–এখান থেকে আমরা বাট্টাহালিড্ যাবো। আমরা ভাইকিং। রাজা এনর সোক্কাসনের আমন্ত্রণে আমরা এখানে এসেছি।
–তাই বলুন। আপনারা আমাদের রাজার অতিথি।
এক্সিমো-সর্দার খুব খুশি। হাত বাড়িয়ে ওরহাতটা ধরলো। বললো, কিছু ভাববেন না। আপনার বন্ধুর খোঁজ করছি। কয়েকদিন বিশ্রাম করুন। বাট্টাহালিড্ যাবার ব্যবস্থা করে দেব। বলে সর্দার সঙ্গের লোকদের কি নির্দেশ দিল, তারপর সবাইকে নিয়ে চলে গেল।
বেশি খেতে পারলো না ফ্রান্সিস। ঠোঁটের জ্বালা-জ্বালা ভাবটা কমলেও খিদেটা যেন একেবারেই মরে গেছে। তবু কিছু খাবার পেটে গেল বলেই শরীরটায় যেন একটু সাড় এল। এবার ঘুমুতে পারলে অনেকটা ক্লান্তি কাটবে। সে পাশ ফিরে শুলো। কিন্তু তখনই তাবুর বাইরে হ্যারি ডাকছে শুনলো, ফ্রান্সিস-ফ্রান্সিস।
–ওঃ হ্যারি।
হ্যারি ততক্ষণে তাবুতে ঢুকে ফ্রান্সিসের বিছানার দিকে ছুটে এসেছে। হ্যারি আর তাকে উঠে বসার সুযোগ দিল না। শোয়া অবস্থাতেই ওকে জড়িয়ে ধরলো। ধরে রইল কিছুক্ষণ। ফ্রান্সিসই জোর করে ছাড়ালো নিজেকে। দেখলো হ্যারির চোখে জল। সে হাসলো, এই-কী ছেলেমানুষি হচ্ছে?
সাঙখু তাঁবুর ভেতর ঢুকে দুই বন্ধুর কাণ্ড দেখে হতবাক। নুয়ালিক আগুনের ধারে বসেছিল। সাঙখুগিয়ে ওখানে বসলো। কথাবার্তা বলতে লাগলো।
হ্যারি বিছানার পাশে বসলো। বললো, তুষারঝড় কেটে যাবার পর দু’দিন আমরা তোমাকে খুঁজে বেরিয়েছি। তুষারঝড়ে তোমার গাড়ির চলার দাগ মুছে গিয়েছিলো। । তাই তোমার গাড়ির চলার পথের কোন হদিশ পাইনি। তবু খুঁজেছি। এদিকে দেখি খাদ্য ফুরিয়ে আসছে। কুকুরগুলোও দিন-পাত ছুটে ছুটে ক্লান্ত। স্থির করলাম, কোর্টল্ডে চলে আসি। হয়তো তুমি এর মধ্যে কোর্টন্ডে চলে এসেছে। এখানে এসে তোমাকে পেলাম না। য়ুরোপের লোকেরা তো এখানে বেশি আসে না, তুমি এলে সঙ্গে সঙ্গেই খবর পেতাম।
একটু থামলো হ্যারি। তারপর বলতে লাগলো, দু’দিন হল এখানে এসেছি। প্রতিদিন সকালে-বিকেলে বেরিয়েছি তোমার খোঁজে। যদি তোমার কোন হদিশ পাই। কিন্তু সব চেষ্টাই বিফল হল। তারপর এই মাত্র একজন লোক গিয়ে তোমার এখানে আসার সংবাদ দিলো। শুনেই ছুটে আসছি।
হারি এক নাগাড়ে কথা বলে যেন হাঁপিয়ে উঠলো। ফ্রান্সিস হাসলো। তারপর ওর পথে কি ঘটেছে সবই বলল। তারপর বললো, মধ্যরাত্রির সূর্য দেখেছো কী?অপরূপ সেইদৃশ্য।
–না। হ্যারি বললো, বোধহয় মেঘকুয়াশার জন্যে আমরা দেখতে পাইনি। তারপর বললো, তুমি এখন ঘুমোও, রাত হয়েছে। কালকে তোমাকে আমাদের আস্তানায় নিয়ে যাবো।
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতে ফ্রান্সিস তাঁবুর ফাঁক দিয়ে দেখলো আচমকা উজ্জ্বল রোদ। ওর নিজের শরীরটাও বেশ ঝরঝরে লাগছে। ক্লান্তি অনেকটা কাটিয়ে উঠেছে। নুয়ালিক এসে খাবার দিয়ে গেলো। তখনই হ্যারি আর সাঙখু এলো। হ্যারি বললো, এখন শরীর কেমন?
