–বেশ তো, লেগে পড়ো। হারি এই বলে শুয়ে পড়লো।
পরদিন ফ্রান্সিস নেসার্ককে বললো, তুমি একটু রাজামশাইকে খবর দাও। যে আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চাই।
একটু পরেই নেসার্ক ফিরে এলো। বললো, আমার সঙ্গে চলুন। রাজা এনর সোক্কাসন আপনাদের জন্যে অপেক্ষা করছেন।
ওরা দুজনে চটপট তৈরি হয়ে নিল। তারপর রাজবাড়ির অন্দরমহলের দিকে চললো। অন্দরমহলটা বড় কিছু নয়। বিশেষভাবে সাজানো–গোজানো কয়েকটা ঘর পেরিয়ে একটা ঘরের সামনে এসে নেসার্ক বলল, আপনারা এই ঘরে যান।
ঘরে ঢুকে ওরা দেখল, একটা গোল পাথরের টেবিলমত। চারপাশে কয়েকটা কালো–ওক কাঠের চেয়ার, সবুজ গদী আঁটা। ফ্রান্সিস বুঝলো, এটা রাজার মন্ত্রণালয়। ওরা দু’জনে চেয়ারে বসল। একটু পরেই রাজা এলেন। পরণে সেই ঘাড়-মাথা ঢাকা হলদে গরম কাপড়ের হাঁটু পর্যন্ত আলখাল্লা। কোমরে সোনার চেন। ফ্রান্সিসরা উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান জানালো। রাজামশাই কাঠের চেয়ারে বসে বললেন, কী, ব্যাপার ফ্রান্সিস?
–দেখুন, আমরা খুব কম সময় নিয়ে এখানে এসেছি। কাজেই তাড়াতাড়ি কাজ সেরে ফিরে যেতে হবে। এরিক দ্য রেডের গুপ্তধনের সন্ধান আজ থেকেই করতে চাই। এজন্যে আপনার অনুমতি চাইছি।
–আমার কোন আপত্তি নেই। বলুন, কীভাবে অনুসন্ধান শুরু করতে চান?
–প্রথমে আমি অন্দরমহলের ঘরগুলো দেখবো।
–বেশ। এই বলে রাজা হাতে একটা তালি বাজালেন। নেসার্ক এসে দাঁড়ালো মাথা নীচু করে। রাজা বললেন, তুমি অন্দরমহলের সবাইকে কিছুক্ষণের জন্যে দরবার ঘরে যেতে বলো। সে চলে গেল।
–আপনারা অন্দরমহলটা দেখতে চাইছেন কেন?
–এরিক দ্য রেডের গুপ্তধন কোথায় আর তার একটা সূত্ৰ পাই কিনা, সেইজন্যেই অন্দরমহলটা দেখবো। তারপর দেখবো, এরিক দ্য রেড যে ঘরে থাকতেন, বিশেষ করে যে ঘরে তিনি জীবনের শেষ বছরগুলো কাটিয়েছেন। ফ্রান্সিস বললো।
–অন্দরমহলের শেষ ঘরটাতেই এরিক দ্য রেড শেষ জীবনে থাকতেন। ঘরটাকে অনেকটা যাদুঘরের মতো করে রাখা হয়েছে। তার ব্যবহৃত পোশাক, কালিদানকলম, বইপত্র এসব রাখা আছে। আপনারা অন্য ঘরটরগুলো দেখুন। যাদুঘরে সবশেষে আপনাদের নিয়ে যাবো। ঐ ঘরের চাবিটা শুধু আমার কাছেই থাকে।
–বেশ।
নেসার্ক তখনই এসে বললো, চলুন।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি চললো অন্দরমহলের দিকে। একই রকম পর পর কয়েকটা পাথরের তৈরি ঘর, দরজাগুলো কাঠের। ঘরের ভেতরে বগা হরিণের চামড়ার বিছানা। শুধু রাজা-রানীর ঘরের মেঝেয় লতাপাতা আঁকা কার্পেট বিছানো। চোখ ধাঁধানো সাজসজ্জা নেই সে-সব ঘরে। ফ্রান্সিস সবগুলো ঘরই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। সব ঘরই এক রকম, বিশেষ বৈশিষ্ট্য কিছু নেই। একটু অন্ধকার অন্ধকার ঘরগুলোয় সীলমাছের তেলের প্রদীপ জ্বলছিল। রাজা রানীর শোয়ার ঘরটাই যা সুসজ্জিত।
রানী বিছানায় বসেছিলেন। ওদের দেখে এগিয়ে এলেন। ফ্রান্সিস ও হ্যারি রানীর ডান হাতে চুম্বন করে সম্মান জানালো। রানী একটা সবুজ রঙের নরম কাপড়ের গাউন পরেছিলেন। মাথায় কোন ঢাকা ছিল না। রানী অপরূপ সুন্দরী, গায়ের রঙ দুধে-আলতা মেশানো। গলায় একটা মুক্তোর মালা, সাজ-সজ্জায় জাঁকজমক কিছু নেই। তিনি সুরেলা গলায় বললেন, আপনারা ভাইকিংদের দেশ থেকে এসেছেন?
