তেল মাখাতে পোশাক দুটো অনেকটা নরম হলো।
এবার যাত্রা শুরু করতে হবে। ফ্রান্সিসের বাবা দেড় মাসের মেয়াদ দিয়েছেন। এর মধ্যেই সব সেরে ফিরতে হবে। এসব জায়গায় আকাশে সূর্য বেশিক্ষণ থাকে না। তাই সব সময়ই একটা আবছা আলো থাকে। সূর্য অস্ত গেলেই একেবারে নিকষ অন্ধকার। কাজেই দিন থাকতেই পথ চলতে হবে।
একদিন সকাল থেকে যাত্রার উদ্যোগ চললো। যা-যা দরকার পড়তে পারে, সে সবই তোলা হলো শ্লেজ গাড়িটায়–শুকনো সীলমাছ, সিন্ধুঘোটকের মাংস, কাঠ, চকমকি পাথর, সীল মাছের তেল-মাখানো মশাল, কুঠার, বর্শা, তীরধনুক, তরোয়াল, তাঁবু। দুটো শ্লেজগাড়িতে কুকুরগুলো জুড়ে দেওয়া হলো। একটা শ্লেজগাড়িতে সাঙখু আর হ্যারি থাকবে। অন্যটায় ফ্রান্সিস একা।
জাহাজ থেকে নেমে ফ্রান্সিস আর হ্যারি গাড়ি দুটোর কাছে এলো। সব দেখে শুনে নিলো। এবার যাত্রা। সাঙখু, হ্যারি ফ্রান্সিস সবাই গাড়িতে উঠে বসলো। এস্কিমো সর্দার কালুটুলা আর কিছু এস্কিমো এসে দাঁড়ালো। তখন সকাল, সূর্যের ম্লান আলো পড়েছে দিগন্তব্যাপী বরফ-ঢাকা প্রান্তরে। ফ্রান্সিসদের বন্ধুরা জাহাজ থেকে হাত নেড়ে ওদের বিদায় জানালো। গাড়ি দুটো ছুটলো তুষার প্রান্তরের মধ্যে দিয়ে। শ্লেজগাড়ির চাপে বরফ ভাঙার খখস্ শব্দ শুধু। মাঝে মাঝে কুকুরের ডাক। প্রথমে ওরা যাবে কোর্টন্ডে। সেখানে কিছু এস্কিমোদের বসতি আছে। সেখান থেকে রাজধানী বাট্টাহালিডে।
গাড়ি দুটো চললো। চারিদিকে যতদূর চোখ যায় শুধু বরফ আর বরফ। দুপুর নাগাদ একটা জায়গায় থামলো ওরা। খাবার খেলো, বিশ্রাম করলো, তারপর আবার যাত্রা করলো।
সূর্য অস্ত্র গেল, অন্ধকার নেমে এলো। তার মধ্যে দিয়েই গাড়ি দুটো ছুটলো। রাত্রে আর এক জায়গায় বিশ্রাম নিলো। চকমকিঠুকে মশাল জ্বালিয়ে কাঠ দিয়ে উনুন জ্বালাল। শুকনো মাংস রান্না করে খেলো। তারপর সেই তুষার প্রান্তরে তাঁবু খাটালো। রাতটা কাটালো তাঁবুতে। বাইরের উনুনের আগুন নেভালোনা, সারারাত জ্বললো ওটা। আগুনে ওরা হাত-পা সেঁকে নিলো। সাঙখু বললো, আগুন থাকলে শ্বেতভল্লুক, হিংস্র নেকড়ে এসব ধারে কাছে ঘেঁষবে না।
পরদিন তাবু গুটিয়ে নিয়ে আবার যাত্রা শুরু হলো। আবহাওয়া বেশ ভালই থাকলো, তিনদিন নির্বিঘ্নেই কাটলো। কিন্তু তার পরদিনই আবহাওয়ার পরিবর্তন দেখা গেল। হঠাৎসব অন্ধকার হয়ে গেলো, হু-হুঁউত্তুরে হাওয়া ছুটলো। অল্পক্ষণের মধ্যেই শুরু হলো তুষারঝড়ের তাণ্ডব। তবে ঝড় বেশিক্ষণ রইলো না, অল্পক্ষন পরেই তুষারঝড় বন্ধ হলো। ওরা তাঁবু খাঁটিয়ে রাতের মতো বিশ্রাম নিলো।
