ফ্রান্সিস এগিয়ে এসে বইটা হাতে নিল। বইটা চামড়ায় বাঁধানো। ভেতরে উটে দেখল, বাইবেলের ওল্ড টেষ্টামেন্ট-এর অনুবাদ করেছিলেন, তাইনা।
–হ্যাঁ, সবটাই তার নিজের হাতের লেখা।
ফ্রান্সিস বইটার পাতা উল্টে ভালভাবে দেখতে লাগলো। বহু পুরনো বই। বিশেষ কোন কালিতে লেখা, তাই লেখাগুলো এখনও স্পষ্ট। বইটার মলাটের পরের পাতাতেই তার নিজের হাতের স্বাক্ষর। বোঝাই যাচ্ছে, তিনি মনেপ্রাণে অত্যন্ত ধার্মিক ছিলেন। ফ্রান্সিস রাজাকে জিজ্ঞাসা করল, উনি আর কিছু লেখেন নি?
–না। রাজা বললেন, তবে বংশপরম্পরায় একটা কথা চলে আসছে যে উনি নাকি নিউ টেষ্টামেন্ট’ ও অনুবাদ করেছিলেন। তবে সেইবইটা আমরা এখনও কেউ চোখে দেখি নি।
ফ্রান্সিস বইটা ভালো করে দেখলো। প্রাচীন পুঁথি যেমন হয় বৈশিষ্ট্যহীন। তিনি একজন ধার্মিক পুরুষ ছিলেন। তিনিই প্রথম তার তৈরি গীর্জার জন্যে য়ুরোপ থেকে ধর্মর্যাজক আনিয়েছিলেন। কাজেই খৃষ্টধর্মের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস ছিল, ও বিষয়ে সন্দেহ নেই। ফ্রান্সিস ঘুরে-ঘুরে জিনিসপত্রগুলো দেখলো। কিন্তু গুপ্তধনের সূত্র পাওয়া যেতে পারে, এমন কিছু দেখলো না। তবু বইটার গুরুত্বকে ফ্রান্সিস মনে মনে স্বীকার করলো। নরওয়ের ভাষায় অনুবাদ, কাজেই পড়তে অসুবিধে হবে না।
ও রাজাকে বললো, একটা বিনীত নিবেদন ছিল আপনার কাছে।
–বলুন।
–আমি কয়েকদিনের জন্যে বইটা নিতে পারি।
রাজা একটু ভাবলেন। বললেন, দেখুন এই ঘরের সব জিনিসই আমরা সযত্নে রাখি। কাউকে কিছু দেবার প্রশ্নই ওঠে না। তবে একটু থেমে রাজা বললেন, আপনি আমার অতিথি। একটা গুরুদায়িত্ব নিয়েছেন। সুতরাং আপনাকে সর্বপ্রকার সাহায্য করা আমার কর্তব্য।
ফ্রান্সিস বললো, দেখুন বইটা কতটা আমার কাজে লাগবে, তা এখনই বলতে পারছি । তবে কোথায় কীভাবে কোন্ সূত্র পাবো, তা এখনই বলা যায় না। চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া এই আর কি।
–বেশ, আপনি কয়েকদিনের জন্য নিন। তবে আর কাউকে নয়, আমার হাতেই ফেরৎ দেবেন।
–হ্যাঁ, আপনাকেই দেবো।
রাজা বইটা ফ্রান্সিসের হাতে দিলেন। বইটানিয়ে ওরা নিজেদের আস্তানায় ফিরে এলো। হ্যারি বিছানায় বসতে বসতে বললো, হঠাৎবইটা নিয়ে এতো ব্যস্ত হয়ে উঠলে কেন?
ফ্রান্সিস হেসে বললো, জানো তো আমাদের দেশের প্রবাদ–কোন কিছুকেই তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করো না, এমন কি ধূলোকেও নয়। দেখাই যাক না কোন আলোর সন্ধান পাই কিনা? তাছাড়া বাইবেল অনেক দিন পড়া হয় না। পড়লে একটু পূণ্যার্জন তো করা হবে!
