলে এখন কি করবো? হ্যারি চিন্তিত স্বরে বললো।
–আমরা অনুসন্ধান চালিয়ে যাবো। চলো কাল থেকেই লাগবো।
–বেশ–হ্যারি মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানালো।
পরদিন ফ্রান্সিস নেসার্ককে দিয়ে একটা মশাল আনালো। বাইরে আজকের আকাশটা কিছু পরিষ্কার। তবু গীর্জার ভেতরের অন্ধকারে এই আলোয় কিছুই দেখা যাবে না। ভালোভাবে সব খুঁটিয়ে-খুটিয়ে দেখতে হলে আরো একটা মশাল চাই।
নেসার্ককে সঙ্গে নিয়ে ওরা গীর্জার দিকে চললো। কতদিনের পুরনো গীর্জা। কালো কালো পাথরে শ্যাওলা ধরে গেছে। কবরখানা পেরিয়ে ওরা গীর্জার সামনে এসে দাঁড়ালো। বিরাট শ্লেটপাথরের দরজা। দরজায় মস্ত বড় একটা তালা ঝুলছে। নেসার্ক কোমরে ঝোলানো একটা লম্বা পেতলের চাবি বের করলো। ও যখন তালা খুলছে, তখন ফ্রান্সিস বললো, গীর্জাটা দেখাশুনা করবার কেউ নেই?
–একজন যাজক ছিলেন। তিনি বছর খানেক হলো মারা গেছেন। রাজামশাই নরওয়ে থেকে একজন নতুন যাজক আনার জন্য চেষ্টা করছেন।
দরজা খোলা হল। বেশ জোরে ধাক্কা দিয়ে খুলতে হল। ওরা ভেতরে ঢুকলো। অন্ধকার ভেতরটা। নেসার্ক চকমকি ঠুকে মশালটা জ্বালালো। মশালের আলোয় বেশ পরিষ্কার দেখা গেলো চারদিকে। পাথরের বেদীটা লাল সার্টিনের কাপড়ে ঢাকা। ঢাকনাটায় হলুদ সুতোর কাজ করা। তা’তে ঝালর লাগানো।
পেছনের গলি জানালায় রঙীন কাঁচ। পাথরের বেদীটার ওপর একটা কাঠের বেদী। তার ওপর ক্রুশবিদ্ধ যীশুর বেশ বড় পেতলের মূর্তি। ক্রুশবিদ্ধ যীশুর মুখে ক্ষীণ হাসি। মাথাটা একটু ঝুঁকে পড়েছে। চোখ দুটো খুব সজীব, এক পাশে তাকিয়ে আছেন। যীশুর চরণে বিশ্বাস রাখো–কথাটা মনে হতেই ফ্রান্সিস যীশুর মূর্তিটার পায়ের দিকে তাকালো। দেখলো, যীশুর পায়ে পেরেক পোঁতা ক্রুশের কাঠটা নীচের কাঠের বেদীটারমধ্যে ঢোকানো। ঐ কাঠটাই মূর্তিটার ভারসাম্য রক্ষা করছে। ফ্রান্সিস কাঠটা, কাঠের বেদীটা ভালো করে দেখল। কিন্তু কিছুই বিশেষত্ব পেল না। ফ্রান্সিস দেখছে, তখনই মশালের আলোটা আড়াল পড়ে গেলো। ও দেখলো, যীশুর মূর্তিটার পিছনে মেঝের কাছাকাছি এক কোণের দেওয়ালে একটা লোহার আংটা বেরিয়ে আছে। নেসার্ক তাতে মশাল রেখেছে। ফ্রান্সিস একটু আশ্চর্য হলো। অত নীচে মশাল রাখবার আংটা? আলো তো ঢাকা পড়ে যাবে।