পরদিন তাবু গুটিয়ে নিয়ে আবার যাত্রা শুরু হলো। তখন দুপুরের কাছাকাছি সময়। একটা বরফের টিলামত পড়ল। সেটা ঘুরতেই একটা শ্বেত-ভালুকের মুখোমুখি পড়ে গেল ওরা। কুকুরগুলো দাঁড়িয়ে পড়লো, ঘেউ ঘেউ করে ডাকতে লাগলো। শ্বেত ভালুকটা সামনের দু’পা তুলে আক্রমণের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে পড়লো। ফ্রান্সিসের গাড়িটাই। সামনে ছিল। সে গাড়ির গায়ে বেঁধে রাখা কুঠারটা নিয়ে এক লাফে নেমে দাঁড়ালো বরফের ওপর। টিলাটার কাছ থেকে সরে দাঁড়ালো, যাতে আক্রান্ত হলে পিছিয়ে আসতে পারে। সাঙখুও কুঠার হাতে নেমে এলো। কুকুরগুলো সমানে কে চলেছে।
বিরাট চেহারার ভালুকটা দু’পা তুলে গলায় গরু-গর্শব্দ কতে করতে দুলে দুলে ছুটে আসতে লাগলো। হাতের ধারালো নখগুলো বেরিয়ে আছে। মুখ হাঁ করা চক্চকে ধারালো দাঁত বেরিয়ে আছে। সাঙখু লাগামের দড়ি থেকে কুকুরগুলোকে খুলে দিতে লাগলো। ছাড়া পেতেই কুকুরগুলো একে একে ভালুকটার চারপাশে জড়ো হতে লাগলো আর প্রাণপণে ঘেউ ঘেউ করতে লাগলো। আর একপাশ থেকে ফ্রান্সিসও এগিয়ে আসতে লাগলো। সাঙখু কুঠারটা এদিক ওদিক ঘোরাতে লাগলো, আর ঘা মারবার সুযোগ খুঁজতে লাগলো।
এক সময় ভালুকটা সাঙখুর দিকে ঘুরে দাঁড়াতেই ফ্রান্সিস ভালুকটার পেছনে ঝাঁপিয়ে পড়ল, তারপর বিদ্যুৎগতিতে কুঠারের কোপ বসালো ভালুকটার পিঠে। ভালুকটা ঘা খেয়ে সামনে ঝুঁকে পড়ে। সাঙখুর হাতে প্রচণ্ড থাবা মারল। সাঙখুর হাত থেকে কুঠার ছিটকে পড়ে গেল, ও বরফের ওপর চিৎহয়ে পড়ে গেল। ওদিকে ভালুকের পিঠ থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছে। আহত পশুটা ভয়ঙ্কর করে উঠলো। গোঁ-গোঁ শব্দ করতে করতে সাঙখুর দিকে ছুটলো।
ফ্রান্সিস চিৎকার করে ডাকল, সাঙখু, এই নাও। বলে ও কুঠারটা তার দিকে ছুঁড়ে দিল। সে শোয়া অবস্থাতেই কুঠারটা বরফ থেকে তুলে নিল! তারপর এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ালো। তখন ভালুকটার সঙ্গেওর দূরত্ব দু’হাতও নয়। ভালুকটা থাবা মারার জন্য সামনের থাবাটা বাড়ালো। সে আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রচণ্ড জোর কুঠার চালালো ভালুকটার মাথা লক্ষ্য করে। দু’চোখের ওপরে কপালে লাগলো ঘাটা মাথাটা দু’ফাঁক হয়ে গেল। প্রচণ্ড গর্জন করে ভালুকটা বরফের ওপর ধপাস করে পড়ে গেল। বার কয়েক নড়ে স্থির হয়ে গেল। বরফের ওপর রক্তের ধারা বইলো। সে হাঁপাতে হাঁপাতে বরফের ওপর বসে বড়লো।
ফ্রান্সিস ছুটে এলো, দেখলো সাঙখুর ডান হাত থেকে রক্ত পড়ছে। ভালুকটার থাবার নখের আঁচড় লেগেছে। ফ্রান্সিস কাটা জায়গাগুলোতে বরফ ঘষতে লাগলো। একটু পরেই রক্ত পড়া বন্ধ হলো। সে এবার উঠে কোমরে ঝোলানো ছুরিটা বের করলো। তারপর মৃত ভালুকটার কাছে গেলো। নিপুণ হাতে কিছুক্ষণের মধ্যেই ছালটা ছাড়িয়ে নিয়ে শ্লেজগাড়িতে রাখলো। ফ্রান্সিসও গাড়িতে উঠলো, কুকুরগুলোকে আবার লাগামের সঙ্গে বাঁধা হলো।