রাত্রে খাওয়া-দাওয়ার পর হ্যারি শুয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস প্রদীপের আলোয় এরিক দ্য রেডের নিজের হাতের লেখা বাইবেলটা পড়তে লাগলো। পড়তে-পড়তে বুঝল-তার বেশ সাহিত্যজ্ঞান ছিল। অনুবাদের ভাষা যথেষ্ট সাবলীল, অথচ কতদিন আগের লেখা। অনেক রাত পর্যন্ত বইটা পড়ে রেখে দিলো।
পরের দিন বইটা পড়া শেষ হলো। হ্যারি বললো, কী হে কেমন লাগলো?
–খুব স্বচ্ছন্দ অনুবাদ। শুধু ধর্মজ্ঞানই নয়, রসাহিত জ্ঞানও ছিলো প্রশংসনীয়। তুমি পড়বে?
–দাও পাতা ওল্টাই। সময় তো কাটবে। হ্যারি বইটা নিয়ে পড়তে লাগলো। কিছুক্ষণ পড়ার পর বইটার পাতা ওল্টাতে-ওল্টাতে ডাকলো, ফ্রান্সিস?
হু। ফ্রান্সিস তখনও একনাগাড়ে পায়চারী করে চলেছে।
–একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছো?
–কী ব্যাপার?
–প্রত্যেকটি অধ্যায়ের আরম্ভের অক্ষরটা লাল রঙের মোটা অক্ষরে লেখা।
–বোধহয় সে আমলে এ-রকম রীতিই ছিল।
–বেশ, তা ঠিক হ’ল। কিন্তু অন্য কালিতে লেখা কেন।
–দেখা যাক। হ্যারি একমনে বইটা পড়তে লাগলো।
রাত্রে খাওয়া-দাওয়ার পর ফ্রান্সিস প্রদীপ জ্বেলে এলোমেলো ভাবে বইটার পাতা ওল্টাতে লাগলো। একসময় ডাকলো, হ্যারি, বইটার বিশেষত্ব কিছু দেখলে?
হ্যারি ডান হাতের চেটো ওল্টালো, বললো, উহু। তারপর বিছানায় কাত হয়ে শুলো। একটু পরেই ঘুমিয়ে পড়লো। ফ্রান্সিস তখনও বইটার পাতা এলোমেলো ভাবে ওল্টাচ্ছে। হঠাৎ ওর মনে হল আচ্ছা লাল অক্ষরগুলো একত্র করলে কি কোন সাঙ্কেতিক কথা পাওয়া যায়। ও তাই করলো। চারটে পরিচ্ছেদের প্রথম অক্ষরগুলো একত্র করে ভাবলো। কিন্তু কোন অর্থ দাঁড়ালো না। হাল ছেড়ে দিয়ে বইটা উল্টো করে রেখে দিলো। প্রদীপ নেভাবার আগে বইটার দিকে আবার তাকালো। ভাবলো, আচ্ছা উল্টো দিক থেকে দেখা যাক। ও আবার বইটা খুললো। এবার উল্টো দিক থেকে প্রথম অক্ষরগুলো মনে মনে সাজাতে লাগলো। দুটো শব্দ পেলো, যীশুর চরণে। ফ্রান্সিস ভীষণভাবে চমকে উঠলো। একটা অর্থ তো আসছে। ও হ্যারিকে ঘুম থেকে ডেকে তুললো।
হ্যারি উঠে বসে চোখ কচলাতে কচলাতে বললো, কী হলো?
–আমি এক-একটা অক্ষর বলে যাচ্ছি, তুমি লেখ।
–লিখবো। কালিকলম কোথায়?
ফ্রান্সিস এদিক-ওদিক তাকালো। তারপর নিজের বিছানায় বল্গা হরিণের চামড়াটা তুলে নিলো। চামড়ার উল্টো দিকটা পাতলা। সেদিকটা সাদাটে। বললো, এটাতে লেখ।
–কিন্তু কালি?
ফ্রান্সিস সাঙখুএকটা ছুরি দিয়েছিল। ওটা ফেরৎ দেওয়া হয়নি। ও বিছানার পাশ থেকে ছুরিটা নিলো। ছুরিটা দিয়ে নিজের আঙ্গুলের ডগা একটুখানি কাটলো। তারপর ছুরির ডগায় একটু রক্ত মাখিয়ে নিয়ে ছুরিটা হ্যারির দিকে এগিয়ে বললো, এটা দিয়ে লেখো।
তোমার যত পাগলামো।