–অনেকটা ভালো।
–আমাদের আস্তানায় যেতে পারবে তো?
–পারবো। কিন্তু সর্দার কখন আসবে?
–এটাই তো সর্দারের তাবু। আসবেন এক্ষুনি।
ফ্রান্সিস বেরোবার জন্যে তৈরি হতে হতে সর্দার এলো। ফ্রান্সিস বললে, আমার বন্ধু এসে গেছে। আমি ওদের সঙ্গে যাচ্ছি। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আপনি আরনুয়ালিক আমার প্রাণ বাঁচিয়েছেন।
সর্দার কিছু বললো না, হাত বাড়ালো শুধু। ফ্রান্সিস ওর সঙ্গে হাত মেলালো। তারপর হ্যারি আর সাঙখুর সঙ্গে তাবু থেকে বেরিয়ে এলো।
বাইরের আলো অন্যদিনের চেয়ে একটু উজ্জ্বল। ফ্রান্সিস বেশ খুশি মনে পথ চলতে লাগলো। একসময় ও হ্যারিকে জিজ্ঞেস করলো, আমার স্লেজগাড়িটা?
–ওটা আমি কাল রাতেই নিয়ে গেছি। কুকুরগুলো তো আমারই পোষা কুকুর সাঙখু বলল।
ছোট্ট জায়গা কোর্টল্ড। বেশির ভাগই তবু, তবে বড়-বড় তাবুও আছে। পাথরের বাড়িও আছে দেয়ালগুলো বেশ মোটা। সডআর পাথর দিয়েই বাড়িগুলো তৈরি। এমনি একটা সড আর পাথরে তৈরি বাড়িতে হ্যারিরা আস্তানা নিয়েছে। ঘরে ঢুকে ফ্রান্সিস দেখলো, বেশভারী ভারী পাথরেরঘরটা, ভেতরটা বেশ গরম। শ্লেজগাড়ি থেকে জিনিসপত্র আগেই নামানো হয়েছিল। সিন্ধুঘোটকের চামড়া, সীলমাছের চামড়া, এসব দিয়ে সাঙখু ফ্রান্সিসের জন্য একটা বিছানা করে দিল। ফ্রান্সিস তাতে আধশোয়া হয়ে শুয়ে পড়লো। শরীরের দুর্বলতা এখনও সম্পূর্ণ কাটেনি।
বিকেলের দিকে ফ্রান্সিস স্লেজগাড়িটা নিয়ে বেরলো। কাছাকাছি ঘুরে ফিরে দেখলো। এমনি বিশ্রাম নিতে গিয়ে তিনদিন কেটে গেল। এর মধ্যে এস্কিমোদের সর্দার দু’দিন এসেছিল। কয়েকটা এডার পাখি দিয়ে গিয়েছিল খাবার জন্য।
ফ্রান্সিস সেদিন বললো, হ্যারি আমি সম্পূর্ণ সুস্থ। আর দেরী করা ঠিক হবে না। বাবা দেড়মাসের মধ্যে কাজ সেরে ফিরতে বলেছেন। আর সময় নষ্ট নয়, চলো কালকেই বাট্টাহালিড্ রওনা দিই।
–বেশ। তুমি সুস্থবোধ করলে আমার কোন আপত্তি নেই। তবে সাঙখুসঙ্গে থাকলে ভালো।
–দরকার নেই। দুজনে একটা গাড়ি নিয়ে যাব।
–বেশ চলো, তাই যাওয়া যাবে।
সাঙখু রাত্রের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করছিল। ফ্রান্সিস তাকে কাছে ডাকল। ও কাছে আসতে ফ্রান্সিস কোমরবন্ধনী থেকে দুটো মোহর বের করে ওর হাতে দিল। সাঙখু খুব খুশি হয়ে দাঁত বের করে হাসল। ফ্রান্সিস বললো, সাঙখু কাল সকালেই আমরা বাট্টাহালিড্ রওনা হচ্ছি। তুমি আঙ্গামাগাসালিকে ফিরে যাও।
