পরের দিন সকালে ফ্রান্সিস আর হ্যারি নেমে এলো জাহাজ থেকে। কালুটুলার সঙ্গে গিয়ে দেখা করলো। জানতে চাইলো পথ প্রদর্শক পাওয়া গেছে কিনা? কালুটুলা কাকে যেন ডাকতে পাঠালো। একটু পরেই একজন বেশ বলশালী যুবক তাবুতে এলো। পরণে এস্কিমোদের মাথা কান-ঢাকা লোমের পোশাক।
কালুটুলা বলল–এর নাম সাঙখু, ভাল্লুক শিকারে ওস্তাদ।
সাঙখু দাঁত বের করে হাসল। সে অল্প অল্প নরওয়ের ভাষা বলতে পারে। বলল আপনারা কবে যাবেন?
–দু’ তিনদিনের মধ্যেই। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পৌঁছতে হবে।
-–ঠিক আছে। কালুটুলা বলল–আজ রাত্রে আমাদের এখানে নাচের আসর বসবে। আপনারা আসবেন।
সেই রাতে আকাশটা অনেক পরিষ্কার ছিল। কিছু তারাও আকাশে দেখা যাচ্ছিল। চাঁদও। অল্প চাঁদের আলো পড়েছে বরফঢাকা বন্দর এলাকায়। ফ্রান্সিসরা দল বেঁধে চলল এস্কিমোদের তাঁবুগুলোর উদ্দেশ্যে। দূর থেকেই শুনতে পেল কুকুরদের ডাক। প্রত্যেক এস্কিমো পরিবারই কুকুর পোষে। কুকুর ওদের নানা কাজে লাগে। কুকুর ওদের শ্লেজগাড়ি চালায়, হারপুন দিয়ে শিকার করা ছাড়াও, সীল অথবা সিন্ধুঘোটক কুকুরই কামড়ে ধরে নিয়ে আসে। কুকুরগুলোর গাযে খুব ঘন লোম। তাঁবুর বাইরেই কুকুরগুলো থাকে। তুয়ার পড়লে, তুষারে একেবার ঢাকা পড়ে যায়। কী করে তারই মধ্যে ফুটো করে শ্বাস নেয়, ঘুমোয়। ডাকলেই তুষার ঝেড়ে উঠে বসে।
ওরা এস্কিমোদের বসতিতে পৌঁছে দেখল–একটা জায়গা ঘিরে সীলমাছের তেলে চুবোনো মশাল জ্বলছে। সেই আলোগুলোর মাঝখানে নাচের জায়গা। দু’জন এস্কিমো দুটো ড্রাম নিয়ে এলো। সাঙখু আর ওর সঙ্গীরা নাচের জায়গায় দাঁড়াল। ড্রাম বাজনা শুরু হলো। সাঙখু আরও নানান অঙ্গভঙ্গী করে তালে তালে নাচতে লাগল। সেই তালে তালে একজন এস্কিমো বিচিত্র সুরে গান গাইলো। আবার কয়েকজন মুখ দিয়ে শব্দও করতে লাগল।
রাত বাড়তে লাগল। গুঁড়ি-গুড়ি মিহি তুষারকণার বৃষ্টি শুরু হলো। চাঁদ তারা ঢাকা পড়ে গেল। গাঢ় অন্ধকারে ঢেকে গেল চারদিকে। ফ্রান্সিসরা আর বসলো না। ওরা জাহাজে ফিরে এলো।
পরদিন থেকে ফ্রান্সিস আর বসে বসে সময় কাটাল না। সাঙখুর সঙ্গে এর মধ্যেই ওর বেশ ভাব হয়ে গিয়েছিল। ও সাঙখুর কাছে শ্লেজগাড়ি চালানো শিখতে চাইল। সাঙখু খুশিই হলো এই প্রস্তাবে। ও ফ্রান্সিসকে নিয়ে একটা শ্ৰেজগাড়ির কাছে এলো। শিস্ দিয়ে কুকুরগুলোকে ডাকল। দু’পাশে ছ’টা ছ’টা করে বারোটা কুকুরকে পর পর লম্বা লাগামের সঙ্গে জুড়লো। দু’জনে উঠে বসলো শ্লেজগাড়িটায়। স্লেজগাড়ির কোন চাকা থাকে না। সব মিলিয়ে গাড়িগুলো লম্বায় প্রায় তের ফুট হয়। চওড়ায় চার ফুট। সাঙখু শিস্ দিয়ে চাবুক চালাল। কুকুরগুলো গাড়ি টেনে নিয়ে ছুটলো বরফের ওপর দিয়ে। ফ্রান্সিস অনুমানে বুঝল, গাড়ির গতি নেহাৎ কম নয়। বলগা হরিণ টানলে এর চেয়ে অনেক বেশী গতি হয়। মাঝে মাঝেই চাবুক চালাচ্ছে। বরফ ভাঙ্গার একটা ছড়ছড় শব্দ উঠছে শুধু।
