সাঙখুর মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। ওর বোধহয় ইচ্ছা ছিল, ফ্রান্সিসদের সঙ্গে বাট্টাহালিডে যাবার। ফ্রান্সিস পরদিন সব মালপত্র বাঁধা-ছাদা করে শ্লেজগাড়িতে রাখল। শুকনো সীলমাছ, সিন্ধুঘোটকের মাংস এসব নিল। খাবার-দাবার একটু বেশিই নিল। সাঙখু সঙ্গে থাকবে না, পথ হারাতে যাতে বিপদে পড়তে না হয়।
সূর্য দেখে উত্তর দিকটা ঠিক করে নিয়ে গাড়ি ছেড়ে দিল। একবার পেছন ফিরে দেখলো, সাঙখু ম্লান মুখে পাথরের ঘরটার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
আগের দিন এস্কিমো সর্দারেরসঙ্গে কথা হয়েছিল। সে বলেছিল, এখান থেকে সোজা উত্তরে বাট্টাহালিড্। পথে তুষারঝড়ের পাল্লায় না পড়লে চার-পাঁচদিন লাগবে। সেই অনুযায়ী ফ্রান্সিস সোজা উত্তর দিকে গাড়ি চালাতে লাগল। বরফের প্রান্তরের মধ্যে দিয়ে শ্লেজগাড়ি বেশ দ্রুত গতিতেই ছুটলো।
সেই প্রান্তর দিয়ে যেতে যেতে মাঝে মধ্যেই গলা-বরফের জায়গায় পড়তে লাগলো। গলা বরফের মধ্যে কুকুরগুলো পড়ে যেতে লাগল। ফ্রান্সিসরা নেমে গাড়িটাকে টেনে পিছিয়ে আনতে লাগলো, তারপরশক্ত বরফ-এলাকা দিয়ে সাবধানে গাড়ি চালাতে লাগলো। তবু গাড়ি গলা বরফের মধ্যে পড়তে লাগলো। ফ্রান্সিস এবার বুদ্ধি করে সন্দেহ হলেই গাড়ি থামিয়ে ফেলছিল। বরফের টুকরো তুলে ছুঁড়ছিল প্রান্তরের দিকে। বরফের টুকরোটা ডুবে গেলেই বুঝছিল গলা বরফ। পাশ কাটিয়ে শক্ত বরফের ওপর দিয়ে যাচ্ছিল।
সারাদিন গাড়ি চালিয়ে সন্ধ্যেবেলা একটা জায়গা বেছে নিয়ে তবু খাটালো। এস্কিমোদের মতো চকমকি পাথরে ইস্পাতের টুকরো ঠুকে আগুন জ্বালাল। সীলমাছের তেলের আলোয় তাঁবু গরম রাখা ও রান্না দুটোই চালাতে লাগলো। রাত কাটিয়ে পরদিন আবার পথ চলা।
যেদিন চঁদ-তারার আলো স্পষ্ট থাকে, মেঘ-কুয়াশা কম থাকে, সেদিন রাত্রেও গাড়ি চালাতে লাগলো। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাট্টাহালিড্ পৌঁছতে হবে। মাঝে মাঝে শক্ত শক্ত বরফের বড় বড় টুকরো ছড়ানো প্রান্তর পড়তে লাগলো। বরফের ধাক্কা বাঁচিয়ে কুকুরগুলো যাতে চোট না খায়, এইসব দেখে-শুনে চালাতে গিয়ে গাড়ি চালাতে লাগলো ধীরগতিতে। ও-রকম এলাকা তিন-চার জায়গায় পড়ল।
এর মধ্যেই একদিন ফ্রান্সিসরা দেখলো অরোরা বোরোলিস বা মেরুজ্যোতি। উত্তর মেরুর চৌম্বকক্ষেত্র থেকে এই বিচিত্র আলোর উৎপত্তি। উত্তর-দিগন্তের ওপরে আকাশটায় যেন লক্ষলক্ষ আতসবাজি জ্বলে উঠলো। বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল আলোর মালা। চোখ ধাঁধানো আলোনয়, নরম জ্যোৎস্নার মত আলো। বিচিত্র সেই আলোর খেলা-এ-এক অভিজ্ঞতা।
