রাজা পাথরের বেদী থেকে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর বলতে লাগলেন, আপনারা সকলেই আমাদের পূর্বপুরুষ এরিক দ্য রেডের কথা জানেন। আরো জানেন তার গুপ্তধনের কথা। বহুদিন চেষ্টা করেও আজও কেউ গুপ্তধন আবিষ্কার করতে পারে নি। তারপর একটু থেমে বলতে লাগলেন, আপনারা জানেন, ভাইকিংরা বীরের জাতি। তাই ভাইকিংদের রাজার কাছে আমি এই গুপ্তধন আবিষ্কারের কথা বলি। তখন তিনি ভাইকিং জাতির গর্ব ফ্রান্সিস এবং তার বন্ধুদের সাহায্য নেবার কথা বলেন। আমাদের সৌভাগ্য যে, ফ্রান্সিস ও তার বন্ধু এখানে এসেছেন। ফ্রান্সিস ও তার বন্ধুরা এই গুপ্তধন খুঁজে বের করবেন, এই বিশ্বাস আমি রাখি। কারণ–
এই বলে রাজা ফ্রান্সিসের আনা সোনার ঘণ্টা, হীরে, মুক্তো এসবের কথা সংক্ষেপে বললেন। রাজার বক্তৃতা শেষ হলে সকলে করতালি দিল। রাজা পাথরের সিংহাসনে বসে ফ্রান্সিসকে ইশারায় ডাকলেন। ফ্রান্সিস উঠে রাজামশাই-এর কাছে গেল। রাজা একজন। এস্কিমোকে কাছে ডাকলেন। সাধারণ এস্কিমোদের চেয়ে এই লোকটি অন্যরকম। বেশ লম্বা-চওড়া স্বাস্থ্যবান। রাজা তাকে দেখিয়ে বললেন, ফ্রান্সিস, এর নাম নেসার্ক। নেসাকই আপনাদের দেখাশুনো করবে। আপনারা ওর সঙ্গে যান।
দু’জনে রাজাকে মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে চলে এলো। নেসার্ক এসে ওদের কাছে দাঁড়াল। পরিষ্কার নরওয়ের ভাষায় বললো, আমার সঙ্গে আপনারা আসুন।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি নেসার্কের সঙ্গে সভাগৃহের বাইরে এলো।
নেসার্কের পেছনে আসতে-আসতে দেখল, একটা চত্বরে অনেক কুকুর বাঁধা। এর পরেই হরিণশালা, আঁকাবাঁকা শিওলা অনেক বগা হরিণচরে বেড়াচ্ছে। একটা জায়গায় তার দিয়ে ঘেরা। বোঝা গেল, শ্ৰেজগাড়ি চালাবার জন্যে কুকুর আর হরিণগুলোকে রাখা হয়েছে।
পাথরের বারান্দা দিয়ে যেতে গিয়ে, ওরা দু’পাশে কয়েকটা ঘর দেখল। কোনটা অস্ত্রশস্ত্র রাখারঘর, কোনটায় পুরনো আমলের জিনিসপত্র রাখা, কোনটায় সৈন্যরা থাকে। শেষেরদিকে একটা ঘরের সামনে নেসার্ক দাঁড়াল। ঘরের দরজাটা শ্লেট-পাথরের তৈরি। নেসার্ক দরজাটা খুলল। দেখা গেল, ফ্রান্সিসদের শ্লেজগাড়ি থেকে সব জিনিসপত্র এনে এইঘরে রাখা হয়েছে। ফ্রান্সিস বুঝল, এটাইওদের আস্তানা। দু’জন এস্কিমো ঘরটা গোছ-গাছকরতে লাগল। নেসার্ক ওদের বগা হরিণের চামড়া বিছিয়ে বিছানামতো করে দিল। এই দিনের বেলাতেও ঘরটা অন্ধকারমত। নিকুনিবুহয়ে আসা একটা সীলমাছের তেলের প্রদীপ জ্বলছিল।
প্রদীপটার সলতে উসূকে দিয়ে নেসার্ক বললো, তাহলে আপনারা বিশ্রাম করুন, দরকার পড়লেই দয়া করে ডাকবেন।
সব এস্কিমোরা চলে গেল। হ্যারি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, এবার শোয়া যাক। ও বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে বললো, দেখছো ফ্রান্সিস, ঘরটা বেশ গরম।
–ঐ সীলমাছের প্রদীপের জন্যে। এই প্রদীপকে এস্কিমোরা নানা কাজে লাগায়। ঘরময় পায়চারী করতে করতে ফ্রান্সিস বললো।
–তুমি কি সারাদিনই পায়চারী করবে না কি? ফ্রান্সিস হেসে বললো, জানো তে কোন কিছু গভীরভাবে চিন্তা করার সময় আমি পায়চারি করি।
–হুঁ, কী ভাবছো অত?