ফ্রান্সিস হেসে বললো, আজ্ঞে হ্যাঁ।
–ওর কাছে শুনলাম, আপনারা এরিক দ্য রেডের গুপ্তধনের সন্ধান করবেন।
–আজ্ঞে হ্যাঁ।
–আমার মনে হয়, এরিক দ্য রেডের যাদুঘরে কিছু সূত্র পেলেও পেতে পারেন।
–এ কথা কেন বলছেন?
–কারণ, ঐ ঘরটাই সবচেয়ে পুরানো। এই ঘরগুলো তৈরি হয়েছে পরে।
ফ্রান্সিস মনে মনে রানীর বুদ্ধির প্রশংসা করল। ও বললো, আপনি ঠিকবলেছেন। আমরা এখন ঐ যাদুঘরেই যাবো।
রানী কোন কথা না বলে হাসলেন। ওরা রানীকে সম্মান জানিয়ে ফিরে চললো। ওরা মন্ত্রণালয়ে ফিরে এলো। রাজা ওদের জন্যেই অপেক্ষা করছিলেন।
ফ্রান্সিস বললো, মহারাজ, এবার আমরা এরিক দ্য রেডের যাদুঘরটা দেখবো।
ওরা চললো অন্দরমহল পেরিয়ে একেবারের শেষের দিকে। সেখানেই একটা ঘরের সামনে এসে রাজা দাঁড়ালেন। তার কোমরে চেন-এর সঙ্গে বাঁধা দুটো বড় বড় চাবি। তারই একটা খুলে নিলেন। ঘরে ঝুলছে মস্ত বড় একটা তালা। তিনি চাবি দিয়ে তালাটা খুললেন। বেশ ধাক্কা দিয়ে দিয়ে দরজাটা খুলতে হলো। বোঝাই গেল, ঘরটা অনেকদিন খোলা হয়নি।
ওরা ঘরের ভেতরে ঢুকলো। ভেতরটা কেমন অন্ধকার-অন্ধকার। একটা ভ্যাপসা গন্ধ, আলো না হলে কিছুই দেখা যাবে না। নেসার্ক এইজন্যেই বোধহয় একটা মশাল নিয়ে এসেছিল। চকমকি পাথরঠুকে আলো জ্বালাল। এবার ঘরের পুরনো আসবাবপত্র সব দেখা গেল। বেশীরভাগই কালো ওক কাঠের তৈরি। চারদিকে সাজিয়ে রাখা হয়েছে, এরিক দ্য রেডের ব্যবহৃত নানা জিনিসপত্র। একটা বিরাট পাথরের পাশে টেবিলের ওপর রাখা আছে রূপোর কলমদানি, রূপোর দোয়াত। পাশে একটা কাঠের আলমারী মত। তাতে রাখা আছে তাঁর ব্যবহৃত পোশাকপত্র। অত্যন্ত দামী যেসব জাঁকালো পোশাক। সোনার কাজ করা বেল্ট। আর একটা জায়গায় আছে নানারকম অস্ত্রশস্ত্র। মিনেকরা খাপে ছোরা, হাতীর দাঁতের বাঁটে সোনার কাজ করা তলোয়াল। খাপটায় হীরে-বসানো, মিনেকরা সেটা।
পাথরের টেবিলের ওপর একটা বই সহজেই নজরে পড়ে। লাল রঙের চামড়ার মলাট দেওয়া বই। রাজা বইটা টেবিল থেকে তুলে নিলেন। ফ্রান্সিস, চারদিকে ঘুরে-ঘুরে দেখছিল। রাজা বইটা হাতে নিয়ে ফ্রান্সিসকে ডাকলেন, ফ্রান্সিস এই বইটার কথা আপনাকে বলেছিলাম, বোধহয় মনে আছে আপনার।