গাড়ি চালাতে চালাতে সাঙখু বলল-এই চাবুকইহলো আসল। শুধু একটা কুকুরকে চাবুক মারলে হবে না। সব ক’টা কুকুরকেই একসঙ্গে চাবুক মারতে হবে। আবার চাবুকের শব্দও করতে হবে। চাবুকের চামড়াটা ফিরিয়ে আনতে হবে সাবধানে। অসাবধান হলে লম্বা লাগামে চাবুকের চামড়াটা জড়িয়ে যায়। তখন চালক ছিটকে বরফের মধ্যে পড়ে যায়।
ফ্রান্সিস বেশ মনোযাগ দিয়ে তার কথাগুলো শুনল। সাঙখু এবার চালকের জায়গাট ফ্রান্সিসকে ছেড়েদিলো। ফ্রান্সিস লাগাম ধরে খুব সাবধানে চাবুক চালাতে লাগলো। কুকুরগুলোর মাথার পর চাবুকের শব্দও করতে লাগলো। অত সাবধান হওয়া সত্ত্বেও ওর চাবুকের চামড়াটা লম্বা লাগামের সঙ্গে জড়িয়ে গেলো। ও প্রায় ছিটকে পড়ে যাচ্ছিল সাঙখু মুহূর্তে লাগাম শক্ত হাতে টেনে ধরে গাড়ি থামালো। চাবুকের চামড়াটার জট খুলে আবার গাড়ি ছোটালো সাঙখু। আবার ফ্রান্সিস চালকের জায়গায় বসলো। লাগাম ধরে গাড়ি চালিয়ে ওরা ফিরে এলো।
কয়েকদিনের মধ্যেই ফ্রান্সিস স্লেজগাড়ি চালানো শিখে নিলো। ও এবার হারিকে শ্লেজগাড়ি চালানো শেখাতে লাগলো। কিন্তু হ্যারির দুই-তিন দিন চেষ্টা করেও সুবিধে হলো না। ও হাল ছেড়ে দিলো।
এবার ফ্রান্সিস সাঙখুর কাছে শিখতে লাগলো, এস্কিমো আর ল্যাপদের যুদ্ধরীতি। ওরা অস্ত্র হিসাবে তীরধনুক, বর্শা আর চওড়া ফলাওলা কুঠার ব্যবহার করে। তীরধনুক, বর্শা তার কাছে নতুন কিছু নয়, কিন্তু কুঠার চালানোটা নতুন। সাঙখু ঐ অঞ্চলের নামকরা ভালুক শিকারী। সে ফ্রান্সিসকে কুঠার চালানো শেখাতে লাগলো। কুঠার তরোয়ালের মত হাল্কা নয়, বেশ ভারী। কুঠার ঘোরাতে, আঘাত করতে বেশ দমের দরকার। প্রথম প্রথম ফ্রান্সিস অল্পক্ষণের মধ্যেই হাঁপিয়ে পড়তে লাগলো। পরে অনেকটা অভ্যস্ত হয়ে গেলো। খুব দ্রুত স্থান পরিবর্তন ও কুঠারের আঘাত হানা এসব শিখে গেলো।
এর মধ্যে এস্কিমো সর্দার কালটুলা ফ্রান্সিসদের জন্যে দুটো এস্কিমোদের পোষাক তৈরি করিয়ে দিন। সিন্ধুঘোটকের চামড়ায় তৈরি সেই মাথা ঢাকা পোশাক। মুখের দিকে চারপাশে আর পোশাকের হাঁটুর কাছে বন্ধু হরিণের নোম দিয়ে কাজ করা। ফ্রান্সিস আর হ্যারি পোশাক পরলো, কিন্তু ভীষণ শক্ত-শক্ত লাগলো। তখন কালটুলা পোষাক দুটোয় ভালো করে সীলমাছের তেল মাখাতে বললো।
