ফ্রান্সিস গল্প বলছে, আর মারিয়া অবাক হয়ে শুনতে লাগলো সেই গল্প। একসময় গল্প শেষ হলো, মারিয়ার বিস্ময়তার ঘোর তখনও কাটে নি।
একটু চুপ করে থেকে মারিয়া বলল, আপনি এতো কাণ্ড করেছেন? ফ্রান্সিস সলজ্জ হাসলো। মারিয়া বলল, এবার কোথায় যাওয়া হচ্ছে?
–এবার বরফের দেশ গ্রীনল্যাণ্ডে যাবো।
–সব ঠিক হয়ে গেছে?
–উঁহু, বাবার সম্মতির অপেক্ষায় আছি।
–গ্রীনল্যাণ্ডে যাচ্ছেন কেন?
–এরিক দ্য রেডের নাম শুনেছেন তো?
–হ্যাঁ, উনি তো ওখানকার প্রবাদ পুরুষ ছিলেন।
–হ্যাঁ, তারই গুপ্তধন উদ্ধার করতে। ফ্রান্সিস বলল।
কয়েকদিন কেটে গেল। সেদিন ফ্রান্সিসের বাবা তাড়াতাড়ি রাজবাড়ি থেকে ফিরলেন। উজ ফিরেই ফ্রান্সিসকে ডেকে পাঠালেন। ফ্রান্সিস বাবার ঘরে গেল। মন্ত্রীমশাই টেবিলে মুখ ? নীচু করে কিছু লিখছিলেন। ফ্রান্সিস ডাকল, বাবা।
মন্ত্রীমশাই মুখ তুলে বললেন, তুমি কী রাজা সোক্কাসনের দেশে যেতে চাও?
–হ্যাঁ, বাবা। এই অসল-নিষ্কর্মার জীবন আমার ভালো লাগে না।
–হুঁ। তোমার মা তোমার এই যাওয়ার ব্যাপারে, সমস্ত দায়িত্বটাই আমার কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছে।
ফ্রান্সিস কোন কথা বলল না।
–রাজামশাইও আমাকে বিশেষভাবে অনুরোধ করেছেন, আমি যেন সম্মতি দিই। একটু কেশে নিয়ে বললেন, সবদিক ভেবে আমি সম্মতি দিলাম।
ফ্রান্সিস ভেবেই রেখেছিলো, বাবা কিছুতেই রাজী হবেন না। কিন্তু এভাবে এক কথায় বাবাকে রাজী হতে দেখে তার মন আনন্দে নেচে উঠলো। ইচ্ছে হলো, ছুটে বাবাকে জড়িয়ে ধরে। কিন্তু বাবার সঙ্গে ওরকম ব্যবহারে সে অভ্যস্ত নয়। হেসে বলল, মাকে বলে আসি?
–যাও। কিন্তু একটা কথা, আমি একমাস সময় দিলাম। এক মাসের মধ্যে তুমি চলে আসবে। তার মধ্যে গুপ্তধন উদ্ধার হোক বা না হোক।
–বেশ। তবে আমার একটা কথা ছিল।
–বলো।
–বাট্টাহালিড্ পৌঁছতেই প্রায় দিন পনেরো-কুড়ি লেগে যাবে। তারপর গুপ্তধন খোঁজা। এতসব একমাসে হবে?
–বেশ আর পনেরো দিন। মন্ত্রীমশাই বললেন।
–ঠিক আছে, আমি ওর মধ্যেই ফিরে আসবো।
–আমাকে কথা দিচ্ছো কিন্তু।
–হ্যাঁ বাবা। সে বলল।
দেখতে দেখতে বাট্টাহালিডে যাওয়ার দিন এসে গেল। ফ্রান্সিস এর মধ্যে হ্যারি ও বিস্কো ছাড়াও আরও দশজন বন্ধুকে বেছে নিল।
রাজামশাই সৈন্য দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সে আর তোক নিতে রাজী না।
সেদিন সকাল থেকেই জাহাজঘাটায় লোকজনের ভীড় হয়ে গেল। যে জাহাজে ফ্রান্সিসরা যাবে, সেই জাহাজটা একেবারে নতুন। কামানও বসানো আছে। রাজামশাই জাহাজটা নিজেই বেছে দিয়েছেন।
একটু বেলা হতেই ফ্রান্সিসরা দল বেঁধে এলো। একটু পরে রাজা-রানী আর মারিয়া এলো। সঙ্গে মন্ত্রী, সেনাপতি, অমাত্য আর শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। জাহাজঘাটায় একটা সোনালী ঝালর দেওয়া সামিয়ানা টাঙানো হয়েছিলো, নীচে বসবার আসন। রাজা রানীর সঙ্গে আর সকলে সামিয়ানার নীচে বসলেন। ফ্রান্সিসরা একে একে সকলকে অভিবাদন জানিয়ে জাহাজে গিয়ে উঠলো। এবার আর রাতের অন্ধকারে জাহাজ চুরি করে পালানো নয়। দিনের বেলা সসম্মানে সকলের উপস্থিতিতে জাহাজে চড়ে যাত্রা করা। সমুদ্রের দিকে মুখ করে দু’বার কামান দাগা হলো। ঘর ঘর শব্দে নোঙর তোলা হলো। পালগুলো তুলে দেওয়া হলো। আকাশ পরিষ্কার, সমুদ্রও শান্ত। বাতাসের তোড়ে পালগুলো ফুলে উঠল। জাহাজঘাটা থেকে সকলেই জাহাজটার দিকে তাকিয়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই জাহাজটা দৃষ্টির আড়ালে চলে গেলো।
