সে এক অপার্থিব অপরূপ দৃশ্য। দিগন্ত বিস্তৃত বরফের মধ্যে থেকে কত রকমের কত বর্ণের আলো বিচ্ছুরিত হতে লাগলো। দামী চুনী পান্নার পাথরের মতো মনে হতে লাগলো বরফের টুকরোগুলোকে। কোথাও তুষারকে মনে হতে লাগলো গলিত সোনার স্রোত। খুব উজ্জ্বল আর বর্ণাঢ্য হয়ে উঠলো চারদিক। আলো আর রঙের খেলা চললো কিছুক্ষণ। হঠাৎ সব আলো রং মুছে গেলো। মেঘের মত ঘন কুয়াশার আস্তরণে ঢাকা পড়ল মধ্যরাত্রির সূর্য। আবার অন্ধকার নেমে এল। ফ্রান্সিস ক্লান্তিতে চোখ বুজলো। গাড়ি চলল টিকিয়ে-টিকিয়ে। কতক্ষণ ও এই পথে অসাড়ের মত পড়েছিল জানে না।
হঠাৎ অনেক দূর থেকে অস্পষ্ট কুকুরের ডাক শুনতে পেল। ওর গাড়ির কুকুরও একটা ডেকে উঠলো। অবসাদগ্রস্ত শরীরটা একটু টেনে তুলে দূরে তাকাল। অন্ধকারে কিছুই দেখতে পেল না। আবার কুকুর ডাক। এবার অনেকটা স্পষ্ট। কুকুরের ডাক যেদিক থেকে আসছে, সেইদিকে গাড়ির মুখ ঘোরালো। টাল সামলাতে গিয়ে হঠাৎ ওর মাথাটা ঘুরে উঠলো। সে অজ্ঞানের মত হয়ে গেলো। হাতের লাগাম খুলে গেলো। ও গাড়িতে বসার আসন থেকে গড়িয়ে পড়ল বরফের ওপর। প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় বোধটাই আর শরীরে সইলো না।
ফ্রান্সিস যখন চোখ খুললো, তখন দেখলো একাট তাবুর নীচে পশুলোমের বিছানায় ও শুয়ে আছে। শরীরের অসাড় ভাবটা কমেছে। তাঁবুটা বেশ বড়। সীলমাছের তেলের দীপ জ্বলছে। এক্সিমোদের মত পোশাক পরা একটা লোক উনুনের ধারে বসে আছে। লোকটা একটা ছোট চামড়ার ব্যাগের মত নিয়ে এল। ফ্রান্সিস তাকিয়ে আছে। লোকটা হাসল। তারপর এস্কিমোদের ভাষায় কী বললো। ফ্রান্সিস শুধু গরম’ এই কথাটা বুঝল। বুঝল, যে ব্যাগটায় গরম জল ভরা আছে। ও হাত বাড়িয়ে ব্যাগটা নিল। তারপর উঠে বসে হাত-পায়ে সেঁক দিতে লাগলো। আস্তে আস্তে শরীরের অসাড় ভাবটা একেবারেই কেটে গেল। লোকটা তখনও দাঁড়িয়ে। ফ্রান্সিসকে সুস্থ হতে দেখে ও খুব খুশী হলো। হাতের ভঙ্গী করে বললো, ফ্রান্সিস কিছু খাবে কিনা। ফ্রান্সিস মাথা হেলিয়ে সম্মতি জানালো। লোকটা আগুনের ধারে গেলো। থালায় করে গরম গরম রুটি আর বক্সা হরিণের মাংস নিয়ে এলো। সে আস্তে আস্তে খেতে লাগলো। উপোসী পেট মুচড়ে ওঠে। তবু খেতে হবে। সুস্থ থাকতে হবে। ও খেতে লাগলো।
খেতে গিয়ে এবার ঠোঁট দুটো জ্বালা করে উঠলো। আঙ্গুল বোলালো ঠোঁট দুটোয়। ঠাণ্ডায় ফেটে গেছে। আঙ্গুলে রক্তের ছোপ লাগলো। ঠোঁট ফেটে রক্ত বেরিয়েছে। কিছুই মুখে তুলতে পারছে না। ফ্রান্সিস ইসারায় লোকটাকে কাছে ডাকলো। লোকটা কাছে এলো আঙ্গুল দিয়ে ঠোঁট দুটো দেখালো। লোকটা হাসল। চলে গেলো তাবুটার কোণার দিকে। আঙ্গুলের ডগায় মাখনের মত হলদেটে কি একটা জিনিস নিয়ে এলো। ফ্রান্সিসের ঠোঁটে আস্তে আস্তে লাগিয়ে দিল। জ্বালাভাবটা একটু কমলো। সে আবার খেতে লাগলো। ও খাচ্ছে, তখনই কয়েকজন তাবুতে ঢুকলো। সবারই পরণে এস্কিমোদের মতো পোশাক। তাদের মধ্যে একজনের চেহারা দশাসই। তার কোমরে রূপোর বেল্ট মত। মাথা ঘাড় ঢাকা টুপিটা মেরু শেয়ালের চামড়ার। লেজটা পেছনদিকে ঝুলছে। পরণের পোশাকও অন্যদের চেয়ে পরিষ্কার। ফ্রান্সিস বুঝল এই লোকটা এদের সর্দার। সর্দার এগিয়ে এসে এস্কিমোদের ভাষায় কি জিজ্ঞেস করলো। ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে না বোঝার ভঙ্গি করলো। তখন সর্দারটি ভাঙা-ভাঙা নরওয়ের ভাষায় বলল, এখন কেমন আছেন?
