আবহাওয়া বেশ ভালই চললো ক’দিন। তিনদিন নির্বিঘ্নেই কাটলো। কিন্তু তার পরদিনই আবহাওয়ার পরিবর্তন দেখা গেল। হঠাৎসব আবছা অন্ধকারে ঢেকে গেল। হু হু করে উত্তুরে হাওয়া গর্জন করে ছুটলো। অল্পক্ষণের মধ্যেই শুরু হলো তুষার ঝড়ের তাণ্ডব। সে কী হাওয়ার প্রচণ্ডতা, যেন শ্লেজগাড়িটা উলটে ফেলবে। সেইসঙ্গে ঘন কুয়াশার মধ্যে দিয়ে বরফকুচির প্রচণ্ড ঝাঁপটা।
দু’চোখ কুঁচকে দৃষ্টি রেখে, ফ্রান্সিস গাড়ি চালাতে লাগলো। সেই প্রচণ্ড ঝড়ের বেগের মধ্যে গাড়ি চলতে লাগলো শামুকের গতিতে। ফ্রান্সিস কয়েক হাত দূরেও দেখতে পাচ্ছিল না। ঘন কুয়াশার আস্তরণে ঢাকা, সেইসঙ্গে বরফকুচির ঝাঁপটা। হঠাৎ একসময় পাশে তাকালো। আবছা অন্ধকারে হ্যারিদের গাড়িটা দেখতে পেল না। ভাবলো ঝড়টা থামুক, তখন খোঁজ করা যাবে।
প্রায় আধঘণ্টা ঝড়ের এই তাণ্ডব চললো। তারপর আস্তে আস্তে ঝড়ের গর্জন বন্ধ হলো। বরফকুচির ঝাঁপটা থেমে গেল। আস্তে আস্তে চারদিকে ঘন কুয়াশার আবরণ পাতলা হতে লাগলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই আলো ফুটলো। দিগন্তের দিকে অনুজ্জ্বল সূর্যটাকে দেখা গেল। ফ্রান্সিস চারদিকে তাকাতে লাগলো। কিন্তু হ্যারিদের গাড়ি কোনদিকে দেখতে পেল না। যতদূর চোখ যায়, শুধু বরফের শুভ্র প্রান্তর। হ্যারিদের গাড়ির চিহ্নমাত্র নেই। ফ্রান্সিসের একটু দুশ্চিন্তা হলো। একেবারে একা পড়ে গেলো অপরিচিত জায়গায়। সঙ্গে সাঙখু নেই। পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে কে? তবু একটা ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হলো, যে হ্যারি সাঙ্গুর সঙ্গে আছে। ফ্রান্সিস সূর্যের দিকে তাকালো। উত্তর দিকটা ঠিক করেনি লো। তারপর গাড়ির মুখ একটু ঘুরিয়ে সোজা উত্তর দিকে লক্ষ্য করে গাড়ি চালাতে লাগলো। কোর্টল্ড সোজা উত্তর দিকে।
সূর্য অস্ত যেতেই চারদিক অন্ধকার হয়ে গেলো। ফ্রান্সিস মাথার ওপর অস্পষ্ট ধ্রুবতারার দিকে দেখলো। ঠিক উত্তরে যাচ্ছে ও। কিছুক্ষণের মধ্যেই চারিদিকের অন্ধকার গাঢ় হয়ে উঠলো। ফ্রান্সিস মাথার ওপর অস্পষ্ট ধ্রুবতারার দিকে দেখলো। ফ্রান্সিস রাত্রির মত বিশ্রামের জায়গা খুঁজে নিল। তাঁবু খাটাল। মশাল জ্বেলে আগুন জ্বালাল। সিন্ধুঘোটকের শুকনো মাংস রাঁধলো। কুকুরগুলোকে খেতে দিলো। তারপর নিজে খেয়ে শুয়ে পড়লো। চারদিকে অসীম নিঃশব্দ। একটু পরেই চাঁদ উঠলো। একটা নরম মৃদু আলো ছড়ানো চারদিকে। ফ্রান্সিসের অনেক চিন্তা এখন। গাড়িতে খুব বেশিদিনের রসদ নেই। রসদ ফুরোবার আগেই হ্যারিদের গাড়ির খোঁজ পেতে হবে, নয়তো কোর্টল্ড পৌঁছতে হবে। এসব সাত পাঁচ ভাবতে-ভাবতে ফ্রান্সিস ঘুমিয়ে পড়ল।
ভোরবেলা উঠে তাঁবু গুটিয়ে নিল। কুকরগুলোকে লম্বা লাগামে বাঁধলো। তারপর গাড়ি ছোটালো। দিগন্তের ওপরে সূর্যকে লক্ষ্য রেখে দিক ঠিক করে নিলো।
এইভাবে তিনদিন কেটে গেল। কিন্তু হারিদের গাড়ির হদিশ পাওয়া গেল না। কোর্টল্ড পৌঁছানো হল না। ফ্রান্সিস এবার মজুত খাদ্য দেখতে গিয়ে দেখল আর একদিনের মতো খাদ্য আছে। খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল ফ্রান্সিস। সমুদ্রতীরে পৌঁছতে পারলে সীলমাছ, সিন্ধুঘোটক শিকার করে দিন কাটানো যেত। কিন্তু এই বিস্তীর্ণ বরফের প্রান্তরে খাদ্য জুটবে কোত্থেকে?
