পরদিন আবার যাত্রা শুরু হলো। আইসল্যাণ্ডের তীরভূমির কাছ দিয়ে জাহাজ যাচ্ছে। তখনই দেখলো সীলমাছ আর সিন্ধুঘোটকের দল। ওগুলো কখনো জলে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, আবার উঠছে বরফের তীরে। এইভাবে ওগুলো ছোট ছোট মাছ ধরে খাচ্ছে। আবার একদঙ্গল সিন্ধুঘোটককে দেখলো চুপচাপ শুয়ে শুয়ে রোদ পোহাচ্ছে। গোঁফদাড়ি আর বড় বড় দুটো দাঁতওলা সিন্ধুঘোটকগুলো এমনিতে শান্ত। বরফগলা হিমজলে ওদের কোন অস্বস্তিই নেই।
একদিন পরেইফ্রান্সিসদের জাহাজ আইসল্যাণ্ডের আর একটা বন্দর হোলটা ভানসসের কাছাকাছি এলো। উঁচু উঁচু পাহাড়ের মত বরফের চাই, তারই নীচে বন্দর। ওদের ইচ্ছে ছিল বন্দরে জাহাজ ভেড়ানোর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা পারল না। তখন বিকেল, এমনিতেই এসব অঞ্চলে সূর্যালোক বেশিক্ষণ থাকে না। তাছাড়া কুয়াশা তো রয়েইছে। সেই আবছা অন্ধকারে ফ্রান্সিসরা দেখলো, ল্যাপজাতীয় আদিবাসীরা অনেকগুলো কায়াক নৌকোয় চড়ে, ওদের জাহাজ লক্ষ্য করে আসছে। ল্যাপদের হাতে কুঠার আর তীরধনুক। হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে তীর এসে ওদের জাহাজে পড়তে লাগলো, দু’চার জন আহতও হলো। বোঝাই যাচ্ছে, ল্যাপরা বন্ধুত্ব করতে আসছে না। ওদের উদ্দেশ্য জাহাজ লুঠ করা। ল্যাপরা মাঝে মাঝে চিৎকার করে উঠছে, শূন্যে ধারালো কুঠার তুলে আস্ফালন করছে।
ফ্রান্সিস সবাইকে ডেকে বলল, এই বন্দরে জাহাজ ভেড়ানো যাবে না। জাহাজের মুখ ঘোরানো হলো। কিন্তু ল্যাপরা সেই মাঝে মাঝে চিৎকার করে উঠছে, আর জাহাজের পিছু ছাড়ছে না দেকে ফ্রান্সিস তখন হুকুম দিল, গোলা–ছোঁড়ো।
গোলন্দাজরা কামানের কাছে জড়ো হলো। ফ্রান্সিস তরোয়াল তুলে ইঙ্গিত করতেই গোলা ছুটলো ল্যাপদের নৌকো লক্ষ্য করে। কয়েকটা নৌকো ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো। আবার গোলাছুটলো, আবার কয়েকটা নৌকো-সুষ্ঠু ল্যাপরা জলে পড়ে গেলো। ওদের মধ্যে থেকে আহতদের আর্তনাদ শোনা গেল। আর তীর ছুঁড়লো না ওরা, নৌকোগুলো বন্দরের দিকে ফিরে যেতে লাগলো। জাহাজের মুখ ঘোরানো হলো, গ্রীণল্যাণ্ডের দিকে। জলে ভাসমান বরফের স্তর এড়িয়ে জাহাজ নিয়ে যেতে হলো। কাজেই জাহাজের গতি ছিল ধীর। প্রায় তিনদিন লেগে গেলো গ্রীণল্যাণ্ডে আসতে। কয়েকদিন পরেই জাহাজ ভিড়লো দক্ষিণ গ্রীণল্যাণ্ডের বন্দরে।
এই বন্দর সমতল জমির ওপর। কোনদিকে জু পাহাড়ের মত, বরফের চাই নেই। এই বন্দরটা একটু বড়ো। বন্দরের ধারে ধারে এস্কিমোদের চামড়ার তাঁবুর বসতি। এই প্রথম ফ্রান্সিসরা এস্কিমোদের দেখলো। বন্দরে আরো দু’তিনটি জাহাজ ছিল। ওরা জাহাজ থেকে দল বেঁধে নেমে এলো। কিন্তু ঠাণ্ডায় যেন সমস্ত শরীর জমে যাচ্ছে। তবু অনেকদিন পরে মাটিতে পা দেওয়া, তার আনন্দই আলাদা। ভাগ্য ভালো বলতে হবে। কুয়াশা কেটে গিয়ে কিছুটা উজ্জ্বল রোদ ছড়িয়ে আছে চারদিকে। বরফে পড়ে সেই রোদ আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