ফ্রান্সিস বললো, ভালো আছি। আপনাদের অনেক ধন্যবাদ।
সর্দার হেসে বললো, আর ঘণ্টাখানেক দেরি হলে আপনি ঠাণ্ডায় জমে যেতেন। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন।
–কি হয়েছিল বলুন তো?
–আপনার শ্ৰেজগাড়ির কুকুরের ডাক আমরা শুনেছিলাম। কি ব্যাপার দেখতে যাবো, তখনই দেখি আপনার শ্ৰেজগাড়িটা কুকুরগুলো অনেক কষ্টে টেনে আনছে। কাছে আসতে এবার দেখলাম, চালকের আসনটা শূন্য। বুঝলাম, চালকটি বরফের মধ্যে কোথাও পড়ে গেছে। আমরা মশাল জ্বেলে নিয়ে শ্লেজগাড়ি নিয়ে ছুটলাম। আপনার গাড়িটার চলার দাগ তখনও বরফের ওপর রয়েছে। ভাগ্যি ভালোতখন তুষারবৃষ্টি হয়নি। তুষার বৃষ্টিহলে ঐ দাগ ঢাকা পড়ে যেত। আমরা দাগ ধরে ধরে কিছুদূর যেতেই দেখলাম, আপনি বরফের ওপরমুখ থুবড়ে পড়ে আছেন। ধরাধরি করে গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে এলাম। তারপর সেই লোকটাকে দেখিয়ে বলল, ওর নাম নুয়ালিক। ওর শুশ্রূষাতেই আপনি সুস্থ হয়েছেন।
ফ্রান্সিস হেসে নুয়ালিকের দিকে তাকাল। দেখুন, নুয়ালিকও হাসছে। ও হাত বাড়িয়ে নুয়ালিকের একটা হাত ধরে মৃদু চাপ দিয়ে এস্কিমোদের ভাষায় বলল, কুয়অনকা।
নুয়ালিক কথাটা শুনে আরো খুশি হয়ে হাতটা ঝাঁকাতে লাগলো।
এবার সর্দার জিজ্ঞাসা করলো, আপনি কোথায় যাচ্ছিলেন?
সঙ্গে সঙ্গে তারমনে পড়লো হ্যারি আর সাঙখুরকথা। ও এতক্ষণ নিজের কথাই ভাবছিল। ফ্রান্সিস বলল, কোর্টেল্ডের উদ্দেশ্যে আমি আমার বন্ধু আর একজন এস্কিমো বেরিয়েছিলাম।
–এই জায়গাটাই কোর্টল্ড। তবে আপনি বোধহয় অনেক ঘুরে ঘুরে এসেছেন?
–বলতে পারেন, আমার বন্ধু এসে পৌঁছেছে কিনা? প্রচণ্ড তুষার ঝড়ে আমি ওদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলাম।
–আমি তো ঠিক বলতে পারছি না–সর্দার বললো, আপনি ভাববেন না। বিশ্রাম করুন, আমি খবরের জন্য লোক পাঠাচ্ছি। কিন্তু আপনারা এখানে কার কাছে আসছিলেন?