সেদিনটা ও উপোস করে রইলো। কিন্তু কুকুরগুলোকে খেতে দিলো। গাড়ি চালু রাখতেই হবে। এখন এই গাড়িই একমাত্র ভরসা।
দু’দিন কাটলো। খাদ্য শেষ। ক্ষুধার্ত কুকুরগুলো কত জোরে আর গাড়ি টানবে? গাড়ির গতিও কমে গেলো। দু’দিনের উপবাসী ফ্রান্সিস কোনরকমে লাগাম ধরে নিয়ে বসে রইল। গাড়ি চললো ঢিমেতালে।
সেদিন একটা বরফের চাঙরার পাশটা ঘুরতেই চোখের পলকে একটা নেকড়ে বাঘ কুকুরগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কুকুরগুলো ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। সেইসঙ্গে ঘেউ ঘেউ করে ডাকতে লাগলো। ততক্ষণে নেকড়েটা একটা কুকুরের ঘাড় কামড়ে ধরে নিয়ে পালিয়ে গেল। ফ্রান্সিস ধনুক হাতে নেবারও অবসর পেল না। ও নেমে গাড়ি থেকে একটা কুকুরকে খুলে নিয়ে গাড়ির পেছনে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখলো। বিজোড় হলে গাড়ি টানায় অসুবিধে হবে।
রাত্রে তাবু খাটালো। খাদ্য তো শেষ। নিজেও খেল না। কুকুরগুলোকেও কিছু খেতে দিতে পারল না। ঘুমুবে তারও উপায় নেই। প্রতিমুহূর্তেই আশঙ্কা করছে সেই নেকড়েটা এসে না হাজির হয়। একবার খাদ্যের সন্ধান পেয়েছে। ওটা আবার ঠিক আসবে। অন্য নেকড়ে বাঘ, শেয়াল আসতে পারে। সারারাত ঘুমুতে পারলো না। মাঝে মাঝে তন্দ্রা এসেছে। পরক্ষণেই তা ভেঙ্গে গেছে। নড়েচড়ে বসে তাঁবুর বাইরের দিকে তাকিয়ে থেকেছে। হাতে তীর-ধনুক। তাঁবুর বাইরে আগুন জ্বালিয়ে রেখেছে সারারাত।
পরদিন আবার গাড়ি চললো। অনাহারে শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছে। কুকুরগুলোর অবস্থাও তাই। ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসছে ফ্রান্সিসের। কিন্তু অনেক কষ্টে চোখ খুলে রেখেছে। হঠাৎ কুকুরগুলো ডেকে উঠলো। সে সজাগ হলো। তীর ধনুক শক্ত হাতে ধরলো। ভালো করে তাকাতে নজর পড়ল কী যেন একটা বরফের ওপর দিয়ে আসছে। ঠিক যা ভেবেছে তাই। একটা ছাই-রঙা নেকড়ে বাঘ। ওটা সেই বাঘটাই। কারণ একটা কুকুর শিকার করে ওটার সাহস বেড়ে গেছে। গুটি গুটি মেরে নেকড়ে বাঘটা এগিয়ে
আসছে। সে গাড়ি থামাল তারপর বাঘটার দিকে নিশানা করে তীর ছুঁড়ল। দুর্বল হাতের। ছোঁড়া তীর। নেকড়েটার পাশে বরফে গেঁথে গেল। নেকড়েটা একটু পেছনে সরে গেলো। তারপর আবার আসতে লাগলো। এবার ফ্রান্সিস মনে জোর আনল। নেকড়েটাকে না মারতে পারলেও ওটাকে আহত করতেই হবে। নইলে সবকটা কুকুর ও শিকার করবে। তখন এই বরফের প্রান্তরে মৃত্যু অনিবার্য। এবার নিশানা ঠিক করে সে তীর ছুঁড়ল। তীরটা এবার নেকড়েটার পেটের মধ্যে লাগলো। নেকড়েটা শূন্যে লাফিয়ে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে সে আর একটা তীর ছুড়ল। তীরটা লাগলো কিনা ও বুঝতে পারলো না। কিন্তু নেকড়েটা একটা গোঁ গোঁ শব্দ তুলে পালালো। এই ক্ষণিক উত্তেজনার পর শরীরে আবার ক্লান্তি নামলো। অবসাদে ফ্রান্সিস পা ছড়িয়ে প্রায় শুয়ে পড়ল। শক্ত হাতে লাগাম ধরে রাখতে পারছে না। প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় সমস্ত শরীর অসাড় হয়ে আসছে। কখন সন্ধে হয়েছে, রাত্রি নেমে এসেছে তার খেয়াল নেই। হঠাৎ একটা তীব্র আলো চোখে লাগতে ও চোখ মেললো। দেখল পরিষ্কার আকাশে দিগন্তের ওপর মধ্যরাত্রির সূর্য জ্বলছে। বিচিত্র বর্ণের আলোর বন্যা নেমেছে চারদিকে।