এস্কিমোদের চামড়ার তাবুর কাছাকাছি আসতে এস্কিমোরা বেরিয়ে আসতে লাগলো। খুঁটির ওপর দড়ি বেঁধে ওরা ওদের বলগা হরিণের চামড়ায় তৈরি লোমওলা পোশাকগুলো রোদে শুকোতে দিয়েছে। ফ্রান্সিসরা কাছাকাছি আসতে, কয়েকজন এস্কিমো একটা বড় তাঁবুর কাছে নিয়ে গিয়ে কাকে ডাকতে লাগলো। একজন মোটাগোছের লোক সেই তাঁবু থেকে বেরিয়ে এলো। তার পোশাক অন্যান্য এস্কিমোদের তুলনায় একটু বেশি পরিচ্ছন্ন। তার মুখে কলো চোঙের মতো কী একটা। তামাক খাচ্ছে বোধহয়, মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে। বোঝা গেল, এই লোকটাই এস্কিমোদের সর্দার। সর্দার ফ্রান্সিসদের দেখলো, তারপর তাঁবুর মধ্যে ঢুকলো। একটু পরেই হাতে কী নিয়ে বেরিয়ে এলো। সেটা একটা ছুরি আর উঁচ। ফ্রান্সিসই সবার আগে ছিল। এস্কিমোদের সর্দার ছুরি আর উঁচটা ওর হাতে দিয়ে এস্কিমোদের ভাষায় বলল, কুয়অনকা। কথাটার অর্থ তোমাকে ধন্যবাদ।
ফ্রান্সিস সেটা না বুঝলেও এটা বুঝলো যে, এস্কিমো সর্দার ওদের সঙ্গে বন্ধুত্বই করতে চায়। ফ্রান্সিস বিস্কোকে ডেকে বললো, বিস্কো জাহাজে যাও, রঙীন কাপড় যা আছে নিয়ে এসো।
বিস্কো চলে গেলো। ফ্রান্সিস নরওয়ের ভাষায় বলল, আমরা বাট্টাহালিডে যাবো। রাজা এনর সাক্কাসন আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আমরা তো এই দেশে এসেছি একজন পথ-প্রদর্শক পেলে খুবই ভালো হয়।
এস্কিমো-সর্দার এবার ডানহাতের তর্জনী নিজের বুকে ঠেকালো। তারপর বলল, কালুটুলা।
ফ্রান্সিস বুঝলো, ওর নাম কালুটুলা। তারপর ভাঙা ভাঙা নরওয়ের ভাষায় বলল, তোমরা আমাদের বন্ধু হলে আমি নিশ্চয়ই তোমাদের সাহায্য করবো।
এর মধ্যে বিস্কো রঙীন কাপড় নিয়ে এলো। ফ্রান্সিস সে সব কালুটুলার হাতে দিল। কালুটুলা খুব খুশি দেখে অন্যান্য এস্কিমোরাও খুশি হলো। বারবার বলতে লাগলো কুয়অনকা।
তারপর বলল, এখানকার ঠাণ্ডায় তোমাদের এ পোশক চলবে না। কয়েকদিন অপেক্ষা করো। তোমাদের চামড়ায় পোশাক তৈরি করে দেবো।
ফ্রান্সিস বলল, আপাততঃ আমাদের দুটো পোশাক তৈরি করে দিলেই হবে।
কালুটুলা মাথা ঝাঁকিয়ে জানিয়ে দিল, ও তাই করবে, বাট্টাহালিডে যেতে হলে কীভাবে যেতে হবে, ওদিকে আবহাওয়া কেমন, এসব নিয়ে কিছু কথাবার্তা হলো। তারপর ফ্রান্সিসরা চলে এলো। এস্কিমোরা মেয়ে-পুরুষ সকলেই হাত নেড়ে ফ্রান্সিসদের বিদায় জানালো। গ্রীণল্যাণ্ডে এসে এস্কিমোদের কাছে এই সাদর অভ্যর্থনা পেয়ে ফ্রান্সিস খুশিই হলো।