পথে কখনও কখনও কয়েকটি এস্কিমো পরিবারের একত্র বসতি এলাকা দেখতে পেলো। এস্কিমোদের সীলমাছের চামড়ার তৈরি তাঁবুকে বলে টুপিক। এসব টুপিকেও আশ্রয় জুটল মাঝে মাঝে। এভাবে চলে-চলে পাঁচদিনের মাথায় ওরা বাট্টাহলিড পৌঁছলো।
বাট্টাহালিড্ নামেই রাজধানী। এমন কিছু বড় শহর-টহর নয়। তবে কোর্টল্ডের চেয়ে বেশ বড়। অনেকটা এলাকা জুড়ে মাটি আর পাথরের তৈরি বাড়ি-ঘর। এখানে শুধু এস্কিমোরাই থাকেনা, য়ুরোপীয় শ্বেতাঙ্গরাও অনেক আছে। আবার চারদিকে এস্কিমোদের টুপিকও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
তখন সকাল। পাথরের বাড়ি থেকে, টুপিক থেকে অনেকেই ঔৎসুক্যের সঙ্গে ফ্রান্সিসদের দেখলো। রাজবাড়ি সহজেই পাওয়া গেল। পাথর, মাটি আর সড দিয়ে তৈরি রাজবাড়িটা বেশ বড়। এখানে য়ুরোপীয়রাও এস্কিমোদের মতো চামড়ার পোশাক পরে। রাজবাড়ির দিকে যেতে গিয়ে ওরা দূর থেকেই গীর্জাটা দেখতে পেল। বেশউঁচু পাথরের তৈরি গীর্জাটি তার মাথায় একটা বিরাট কাঠের ক্রুশ।
ওদের গাড়ি রাজবাড়ির সামনে দাঁড়ালো। দেখলো, কুঠার হাতে দু’জন য়ুরোপীয় সৈন্য রাজবাড়ি পাহারা দিচ্ছে। ওদের সঙ্গে ফ্রান্সিস নরওয়ের ভাষায় কথা বললো। কথা বুঝতে বা বলতে এদের কোন অসুবিধে হলো না। ওদের মধ্যে একজন রাজবাড়ির মধ্যে রাজাকে সংবাদ দিতে চলে গেল। ফ্রান্সিস আর হ্যারি অপেক্ষা করতে লাগলো। একটু পরেই রাজা এনর সোক্কাসন নিজে বাইরে বেরিয়ে এলেন। তার পেছনে-পেছনে এলেন আরো কয়েকজন। বোধহয় মন্ত্রী ও অমাত্যরা। ফ্রান্সিস ও হ্যারি মাথা নুইয়ে সকলকে সম্মান জানালো। ফ্রান্সিস ভাইকিং রাজার চিঠিটা রাজাকে দিল।
রাজা হাত বাড়িয়ে ফ্রান্সিসের হাত ধরলেন। বললেন, আপনারা এসেছেন, খুব খুশি হয়েছি। এখন কয়েকদিন বিশ্রাম করুন। আমাদের আতিথ্য গ্রহণ করুন। তারপর কাজের কথা ভাবা যাবে। চলুন রাজবাড়ির ভেতরে।
রাজা ও অমাত্য সকলেরই পরণে ছাই রঙের গরম কাপড়ের আলখাল্লা মত। মাথা ঘাড় ঢাকা সেই কাপড়ে। কোমরে চেন বাঁধা, রাজার কোমরের চেনটা সোনার। ফ্রান্সিস আর হ্যারি রাজাও অমাত্যদের সঙ্গে রাজবাড়ির ভেতরে ঢুকল। কালো কালো বড় বড়পাথরের ঘরগুলো, বারান্দা, অলিন্দ। এসব পেরিয়ে একটা বড়হলঘর। এটাই বোধহয় রাজসভাগৃহ। কারণ একটা পাথরের বেদী রয়েছে। তাতে লতাপাতা খোদাই করা। বন্ধু হরিণের চামড়ার গজ তাতে। এটাতেই রাজা এসে বসলেন। আরো কিছু কিছু কাঠের আসন রয়েছে, মন্ত্রী অমাত্যরা সেসব আসনে বসলেন। ফ্রান্সিস আর হ্যারিকেও দুটো আসনে বসতে দেওয়া হলো।
যদিও দিনের বেলা, তবু সভাগৃহে জ্বলছে কয়েকটা মশাল।