–এরিক দ্য রেডের গুপ্তধনের কথা। এখানকার রাজবাড়ির কোথাও আছে সেই ধনভাণ্ডার। কিন্তু কোথায়? কী সূত্র ধরে এগোলে ওটার হদিশ পাবো?
–রাজার সঙ্গে কথা বলো। দেখো সূত্র পাও কি না?
–হু, রাজবাড়ির অন্দরমহলটা ভালো করে দেখতে হবে। যে ঘরে এরিক দ্য রেড থাকতেন, সেই ঘরটাও খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখতে হবে। অনেক কাজ।
এখন কয়েকটা দিন তো বিশ্রাম কর। ফ্রান্সিস হেসে বললো, বিশ্রাম করবার উপায় নেই। তাড়াতাড়ি দেশে ফিরতে হবে, বাবার হুকুম।
সেই দিনটা ওরা অবশ্য শুয়ে বসে কাটালো। নেসার্ক ওদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করল। বিকেলের দিকে ফ্রান্সিস নেসার্ককে ডেকে বললো, তুমি আমাদের শ্লেজগাড়িটা তৈরি রাখতে বলো। আমরা একটু ঘুরে ফিরে দেখবো। সে মাথা নেড়ে চলে গেল।
শ্ৰেজগাড়িটা বিকালে রাজবাড়ির বাইরে আনা হলো। ফ্রান্সিস ও হ্যারি গিয়ে গাড়িতে উঠলো। গাড়ি ছেড়ে দিল। বাট্টাহালিড্ এমন কিছু বড়ো শহর নয়। কয়েক পাক ঘুরতেই সব বাড়িঘর, টুপিক দেখা হয়ে গেল। এবার ওরা গীজার্টার কাছে এল। গীর্জাটা বেশ বড়ো, কালো কালো পাথর গেঁথে তৈরি। এরিক দ্য রেড নিজে নাকি এটা তৈরি করিয়েছিলেন। ওরা গাড়ি থেকে নেমে গীজার্টায় ঢুকলো। গীর্জার সামনের চত্বরে অনেক ক্রুশ পোঁতা। তার মানে এটাকে কবরখানা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ওরা গীর্জার মধ্যে ঢুকলো। বেশ অন্ধকার অন্ধকার ভেতরটা। মেঝে থেকে উঁচুতে দু’তিনটে কঁচের জানলা। তাতে লাল-নীল-হলুদ নানা রঙের কাজ করা। তারই মধ্যে দিয়ে বাইরের একটু আলো এসে পড়েছে। মেঝের কিছু কাঠের বেধিঅত পাতা। সামনে পাথরের বেদী। তার ওপর ক্রশবিদ্ধ যীশুখৃষ্টের একটা মূর্তি। বেশ বড় মূর্তিটা, পেতলের তৈরি। একটা কাঠের বেদীর ওপর সেটা রাখা, তার সামনে কয়েকটা মোমবাতি জ্বলছে। ভেতরটায় আর বিশেষ কোন সাজসজ্জা নেই। চৌকোনো পাথর দিয়ে মেঝেটা তৈরি। সব দেখে বেশ বোঝা যাচ্ছে, অনেকদিনের পুরনো গীর্জা। দেয়ালে কোথাও কোথাও সবুজেশ্যাওলা ধরেছে।
গীর্জা থেকে ওরা যখন বেরিয়ে এল, তখন চারদিক অন্ধকার হয়ে এসেছে। ওরা নিজেদের আস্তানায় ফিরে এলো। বিছানায় গা এলিয়ে দিতে দিতে ফ্রান্সিস বলল, আর এভাবে সময় কাটানো নয়। কাল থেকেই কাজে নামতে হবে।