রাজামশাইরাজা এনর সোক্কাসনকে লেখা একটা শীলমোহর করা চিঠি দিয়েছিলেন ফ্রন্সিসকে। বেশ যত্ন করে চিঠিটা রেখে দিল। ফ্রান্সিস বুদ্ধি করে সকলকে যত বেশী সম্ভব, গরম কাপড় চোপড় আনতে বলে দিয়েছিল। গ্রীণল্যাণ্ডের ঠাণ্ডায় ওদের দেশীয় পোশাক চলবে না।
জাহাজ যাত্রা শুরু হলো। জাহাজ চললো উত্তর-পশ্চিমমুখো। প্রথমে আইসল্যাণ্ডে যাবে। তারপর গ্রীণল্যাণ্ডে। দিন-রাত জাহাজ চলছে। ফ্রান্সিস আর তার বন্ধুরা খুশিতেই আছে। ঝড়-ঝাঁপটার কবলে পড়েনি ওরা। বেশ নির্বিঘ্নে যাত্রা।
দিন-সাতেক যেতে না যেতেই চারপাশের আবহাওয়ায় পরিবর্তন দেখা গেলো। সূর্যের আলোয় আর সেই তেজ নেই। বেশ ঠাণ্ডা। উত্তরে হাওয়া বইতে শুরু করেছে। সকাল আর রাত্রে কুয়াশা পড়ে। তারইমধ্যে জাহাজ চলছে। যতদিন যাচ্ছে ঠাণ্ডাও ক্রমশ বেড়ে চলেছে। সবাইকে বেশি বেশী গরম পোশাক পরতে হচ্ছে, আর কান-ঢাকা টুপি।
হঠাৎ একদিন ওরা সমুদ্রে ভাসমান হিমশৈল দেখতে পেলো। খুব বড়ো নয়, তবে দূর থেকে বোঝবার উপায় নেই। কারণ হিমশৈলের বেশির ভাগটাই থাকে জলের তলায়। যতো এগোচ্ছে জাহাজ, ততোই বিরাট আকারের সব হিমশৈলের সামনে পড়ছে। তাই সারাক্ষণ দু’তিনজন করে নজর রাখছে হিমশৈলের দিকে। কোনভাবে যদি জাহাজটার সঙ্গে ধাক্কা লেগে যায় জাহাজ আর আস্ত থাকবে না। তাই দিনরাত সজাগ থাকতে হচ্ছে।
জাহাজ একদিন আইসল্যান্ডে পৌঁছল। বন্দরটার নাম রেকজাভিক, ছোট্ট বন্দর। তিনদিকে বিরাট বিরাট বরফের খাঁড়া পাহাড়। তারইনীচে খাঁড়ির মধ্যে বন্দরটা। ফ্রান্সিসরা জাহাজ ভেড়ালো সেই বন্দরে। এখানে স্ক্রেলিং উপজাতির বাস। ওরা চামড়ার তৈরি তাবুতে থাকে। সীলমাছের চামড়ায় তৈরি কায়াক নৌকায় চড়ে এলো ওরা। এই কায়াক নৌকো উলটে গেলেও জলে ডুবে যায় না। পরনে চামড়া পোশাক, মাথার টুপিও চামড়ার দলে-দলে ওরা নৌকো চড়ে এলো। ফ্রান্সিস প্রথমেই ওদের সঙ্গে শত্রুতা করল না। ওরা জাহাজে উঠতে চাইলে, উঠতে দিল। ঐ স্ক্রেলিংদের মধ্যে থেকে সর্দার গোছের একজন এগিয়ে এলো ফ্রান্সিসদের দিকে। ভাঙা ভাঙা নরওয়ের ভাষায় বলল, রঙিন কাপড় আছে কিনা। ফ্রান্সিসদের কাছে লাল-নীল নানা রঙের কাপড় ছিল। সে সব ওদের দেওয়া হলো, দেখা গেল ওরা খুব খুশি। সেই সব কাপড় ছিঁড়ে-ছিড়ে মাথায় বাঁধতে লাগলো। সর্দার কী যেন বলে উঠলে। কয়েকজন জাহাজ থেকে নেমে নৌকো থেকে নিয়ে এলো মেরুদেশের ভল্লুক আর বলগা হরিণের দামী দামী চামড়া। ফ্রান্সিসরাও ওসব পেয়ে খুব খুশি। স্ক্রেলিংরা দল বেঁধে হৈ হৈ করতে করতে মাথায় ছিট কাপড়ের ফেটি বেঁধে নৌকায় চড়ে চলে গেলো। কোন ঝামেলা না হতে দেখে ফ্রান্সিসরা খুশি হলো। সেই রাতটা ওরা রেকজাভিক বন্দরেই রইলো।
